দেশের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন অগ্রগতি আরও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ এবং প্রশাসনিক জটিলতায় সৃষ্ট বিলম্ব কমাতে সব মন্ত্রণালয়ের জন্য একটি ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এই ড্যাশবোর্ডে বাস্তবায়নের অবস্থা অনুযায়ী প্রতিটি চলমান প্রকল্পকে তিনটি রঙের সংকেতে ভাগ করা হবে—লাল, হলুদ ও সবুজ।
বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন সংক্রান্ত সরকারি সংস্থার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চলতি মাসেই সরকারপ্রধানের হাত ধরে এই ড্যাশবোর্ডের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হতে পারে। সংস্থাটির সূত্রমতে, যেসব প্রকল্পের অগ্রগতি খুবই হতাশাজনক পর্যায়ে রয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত হবে লাল রঙে। সন্তোষজনক অগ্রগতিতে থাকা প্রকল্পগুলো পাবে সবুজ চিহ্ন, আর মাঝামাঝি অবস্থানে থাকা প্রকল্পগুলো থাকবে হলুদ শ্রেণিতে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বেশ কয়েকটি সূচক বিবেচনায় নিয়ে প্রতিটি প্রকল্পের অবস্থান নির্ধারণ করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে প্রকল্পটি কতবার সংশোধিত হয়েছে, মেয়াদ কতবার বাড়ানো হয়েছে, ভৌত ও আর্থিক অগ্রগতির প্রকৃত চিত্র, বার্ষিক ভিত্তিতে অগ্রগতির ধারা, বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় সুশাসনের মাত্রা, ক্রয় প্রক্রিয়ার অগ্রগতি, ভূমি অধিগ্রহণের অবস্থা এবং জনবল ব্যবস্থাপনার দক্ষতা। এসব মানদণ্ড চূড়ান্ত করে একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে চলতি মাসের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে চলতি মাসের মধ্যেই ড্যাশবোর্ডটির উদ্বোধনী তারিখ চূড়ান্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এই ড্যাশবোর্ডে সরকারের রাজস্ব ও উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়নের সার্বিক চিত্রও থাকবে। প্রাথমিক পর্যায়ে শুধু সরকারপ্রধান, মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও সচিবরাই এই তথ্য দেখতে পারবেন, তবে পরবর্তী সময়ে সাধারণ মানুষের জন্যও এটি উন্মুক্ত করার সম্ভাবনা রয়েছে। ড্যাশবোর্ডে প্রতিটি প্রকল্পের পরিচালকের নাম-যোগাযোগের তথ্যের পাশাপাশি ক্রয় প্যাকেজের দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদারদের বিস্তারিত তথ্যও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
কর্মকর্তারা জানান, এই ড্যাশবোর্ড তৈরি হয়েছে সংশ্লিষ্ট সংস্থার একটি নির্দিষ্ট প্রকল্পের আওতায়, যার মাধ্যমে প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প বাস্তবায়নের সার্বিক কর্মক্ষমতা তদারকি করা সম্ভব হবে। কোন প্রকল্প নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এগোচ্ছে আর কোনটি একেবারেই স্থবির হয়ে আছে, তা সরাসরি জানতে পারবেন সরকারপ্রধান নিজেই, আর প্রয়োজনে তাৎক্ষণিক নির্দেশনাও দিতে পারবেন।
তবে এই উদ্যোগের বাস্তবায়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবন্ধকতার কথাও উঠে এসেছে কর্মকর্তাদের বক্তব্যে। বর্তমানে বিদ্যমান একটি ইলেকট্রনিক প্রকল্প ব্যবস্থাপনা তথ্যব্যবস্থায় প্রতি মাসে প্রকল্পের অগ্রগতি তথ্য দেওয়ার নিয়ম থাকলেও অধিকাংশ মন্ত্রণালয় ও বিভাগ তা নিয়মিতভাবে পালন করছে না। বারবার তাগাদা দেওয়া সত্ত্বেও এই তথ্য জমা দেওয়ার হার সন্তোষজনক নয়, আর আইনি বাধ্যবাধকতা না থাকায় সংশ্লিষ্টদের তথ্য দিতে বাধ্যও করা যাচ্ছে না। তবে কর্মকর্তারা আশা করছেন, নতুন ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে সরকারপ্রধানসহ শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা সরাসরি তদারকি করলে বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলো তথ্য প্রদানে অধিকতর সতর্ক হবে।
এ বিষয়ে একটি বেসরকারি গবেষণা সংস্থার নির্বাহী পরিচালক মন্তব্য করেন, প্রকল্প তদারকিতে স্বচ্ছতা আনার এই উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও এর প্রকৃত কার্যকারিতা নির্ভর করবে একটি শক্তিশালী জবাবদিহিতামূলক কাঠামোর ওপর। তাঁর মতে, তথ্য উন্মুক্ত থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নিজেদের কাজের মূল্যায়নের সুযোগ পাবেন এবং বাহ্যিক নজরদারির কারণে আরও সতর্ক হবেন। তবে বিলম্বের যথাযথ কারণ চিহ্নিত করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়াই আসল চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন তিনি। কোনো মন্ত্রণালয়ের বেশিরভাগ প্রকল্প লাল শ্রেণিতে পড়লে সংশ্লিষ্টদের কী ধরনের জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে, তা স্পষ্ট না থাকলে কাঙ্ক্ষিত ফল মিলবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। পাশাপাশি প্রকল্প বিলম্বের পেছনে অনেক সময় একাধিক প্রতিষ্ঠানের জটিলতা, সরবরাহ সংকট বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো বাস্তব কারণও থাকতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি, যা যথাযথ বিশ্লেষণের মাধ্যমে চিহ্নিত করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে পরিকল্পনা বিভাগের একজন সাবেক সচিব বলেন, এই ধরনের ড্যাশবোর্ড চালুর উদ্যোগ সময়োপযোগী হলেও এর সফলতা নির্ভর করবে তথ্যের উন্মুক্ততা ও ব্যবহারিক প্রয়োগের ওপর। প্রবেশাধিকার সীমিত রাখা হলে এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য পূরণ হবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর পরামর্শ, জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট এই তথ্য সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা উচিত, কারণ তথ্য প্রকাশ্যে না এলে তা প্রায়ই চাপা পড়ে যায়। পাশাপাশি তিনি প্রস্তাব দেন, মন্ত্রী ও সচিবদের ব্যস্ত সময়সূচি বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট সংস্থা যেন প্রতি মাসে ড্যাশবোর্ডের তথ্যের ভিত্তিতে একটি সংক্ষিপ্ত ও সহজবোধ্য প্রতিবেদন তৈরি করে সংশ্লিষ্টদের কাছে পাঠায়—এতে জবাবদিহির চাপ আরও কার্যকরভাবে তৈরি হবে বলে মনে করেন তিনি।

