জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় নতুন এক কৌশলের দিকে এগোচ্ছে সরকার-আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশের নিজস্ব কয়লা মজুদ থেকেই তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর জ্বালানি চাহিদার সিংহভাগ পূরণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, উত্তরাঞ্চলের একটি নতুন খনি থেকে উত্তোলন শুরু হলে দেশের ছয়টি বড় তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের আমদানি করা কয়লার প্রায় তিন-চতুর্থাংশ চাহিদাই মেটানো সম্ভব হবে।
বর্তমানে দেশে প্রতিবছর প্রায় দুই কোটি টন কয়লা আমদানি করতে হয় তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর জন্য। এর বাইরে উত্তরের একটি খনি থেকে যে কয়লা তোলা হয়, তার পুরোটাই ব্যবহৃত হয় স্থানীয় একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে। জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় সরকার এখন দিনাজপুরের একটি বৃহৎ কয়লা খনি থেকে নতুন করে উত্তোলন কার্যক্রম শুরুর কথা ভাবছে। সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় কয়লা খনি কোম্পানির তথ্য অনুযায়ী, এই খনি থেকে বছরে প্রায় দেড় কোটি টন কয়লা পাওয়া সম্ভব, যা দিয়ে আমদানি করা কয়লার চাহিদার প্রায় তিন-চতুর্থাংশ মেটানো যাবে। নীতিনির্ধারকদের মতে, এতে একদিকে যেমন বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ওপর চাপ কমবে, তেমনি বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রাও সাশ্রয় হবে এবং আমদানিনির্ভরতাজনিত ঝুঁকিও কমে আসবে।
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট সমাধানে সরকার একটি দীর্ঘমেয়াদি—দশ বছরের—পরিকল্পনা প্রকাশ করতে যাচ্ছে, যা চলতি মাসেই জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হবে বলে জানা গেছে। নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাতে জানা যায়, এই পরিকল্পনায় স্থানীয়ভাবে কয়লা উত্তোলনের নীতিও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এর আগে অর্থমন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন শীর্ষ কর্মকর্তা এক বাণিজ্যিক সংগঠনের আয়োজিত অনুষ্ঠানে জানান, আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে সম্পূর্ণ জ্বালানি নীতি প্রকাশ করা হবে। তিনি স্বীকার করেন, বিকল্প না থাকায় সরকারকে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের পথে এগোতে হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট খনি কোম্পানির তথ্যমতে, প্রস্তাবিত খনিতে মোট মজুদের পরিমাণ প্রায় ৫৭ কোটি টন, যার মধ্যে উত্তোলনযোগ্য প্রায় ৪৭ কোটি টন। বর্তমানে এই খনির সম্ভাব্যতা যাচাই সংক্রান্ত সমীক্ষা প্রস্তুত পর্যায়ে রয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মকর্তা জানান, খনিটিতে মাটির নিচে মাত্র ২৪০ মিটার গভীরতাতেই কয়লার স্তর পাওয়া যায়, যা তুলনামূলক সহজলভ্য। তবে সরকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর পূর্ণ সক্ষমতায় উত্তোলন শুরু করতে অন্তত পাঁচ বছর সময় লাগবে বলেও জানান তিনি।
বর্তমানে দেশের পাঁচটি কয়লা খনির মধ্যে কেবল একটি খনি থেকেই বাণিজ্যিকভাবে কয়লা উত্তোলন চলছে, যেখানে একটি চীনা কনসোর্টিয়াম বছরে প্রায় সাত লাখ টন কয়লা তুলছে। অন্যদিকে প্রস্তাবিত নতুন খনিটি কারিগরিভাবে প্রস্তুত এবং এ নিয়ে বিস্তারিত সম্ভাব্যতা সমীক্ষাও সম্পন্ন হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে।
দেশে বর্তমানে সাতটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সম্মিলিত উৎপাদনক্ষমতা সাত হাজারের বেশি মেগাওয়াট। একটি কেন্দ্র বাদে বাকি ছয়টির জন্যই প্রতিবছর প্রায় দুই কোটি টন কয়লা আমদানি করতে হয়, যার স্থানীয় বাজারমূল্য প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে শুধু কয়লা আমদানির জন্য ঋণপত্র নিষ্পত্তি হয়েছে প্রায় ১১৯ কোটি ডলারের, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় সাড়ে চৌদ্দ হাজার কোটি টাকার সমান।
দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ২৮ শতাংশ আসে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র থেকে, যেখানে বর্তমান চাহিদা প্রায় সতেরো হাজার মেগাওয়াট। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থানীয় কয়লা দিয়ে এসব কেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো গেলে আমদানি ব্যয় কমার পাশাপাশি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতাও কমবে। উল্লেখ্য, দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা প্রায় সাড়ে বারো হাজার মেগাওয়াট হলেও গ্যাস–সংকটের কারণে এর অর্ধেকও ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
একজন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এ প্রসঙ্গে মন্তব্য করেন, দেশীয় কয়লা উত্তোলনের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হলে স্বার্থহীন কোনো তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে নিরপেক্ষ সমীক্ষা করানো জরুরি। তাঁর ভাষ্যে, ঝুঁকি সীমিত ও ব্যবস্থাপনাযোগ্য প্রমাণিত হলে এগিয়ে যাওয়া উচিত, নয়তো এই পরিকল্পনা থেকে সরে আসাই শ্রেয়। প্রকৌশল চ্যালেঞ্জকে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
এ বিষয়ে রাষ্ট্রীয় জ্বালানি সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। তবে সংস্থাটির একজন পরিচালক জানান, বিদ্যমান খনি এলাকায় কয়েকটি সমীক্ষা চলমান রয়েছে এবং তার ভিত্তিতে উত্তোলন কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি আরও জানান, খনি এলাকার উত্তর পাশে অতিরিক্ত তিনশ একর জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে এবং নকশা তৈরির জন্য শিগগিরই ছয়টি পরীক্ষামূলক গর্ত খননের কাজ শুরু হবে।
দেশের পাঁচটি কয়লা খনির মধ্যে সবচেয়ে বেশি মজুদ রয়েছে জয়পুরহাটের একটি খনিতে—প্রায় পাঁচ হাজার সাড়ে চারশ মিলিয়ন টন। এ ছাড়া রংপুর, দিনাজপুরের আরেকটি এলাকা এবং বিদ্যমান খনি এলাকাতেও উল্লেখযোগ্য মজুদ রয়েছে। তবে দীর্ঘদিন ধরে এসব খনির কয়লা উত্তোলনের বিষয়ে কোনো সরকারই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, প্রস্তাবিত দিনাজপুরের খনিতে অতীতে একবার উত্তোলনের উদ্যোগ নেওয়া হলে ২০০৬ সালে স্থানীয় জনগণ এর বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামেন। কৃষিজমি নষ্ট হওয়া, পরিবেশ বিপর্যয়, বাস্তুচ্যুতির শঙ্কা এবং বিদেশি কোম্পানিকে কাজ দেওয়ার বিরোধিতা থেকে শুরু হওয়া সেই আন্দোলন এক পর্যায়ে সংঘর্ষে রূপ নেয়, যাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে তিনজনের প্রাণহানি ঘটে এবং বহু মানুষ আহত হন।
জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, এবার সরকার যদি স্থানীয় জনগণের ক্ষতিপূরণ, জীবনযাত্রার নিরাপত্তা ও পরিবেশগত উদ্বেগগুলো যথাযথভাবে বিবেচনায় নিয়ে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় এগোতে পারে, তাহলে দেশের এই বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তার স্বার্থে কাজে লাগানো সম্ভব। তবে অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে স্থানীয় জনগণের আস্থা অর্জনই হবে এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

