দেশের স্নায়ুরোগ চিকিৎসাসেবার পরিসর আরও বিস্তৃত হতে চলেছে। রাজধানীর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালে আজ শনিবার চালু হচ্ছে নতুন একটি পাঁচশ শয্যার ভবন। সকাল দশটায় ভবনটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভাষ্যমতে, নতুন ভবনের নির্মাণকাজ ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে এবং বেশিরভাগ চিকিৎসা যন্ত্রপাতি স্থাপনের কাজও শেষের পথে। এই ভবন চালু হলে প্রতিষ্ঠানটির মোট শয্যাসংখ্যা দাঁড়াবে এক হাজারে, যা একে দেশের সবচেয়ে বড় বিশেষায়িত স্নায়ুরোগ চিকিৎসা কেন্দ্রে পরিণত করবে।
সরেজমিন দেখা গেছে, পনেরোতলা এই নতুন ভবনের নিচের তিনটি তলা বেজমেন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হবে, যেখানে থাকছে গাড়ি রাখার জায়গা ও সার্ভিস সেকশন। বাকি বারোটি তলাজুড়ে থাকবে রোগীদের ওয়ার্ড, অপারেশন থিয়েটার ও বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সুবিধা। মোট চল্লিশটি নিবিড় পরিচর্যা শয্যা, চব্বিশটি অস্ত্রোপচার-পরবর্তী শয্যা এবং একশ বারোটি কেবিন থাকবে এই ভবনে।
চিকিৎসকদের তথ্যমতে, এই হাসপাতালে সবচেয়ে বেশি আসেন স্ট্রোকে আক্রান্ত রোগীরা, এরপরই স্থান দুর্ঘটনাজনিত মস্তিষ্ক ও মেরুদণ্ডে আঘাতপ্রাপ্তদের। এ ছাড়া পারকিনসন্স, ডিমেনশিয়া, স্নায়ুতন্ত্রের প্রদাহজনিত রোগ, মৃগী ও মস্তিষ্কে পানি জমার সমস্যাসহ বিভিন্ন স্নায়ুরোগে আক্রান্ত শিশু থেকে বৃদ্ধ—সব বয়সের রোগীই এখানে চিকিৎসা নিয়ে থাকেন।
নতুন ভবনটির একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এর পুরোটাই কেন্দ্রীয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার আওতায়—যা দেশের কোনো সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রে প্রথম। সড়ক দুর্ঘটনা, উঁচু স্থান থেকে পড়ে যাওয়া কিংবা যানবাহন দুর্ঘটনায় আহতদের জন্য থাকছে একশ শয্যার আলাদা ট্রমা ইউনিট, যেখানে চব্বিশ ঘণ্টা অস্ত্রোপচারের সুবিধা মিলবে। চারটি অপারেশন থিয়েটারের মধ্যে দুটি অত্যাধুনিক জীবাণুমুক্ত পরিবেশে অস্ত্রোপচারের উপযোগী, জার্মান প্রযুক্তিনির্ভর—এতে অস্ত্রোপচার-পরবর্তী সংক্রমণের ঝুঁকি অনেকটাই কমে আসবে বলে জানানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা আরও জানান, পঙ্গু কিংবা মাথায় গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত রোগীদের এক ফ্লোর থেকে অন্য ফ্লোরে সরানো সাধারণত ঝুঁকিপূর্ণ ও কঠিন কাজ। এই সমস্যা সমাধানে ভবনটির প্রথম থেকে তৃতীয় তলা পর্যন্ত বসানো হয়েছে চলন্ত সিঁড়ি, যা কোনো সরকারি হাসপাতালে এই প্রথম। এ ছাড়া চল্লিশ শয্যার নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র, বিশ শয্যার উচ্চ নির্ভরতা ইউনিট এবং বাষট্টিটি ভেন্টিলেটরের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। ভবনে বসানো হয়েছে একটি ক্যাথল্যাব, দুটি এমআরআই মেশিন ও দুটি সিটি স্ক্যান যন্ত্র। চিকিৎসা সরঞ্জাম জীবাণুমুক্ত করার আধুনিক ব্যবস্থা, বর্জ্য নিষ্কাশনের পৃথক ব্যবস্থাপনা এবং নিজস্ব অক্সিজেন প্ল্যান্টও রয়েছে নতুন এই ভবনে।
হাসপাতালটির পরিচালক জানিয়েছেন, বর্তমানে শয্যাসংকটের কারণে অনেক রোগীকে ফিরিয়ে দিতে হয়, কারণ নির্ধারিত শয্যার বাইরে কাউকে ভর্তি করা সম্ভব হয় না। নতুন ভবন চালু হলে এই সংকট অনেকটাই কাটবে এবং বেশি সংখ্যক রোগীকে মানসম্পন্ন চিকিৎসাসেবা দেওয়া সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
তিনি আরও জানান, দেশে স্নায়ুরোগ চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ২০০৬ সালের ২৩ অক্টোবর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর হাতে এই প্রতিষ্ঠানের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল। প্রায় দুই দশক পর নতুন এই ভবনের উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতা আরও বহুগুণে বাড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

