বাংলাদেশের নৌপরিবহন খাতকে নতুন করে সক্রিয় করা এবং অর্থনীতিতে এর সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে দেশে প্রথমবারের মতো নৌযানের পূর্ণাঙ্গ শুমারি করতে যাচ্ছে সরকার। আগামী ২০ আগস্ট থেকে ২৯ আগস্ট পর্যন্ত দেশজুড়ে এই শুমারি পরিচালিত হবে।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো যৌথভাবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করবে। দেশের বিভিন্ন নদী, খাল ও জলপথে চলাচলকারী নৌযানের প্রকৃত সংখ্যা, ধরন, ব্যবহার, মালিকানা এবং পরিচালনার ধরন সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করাই এ শুমারির মূল উদ্দেশ্য।
শুমারি কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য মাঠপর্যায়ের সমন্বয়কারীদের তিন দিনের প্রশিক্ষণও শুরু হয়েছে। ঢাকায় বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রধান কার্যালয়ে এই প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর যৌথ বিবৃতিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
শিপিং প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান শুমারির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বলেন, বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। দেশের অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং অসংখ্য মানুষের জীবিকা সরাসরি নদীপথের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু এই বিশাল সম্ভাবনাকে এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি।
সরকারের এই উদ্যোগকে শুধু নৌযানের সংখ্যা গণনার একটি সাধারণ কর্মসূচি হিসেবে দেখলে এর গুরুত্ব পুরোপুরি বোঝা যাবে না। মূলত দেশের নৌপরিবহন খাতের বর্তমান বাস্তব চিত্র বের করে এনে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ভিত্তি তৈরি করাই এর অন্যতম লক্ষ্য। কোন ধরনের নৌযান কত সংখ্যায় চলছে, কোথায় চলছে, কী কাজে ব্যবহার হচ্ছে এবং কার মালিকানায় রয়েছে—এসব তথ্য এক জায়গায় পাওয়া গেলে নৌপরিবহন খাতের পরিকল্পনা আরও বাস্তবভিত্তিক করা সম্ভব হবে।
এরই মধ্যে দেশের নৌপথ পুনরুদ্ধারে বড় ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সারা দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল পুনঃখননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া নৌপথগুলোকে আবার সংযুক্ত করা এবং জলপথের ব্যবহার বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে।
একসময় বাংলাদেশের খাল ও নৌপথের নেটওয়ার্ক ছিল অনেক বিস্তৃত। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাম্প্রতিক এক সেমিনারে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, দেশের খাল নেটওয়ার্কের দৈর্ঘ্য ঐতিহাসিকভাবে প্রায় ২৪ হাজার কিলোমিটার ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নৌপথ সংকুচিত হয়েছে। পলি জমা, দখল এবং নাব্যতা সংকটের কারণে বর্তমানে নৌপরিবহনের সম্ভাবনা অনেকটাই সীমিত হয়ে পড়েছে।
বর্তমানে দেশের নাব্য নৌপথের ৫৫ শতাংশেরও বেশি কোনো না কোনোভাবে পলি জমে ভরাট অথবা অবৈধ দখলের শিকার। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে অর্থনীতিতে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮০ অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে নৌপরিবহন খাতের অবদান ছিল ৩ দশমিক ৩ শতাংশ। ২০২৫ অর্থবছরে তা কমে মাত্র ০ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে এসেছে।
অথচ দেশের পণ্য ও যাত্রী পরিবহনে নৌপথের ভূমিকা এখনো গুরুত্বপূর্ণ। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের ৮ থেকে ১৬ শতাংশ নৌপথের মাধ্যমে হয়ে থাকে। রেলপথের ক্ষেত্রে এই হার ৪ শতাংশ। বাকি বড় অংশ সড়কপথের ওপর নির্ভরশীল।
নৌপথ শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়। চট্টগ্রাম ও মোংলা সমুদ্রবন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানি হওয়া পণ্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রেও নদীপথ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী দেশীয় নৌযানগুলোও পরিবহন খাতের কর্মসংস্থানে বড় অবদান রাখে। তথ্য অনুযায়ী, পরিবহন খাতের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৫০ শতাংশের সঙ্গে এসব নৌযানের কোনো না কোনোভাবে সম্পর্ক রয়েছে।
সংসদে গত জুনে দেওয়া বক্তব্যে নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রাবিউল আলম জানিয়েছিলেন, শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশে প্রায় ৬ হাজার ২০০ কিলোমিটার নৌপথ নৌযান চলাচলের উপযোগী থাকে। বর্ষাকালে নাব্য নৌপথের পরিমাণ বেড়ে প্রায় ৮ হাজার কিলোমিটারে দাঁড়ায়।
সড়কপথে যানজট ও পরিবহনব্যবস্থার ওপর বাড়তে থাকা চাপের কারণেও নৌপরিবহনকে কার্যকর বিকল্প হিসেবে গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে। শিপিং প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসান বলেন, সড়কের ওপর চাপ কমাতে নৌপথের সর্বোচ্চ ও কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য, পণ্য ও যাত্রী পরিবহন এবং পর্যটনে জলপথের ব্যবহার বাড়াতে পারলে দেশের অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করা সম্ভব।
এই প্রেক্ষাপটে নৌযান শুমারির তথ্য ভবিষ্যতের নীতি প্রণয়ন ও উন্নয়ন পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করছে সরকার। একই সঙ্গে নৌযানের নিরাপত্তা, নিবন্ধন, চলাচল এবং নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত নীতিমালা তৈরিতেও এই তথ্য কাজে লাগানো হতে পারে।
নৌপরিবহন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ দেশে নিবন্ধিত অভ্যন্তরীণ নৌযানের সংখ্যা ছিল ২২ হাজার ৩০০টি। তবে নিবন্ধিত নৌযানের এই সংখ্যা দেশের বাস্তব চিত্রের পুরোটা তুলে ধরে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। শুমারির মাধ্যমে নিবন্ধিত নৌযানের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে চলাচলকারী নৌযানের প্রকৃত সংখ্যা এবং মালিকানা কাঠামো সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকিও শুমারির তথ্যের নির্ভরযোগ্যতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের সময় কোনো ধরনের অসঙ্গতি, অনিয়ম বা তথ্যের গরমিল পাওয়া গেলে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।
তার মতে, কার্যকর নীতি প্রণয়নের জন্য নির্ভরযোগ্য তথ্যের কোনো বিকল্প নেই। তাই শুমারিতে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের পেশাদারত্ব, স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের নৌপরিবহন খাত দীর্ঘদিন ধরেই সম্ভাবনা ও অবহেলার মাঝামাঝি অবস্থানে রয়েছে। একদিকে নদীমাতৃক দেশের বিশাল জলপথ, অন্যদিকে নাব্যতা সংকট, দখল, অবকাঠামোগত দুর্বলতা ও সঠিক তথ্যের ঘাটতি—সব মিলিয়ে খাতটি তার সক্ষমতা অনুযায়ী এগোতে পারেনি। প্রথমবারের মতো জাতীয় পর্যায়ে নৌযানের পূর্ণাঙ্গ শুমারি সেই ঘাটতি পূরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।
তবে শুধু শুমারি করলেই নৌপরিবহন খাতের সংকট কাটবে না। শুমারি থেকে পাওয়া তথ্যকে বাস্তব উন্নয়ন পরিকল্পনায় কাজে লাগানো, নৌপথের নাব্যতা ফিরিয়ে আনা, দখলমুক্ত করা, নিরাপত্তা বাড়ানো এবং নৌযানের আধুনিকায়ন নিশ্চিত করাই হবে পরবর্তী বড় চ্যালেঞ্জ। সঠিকভাবে এই তথ্য কাজে লাগাতে পারলে দেশের সড়কপথের ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি পণ্য পরিবহনের ব্যয় কমানো, কর্মসংস্থান বাড়ানো এবং নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতিকে নতুন গতি দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

