মতপ্রকাশের স্বাধীনতার একটি নির্দিষ্ট সীমারেখা থাকা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের চেয়ারম্যান, অবসরপ্রাপ্ত একজন মেজর জেনারেল। তাঁর ভাষায়, আমরা সবাই মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলি, কিন্তু এই স্বাধীনতাকে কখনোই স্বেচ্ছাচারিতার সমার্থক ভাবা উচিত নয়—এর একটি সীমা অবশ্যই থাকা দরকার। তাঁর মতে, গুজব প্রতিরোধে প্রযুক্তিনির্ভর পদ্ধতির চেয়ে সামাজিক সচেতনতার মাধ্যমেই এই সমস্যা মোকাবিলা সম্ভব, কারণ সমাজে যা কিছু বিদ্যমান, তারই প্রতিফলন ঘটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
মঙ্গলবার দুপুরে রংপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে মোবাইল টাওয়ারের বিদ্যুৎ-চৌম্বকীয় বিকিরণ পর্যবেক্ষণ এবং সেবার মান উন্নয়ন নিয়ে আয়োজিত একটি মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ঠেকাতে সমাজকেই এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে বিটিআরসি চেয়ারম্যান বলেন, বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি অসংখ্য ভুয়া ভিডিও ছড়িয়ে পড়ছে। ইউক্রেন যুদ্ধ চলাকালে এমন অনেক এআই-নির্মিত ভিডিও দেখা গেছে, এবং গত বছরের গণঅভ্যুত্থানের পরও দেশে একই ধরনের ভুয়া ভিডিওর মুখোমুখি হতে হয়েছে। তিনি জানান, সাম্প্রতিক নির্বাচনের আগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে এই আশঙ্কা কাজ করছিল যে ভুয়া ভিডিও ছড়িয়ে অস্থিরতা তৈরি করা হতে পারে, কারণ নির্বাচনকালীন সময়ে এ ধরনের ভিডিও সাধারণ মানুষের মধ্যে বড় প্রভাব ফেলতে সক্ষম। তবে বাস্তবে ঘটেছে ঠিক তার উল্টো ঘটনা।
তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে আশঙ্কা ছিল যে মানুষ মিথ্যা ভিডিওকে সহজেই বিশ্বাস করে ফেলবে, কিন্তু পরবর্তীতে দেখা গেছে উল্টো প্রবণতা—অনেক সময় মানুষ সত্য ভিডিওকেও বিশ্বাস করছে না। এর কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে মানুষ এখন অনেক কিছু শিখে ফেলেছে এবং সতর্ক হয়ে উঠেছে। তাঁর মতে, বাস্তবতা হলো, প্রযুক্তির মাধ্যমে সমাজ থেকে গুজব সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করার চেষ্টা চলতে থাকবে ঠিকই, তবে হয়তো তা কখনোই পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হবে না। তাই গুজব প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সমাজের নিজস্ব সচেতনতা ও উদ্যোগ।
রংপুরের জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই মতবিনিময় সভায় আরও বক্তব্য রাখেন বিটিআরসির প্রকৌশল ও অপারেশন্স বিভাগের একজন মহাপরিচালক, স্থানীয় একটি নাগরিক সংগঠনের সভাপতি, একজন সিনিয়র সাংবাদিক, রংপুর চেম্বারের একজন পরিচালক এবং একটি ছাত্র সংগঠনের স্থানীয় আহ্বায়কসহ আরও অনেকে।
সভায় রংপুর শহরের মোবাইল নেটওয়ার্ক সমস্যা, বিদ্যুৎ-চৌম্বকীয় বিকিরণের কারণে প্রাণ-প্রকৃতির সম্ভাব্য ক্ষতি এবং ইন্টারনেট সেবার মান উন্নয়ন নিয়ে বিভিন্ন সুপারিশ তুলে ধরেন উপস্থিত বক্তারা। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের এই সময়ে গুজব ও ভুয়া তথ্যের বিস্তার রোধে প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

