দেশে বিদ্যুতের চাহিদা যখন তীব্র গরমের কারণে বাড়ছে, ঠিক তখনই জ্বালানি সংকট বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থাকে আরও চাপে ফেলেছে। গ্যাসের ঘাটতি, কয়লা সরবরাহে জটিলতা এবং বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রের রক্ষণাবেক্ষণজনিত সমস্যায় একসঙ্গে ৪১টি বিদ্যুৎকেন্দ্র পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। চালু থাকা অনেক কেন্দ্রও প্রয়োজনীয় জ্বালানি না পাওয়ায় পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহে।
ফলে রাজধানীর বাইরে বিশেষ করে গ্রাম ও শিল্পাঞ্চলে লোডশেডিং ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। কোথাও ঘণ্টায় ঘণ্টায় বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে, আবার কোনো কোনো এলাকায় বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করেও সরবরাহ ফিরছে না। তীব্র গরমের মধ্যে এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ যেমন বেড়েছে, তেমনি শিল্পকারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা ও দৈনন্দিন জীবনেও তৈরি হয়েছে বড় ধরনের অচলাবস্থা।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, লোডশেডিং ইতোমধ্যে আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। বিতরণ কোম্পানিগুলোর তথ্য অনুযায়ী, দেশে গড়ে প্রায় তিন হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং হচ্ছে। মাত্র ১০ ঘণ্টার ব্যবধানে আগের রেকর্ড ভেঙে নতুন রেকর্ড তৈরি হয়েছে।
গত রোববার বিকেল ৩টায় সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল তিন হাজার ৬৭১ মেগাওয়াট। মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর রাত ১টায় তা বেড়ে দাঁড়ায় তিন হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াটে। এর আগে ৩ আগস্ট রাত ১টায় সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয়েছিল তিন হাজার ৫১২ মেগাওয়াট। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ২০২৩ সালের ২৭ জুন সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয়েছিল তিন হাজার ৪১৯ মেগাওয়াট।
অর্থাৎ বর্তমান পরিস্থিতি শুধু নিয়মিত লোডশেডিংয়ের মাত্রা বাড়ার ঘটনা নয়; বিদ্যুৎ ঘাটতি এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের আগের রেকর্ডগুলোকেও ছাড়িয়ে গেছে।
বর্তমান বিদ্যুৎ সংকটের সবচেয়ে বড় কারণ গ্যাসের ঘাটতি। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বড় অংশ গ্যাসভিত্তিক হওয়ায় গ্যাস সরবরাহ কমে গেলে তার প্রভাব সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদনে পড়ে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ২৫২ কোটি ঘনফুট। লোডশেডিং নিয়ন্ত্রণে রাখতে এসব কেন্দ্রে অন্তত ১০০ থেকে ১১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানে সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র ৭০ কোটি ঘনফুট।
অর্থাৎ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো তাদের প্রয়োজনীয় গ্যাসের এক-তৃতীয়াংশেরও কম পাচ্ছে। এর ফলে শুধু কয়েকটি কেন্দ্র নয়, গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের পুরো ব্যবস্থাই সক্ষমতার তুলনায় অনেক নিচে নেমে এসেছে।
একসময় গ্যাস ব্যবহার করে প্রায় পাঁচ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হতো। কিছুদিন আগেও উৎপাদন ছিল সাড়ে পাঁচ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি। বর্তমানে তা কমে সাড়ে তিন থেকে চার হাজার মেগাওয়াটে দাঁড়িয়েছে।
এখানে সংকটটির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—দেশে বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা থাকলেও সেগুলো চালানোর মতো পর্যাপ্ত জ্বালানি নেই। ফলে অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও উৎপাদন বাড়ানো যাচ্ছে না।
গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির বড় অবনতি ঘটে গত ২১ জুলাই। কক্সবাজারের মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর দেশের গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়।
টার্মিনালটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর দৈনিক প্রায় ৬০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। ফলে দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ নেমে আসে প্রায় ২১৪ কোটি ঘনফুটে।
১৫ দিন পর আংশিক মেরামতের মাধ্যমে টার্মিনাল থেকে ২৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে। তবে সেটি এখনও পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরতে পারেনি।
পেট্রোবাংলার পরিচালক প্রকৌশলী মো. শোয়েব জানিয়েছেন, টার্মিনালটির মেরামত শেষ হতে দুই-তিন দিন লাগতে পারে। সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি সপ্তাহেই গ্যাস সরবরাহ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
টার্মিনালটি পুরোপুরি সচল হলে আরও ৩০ থেকে ৩৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হতে পারে। এতে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। ফলে স্বল্পমেয়াদে বিদ্যুৎ সংকট কিছুটা কমার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে এখানেই সমস্যার পুরো সমাধান হচ্ছে না। দেশের নিজস্ব গ্যাস উৎপাদন ক্রমেই কমছে। অন্যদিকে আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তা থাকায় আমদানিতে সামান্য সমস্যা হলেই দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থায় তার বড় প্রভাব পড়ছে।গ্যাসের পাশাপাশি কয়লা সরবরাহেও সমস্যা দেখা দেওয়ায় বিদ্যুৎ সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
এক হাজার ২০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার পটুয়াখালী তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন বর্তমানে অর্ধেকে নেমে এসেছে। সমুদ্রে বৈরী আবহাওয়ার কারণে কুতুবদিয়ায় বড় জাহাজ থেকে ছোট জাহাজে কয়লা খালাসে বিলম্ব হচ্ছে। ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লা পৌঁছাতেও বেশি সময় লাগছে।
ভারতের ঝাড়খণ্ডে আদানি পাওয়ারের কেন্দ্র থেকেও বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমেছে। কেন্দ্রটি বাংলাদেশে প্রায় এক হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করলেও কয়েক দিন ধরে সরবরাহ নেমে এসেছে ৮০০ থেকে এক হাজার মেগাওয়াটে।
ঝাড়খণ্ডে বন্যার কারণে কয়লা ভিজে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। তবে আদানি পাওয়ার জানিয়েছে, আজ মঙ্গলবার কয়লা সরবরাহ স্বাভাবিক হলে পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন সম্ভব হতে পারে।
দেশে বর্তমানে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মোট সক্ষমতা প্রায় সাত হাজার ৯৪৫ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে উৎপাদন হচ্ছে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার মেগাওয়াট।
রক্ষণাবেক্ষণ শেষে পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট চালু হওয়ায় উৎপাদন কিছুটা বেড়েছে। তবে রামপাল ও বড়পুকুরিয়ায় উৎপাদন কমেছে। বড়পুকুরিয়ার তিনটি ইউনিটের মধ্যে দুটি কারিগরি সমস্যায় বন্ধ রয়েছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনের ঘাটতির সবচেয়ে বড় ধাক্কা পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর। দেশের বিভিন্ন এলাকায় দিন-রাতে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।
তীব্র গরমের মধ্যে ফ্যান ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণযন্ত্র চালানো তো কঠিন হয়েছেই, পানির পাম্প চালাতেও সমস্যায় পড়ছেন মানুষ। ফলে শুধু বিদ্যুৎ ব্যবহারের অসুবিধা নয়, দৈনন্দিন জীবনযাত্রার মৌলিক অনেক কাজও ব্যাহত হচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, অনলাইনভিত্তিক কাজ এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। সবচেয়ে বেশি কষ্টে রয়েছেন শিশু, প্রবীণ ও অসুস্থ ব্যক্তিরা।
সিলেটে গতকাল সোমবার ২৪৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া গেছে ২০২ মেগাওয়াট। ঘাটতি ছিল ৪৫ মেগাওয়াট। আগের দিন এই ঘাটতি ছিল ৫৬ মেগাওয়াট।
তীব্র গরমের মধ্যে ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় রোববার রাতে সিলেটের টুকের বাজারে সড়ক আটকে বিক্ষোভ করেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
বগুড়ার সান্তাহারেও চাহিদার তুলনায় অর্ধেকের কম বিদ্যুৎ সরবরাহের অভিযোগ রয়েছে। সন্ধ্যার পর লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ায় চিকিৎসা, শিক্ষা এবং ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যাহত হচ্ছে।
শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতিও স্বস্তিদায়ক নয়। সেখানে আগে থেকেই গ্যাস সংকট ছিল। এখন তার সঙ্গে বিদ্যুৎ ঘাটতি যুক্ত হওয়ায় উদ্যোক্তাদের ওপর দ্বিমুখী চাপ তৈরি হয়েছে।
বিদ্যুৎ চলে গেলে উৎপাদন লাইন বন্ধ হয়ে যায়। আবার বিদ্যুৎ ফিরে এলেও যন্ত্রপাতি স্বাভাবিক অবস্থায় আনতে সময় লাগে। উৎপাদন চালু রাখতে অনেক কারখানাকে জেনারেটর ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে জ্বালানি ব্যয় বাড়ছে, আর তার সঙ্গে বাড়ছে উৎপাদন খরচ।
লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ার পর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বিদ্যুৎ সচিব পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যানকে ফোন করে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে গ্যাসের বরাদ্দ বাড়ানোর অনুরোধ করেছেন।
যেসব বিদ্যুৎকেন্দ্র দ্রুত জাতীয় গ্রিডে বাড়তি বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারবে, সেগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে গ্যাস দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
কর্মকর্তাদের ধারণা, গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বাড়ানো গেলে দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হবে। এতে লোডশেডিংও কমানো যেতে পারে। তবে বর্তমান গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি এখনও সন্তোষজনক নয়।
গ্যাস ও কয়লার ঘাটতি সামাল দিতে ব্যয়বহুল তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকেও উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। কিন্তু এই পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ অনেক বেশি। ফলে দীর্ঘ সময় তেলচালিত কেন্দ্রের ওপর নির্ভর করলে সরকারের ভর্তুকির চাপও বাড়বে।
এর সঙ্গে রয়েছে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বকেয়া পরিশোধের বিষয়টি। বকেয়া অর্থ পরিশোধ না হওয়ায় জ্বালানি তেল আমদানিতেও চাপ তৈরি হচ্ছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা মনে করছেন, ঘাটতি কমাতে তেলচালিত কেন্দ্র থেকে উৎপাদন বাড়ানো যেতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি টেকসই সমাধান নয়। তাই গ্যাস ও কয়লা সরবরাহ স্বাভাবিক করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম আশা করছেন, এক-দুই দিনের মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে।
তিনি জানিয়েছেন, গ্যাসের ঘাটতির পাশাপাশি কয়লা সরবরাহে সমস্যা হওয়ায় লোডশেডিং বেড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ে পটুয়াখালী তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং আদানি পাওয়ারের সঙ্গে বৈঠকও হয়েছে।
অন্যদিকে পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা বলছেন, এলএনজি টার্মিনাল পুরোপুরি সচল হলে দুই-তিন দিনের মধ্যে গ্যাস সরবরাহ বাড়তে পারে।
তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু টার্মিনাল সচল হলেই লোডশেডিং পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদাও বাড়বে। তাই জ্বালানি সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক না হলে বিদ্যুৎ ঘাটতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।
বর্তমান পরিস্থিতিকে শুধু সাময়িক জ্বালানি ঘাটতি হিসেবে দেখলে সমস্যার গভীরতা বোঝা যাবে না। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের নানা দুর্বলতা।
দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়া, আমদানিনির্ভর এলএনজির ওপর বাড়তি নির্ভরতা, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তা, জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং বিদ্যুৎ খাতে অতিরিক্ত সক্ষমতার চাপ—সব মিলিয়ে বর্তমান সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
স্বল্পমেয়াদে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎকেন্দ্রে বাড়তি গ্যাস সরবরাহ করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদে তা যথেষ্ট নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুৎ খাতে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো, সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো, কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা যথাযথভাবে কাজে লাগানো, গ্যাস ও বিদ্যুতের অপচয় কমানো এবং দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দেওয়া প্রয়োজন।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিমের মতে, দেশের জ্বালানি সংকট এখন সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি এবং দ্রুত এর পূর্ণ সমাধান সম্ভব নয়। শিল্প ও বিদ্যুৎ খাত সচল রাখতে প্রয়োজনে এলএনজি আমদানি বাড়ানোর পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানেও গুরুত্ব দিতে হবে।
শুধু জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ঘাটতিই নয়, স্থানীয় সঞ্চালন ব্যবস্থার দুর্বলতাও অনেক এলাকায় পরিস্থিতি আরও খারাপ করছে।
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ ও আড়াইহাজারে প্রায় ২০০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ১৪০ মেগাওয়াট। অর্থাৎ সেখানে ঘাটতি থাকছে প্রায় ৬০ মেগাওয়াট।
আড়াইহাজারে ১৩২/৩৩ কেভি গ্রিড উপকেন্দ্রের নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল ২০২০ সালে। এটি ২০২৩ সালে চালু হওয়ার কথা থাকলেও এখনও পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, কোরিয়া থেকে বিশেষায়িত প্রকৌশলী দল এলে অবশিষ্ট কাজ সাত থেকে ১০ দিনের মধ্যে শেষ করা সম্ভব হতে পারে।
এই নতুন গ্রিড চালু হলে ভূলতা গ্রিডের ওপর চাপ কমবে এবং একটি বিকল্প সঞ্চালন পথ তৈরি হবে। ফলে রূপগঞ্জ ও আড়াইহাজারের স্থানীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় কিছুটা স্বস্তি আসতে পারে।
তবে এখানেও একটি মৌলিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। জাতীয় পর্যায়েই যদি বিদ্যুৎ উৎপাদন ঘাটতি থাকে, তাহলে শুধু স্থানীয় সঞ্চালন অবকাঠামো শক্তিশালী করে লোডশেডিং পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়।
বর্তমান সংকটের তাৎক্ষণিক সমাধানের জন্য এলএনজি টার্মিনাল দ্রুত পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং কয়লা সরবরাহের জটিলতা দূর করা জরুরি। এর পাশাপাশি তেলচালিত কেন্দ্র ব্যবহার করে সাময়িক ঘাটতি সামাল দেওয়া যেতে পারে।
কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের প্রশ্নটি আরও কঠিন। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমতে থাকলে এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে একই ধরনের সংকট আবারও দেখা দিতে পারে।
তাই বর্তমান লোডশেডিং শুধু কয়েক দিনের বিদ্যুৎ ঘাটতির ঘটনা নয়। এটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি দুর্বলতাগুলোও সামনে নিয়ে এসেছে। সাময়িকভাবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা সম্ভব হলেও স্থায়ী সমাধানের জন্য জ্বালানি সরবরাহ, বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন অবকাঠামো এবং ভবিষ্যৎ চাহিদা—সবকিছুকে একসঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা করতে হবে।

