ভালো ভবিষ্যতের আশায় সমুদ্রপথে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে আবারও মর্মান্তিক পরিণতির শিকার হয়েছেন বাংলাদেশিরা। লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে গ্রিসে পৌঁছানোর চেষ্টার সময় নৌকাডুবি ও দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে ৯ বাংলাদেশি অভিবাসীর মৃত্যু হয়েছে। একই ঘটনায় আরও ২৯ জন বাংলাদেশি বর্তমানে মিসরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
বাংলাদেশ দূতাবাস, কায়রো রোববার (১৬ আগস্ট) বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, মানব পাচারকারী একটি চক্রের সহায়তায় লিবিয়ার টোব্রুক থেকে গ্রিসের উদ্দেশে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার সময় একটি নৌকা পথ হারিয়ে মিসরের মারসা মাতরুহ উপকূলে পৌঁছায়। পরে স্থানীয় পুলিশ নৌকাটিতে থাকা অভিবাসীদের উদ্ধার করে।
উদ্ধার হওয়া ২৯ জনের মধ্যে ১৮ জনকে গুরুতর অসুস্থ ও অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায়। পরে তাদের চিকিৎসার জন্য মারসা মাতরুহ জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
ঘটনার খবর পাওয়ার পর কায়রোয় বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রমবিষয়ক প্রথম সচিব স্থানীয় পুলিশ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পুলিশ দূতাবাসকে জানায়, বর্তমানে ২৯ জন অভিবাসী হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
হাসপাতালের এক কর্মীর সহযোগিতায় দূতাবাসের কর্মকর্তারা পরে আহত এক বাংলাদেশি নাগরিক আবদুল করিমের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৩৮ বাংলাদেশি ও ৪ সুদানি নাগরিকসহ মোট ৪২ জন গত ৩ আগস্ট টোব্রুক থেকে গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা করেন।
তারা একটি রাবারের নৌকায় করে সমুদ্রপথে রওনা দিয়েছিলেন। নৌকাটিতে একটি দ্রুতগতির নৌযানের ইঞ্জিন থাকলেও সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। ফলে দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রায় নৌকাটি পথ হারিয়ে ফেলে এবং শেষ পর্যন্ত মিসরের উপকূলে পৌঁছায়।
ঘটনাটি আবারও ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে পৌঁছানোর ঝুঁকিপূর্ণ প্রবণতার ভয়াবহ দিক সামনে এনেছে। উন্নত জীবনের আশায় অনেক বাংলাদেশি অবৈধ পথে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। এই যাত্রায় মানব পাচারকারী চক্রের ওপর নির্ভর করতে গিয়ে তাদের অনেকেই অরক্ষিত নৌযানে সমুদ্র পাড়ি দিতে বাধ্য হন।
বিশেষ করে পর্যাপ্ত নেভিগেশন ব্যবস্থা, নিরাপত্তা সরঞ্জাম ও প্রয়োজনীয় খাদ্য-পানীয় ছাড়া এমন নৌযাত্রা যাত্রীদের জীবনকে চরম ঝুঁকির মধ্যে ফেলে। সামান্য পথভ্রষ্টতা কিংবা আবহাওয়ার পরিবর্তনও তখন ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
এ ঘটনায় ৯ বাংলাদেশির মৃত্যু সেই ঝুঁকিরই নির্মম উদাহরণ। একই সঙ্গে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ২৯ জনের অবস্থাও পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট করছে। তাঁদের মধ্যে গুরুতর অসুস্থদের শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
ঘটনার পেছনে মানব পাচারকারী চক্রের ভূমিকার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। কারণ বৈধ অভিবাসনের সুযোগ না থাকায় অনেক মানুষ দালাল ও পাচারকারীদের প্রলোভনের ফাঁদে পড়ছেন। নিরাপদে ইউরোপে পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদের কাছ থেকে বিপুল অর্থ নেওয়া হলেও বাস্তবে দেওয়া হচ্ছে অনিরাপদ নৌযাত্রার ব্যবস্থা।
এই ধরনের ঘটনায় শুধু প্রাণহানিই ঘটে না, অনেক অভিবাসী নিখোঁজ হয়ে যান এবং তাঁদের পরিবারের কাছেও দীর্ঘ সময় কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য পৌঁছায় না। ফলে সমুদ্রপথে অবৈধ অভিবাসনের ঝুঁকি ব্যক্তিগত বিপর্যয়ের পাশাপাশি পরিবারগুলোর জন্যও দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা তৈরি করে।
মিসরের উপকূলে উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশিদের পরিচয়, তাঁদের শারীরিক অবস্থা এবং মৃতদের পরিচয় নিশ্চিত করার পাশাপাশি পরবর্তী সময়ে তাঁদের দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়াও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দূতাবাস স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
এই ঘটনায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন আবারও সামনে এসেছে—কেন মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এমন অনিশ্চিত সমুদ্রযাত্রায় পা বাড়াচ্ছেন? আর সেই আকাঙ্ক্ষাকে কাজে লাগিয়ে কীভাবে মানব পাচারকারী চক্রগুলো বছরের পর বছর ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে?
গ্রিসে পৌঁছানোর স্বপ্নে ভূমধ্যসাগরে যাত্রা করা ৪২ মানুষের মধ্যে অন্তত ৯ জন আর কখনো ফিরবেন না। তাঁদের মৃত্যু দেখিয়ে দিল, ইউরোপে পৌঁছানোর অবৈধ পথ শুধু অনিশ্চিত নয়, অনেক সময় তা জীবন-মৃত্যুর লড়াইয়ে পরিণত হয়।

