দুই দশকের বেশি সময় ধরে আলোচনা-সমালোচনায় থাকা এলিট বাহিনী র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের নাম পরিবর্তন করে দিয়েছে সরকার। জঙ্গিবাদ, মাদক ও সংগঠিত অপরাধ দমনে সাফল্যের পাশাপাশি গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে দীর্ঘদিন বিতর্কিত থাকা এই বাহিনীকে এখন থেকে ডাকা হবে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন বা এসআরবি নামে। নতুন এই নাম ও কাঠামোর জন্য একটি সুনির্দিষ্ট আইন—এসআরবি আইন ২০২৬—চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে সরকার।
গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মানবাধিকারকর্মী ও বিভিন্ন সংগঠন থেকে বাহিনীটি সম্পূর্ণ বিলুপ্তির দাবি উঠেছিল। তবে সরকার সেই পথে না হেঁটে বাহিনীটিকে নতুন নাম ও কাঠামোয় ধরে রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। দীর্ঘ আলোচনা ও খসড়া প্রণয়নের পর অবশেষে নতুন আইনের অনুমোদন এল।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, নাম বদলের বাইরে বাস্তবে কী পরিবর্তন আসছে? নতুন আইন অনুযায়ী, কোনো কর্মকর্তা বা সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তা দ্রুত সমাধানের জন্য একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া থাকবে, যা আগে ছিল না। এ জন্য গঠিত হবে একটি অভিযোগ নিষ্পত্তি কমিটি। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো, বাহিনীটি এখন থেকে একটি নির্দিষ্ট আইনের অধীনে পরিচালিত হবে—আগে যার কোনো সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামোই ছিল না।
এ প্রসঙ্গে বাহিনীটির একজন সাবেক মহাপরিচালক মন্তব্য করেন, যেকোনো বাহিনী পরিচালনার জন্য একটি নির্দিষ্ট আইন ও বিধিমালা থাকা অপরিহার্য, আর এই দিক থেকে দীর্ঘদিনের একটি ঘাটতি পূরণ হলো বলে তিনি মনে করেন। তাঁর ভাষ্যমতে, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা বা গোপন আটকের মতো যেসব অভিযোগে বাহিনীটি এত সমালোচিত হয়েছে, নতুন আইন যদি পুরোপুরি কার্যকরভাবে প্রয়োগ হয়, তাহলে এসব থেকে কিছুটা হলেও মুক্তি মিলতে পারে। তবে তিনি একটি প্রশ্নও তুলেছেন—বাহিনীর নেতৃত্বে কেন কোনো অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বা স্বতন্ত্র কোনো ব্যক্তির পরিবর্তে বাহিনীরই একজন সদস্যকে রাখা হলো। তাঁর সামগ্রিক মূল্যায়ন হলো, যতটুকু সংস্কার হয়েছে তা খারাপ নয়।
নতুন কাঠামোয় গঠিত অভিযোগ প্রতিকার কমিটিতে থাকবেন বাহিনীর একজন অতিরিক্ত মহাপরিচালক, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ ও বাহিনীর সদর দপ্তর থেকে একজন করে প্রতিনিধি, এবং আইন-বিচার-প্রশাসন বা মানবাধিকার বিষয়ে অভিজ্ঞ একজন ব্যক্তি, যাঁকে সরকার নিয়োগ দেবে।
তবে শুধু নাম পরিবর্তন ও একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে প্রকৃত পরিবর্তন আসবে কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের একজন সাবেক সদস্য। তাঁর ভাষায়, অভিযোগ তদন্তের এই কমিটির পাঁচ সদস্যের মধ্যে চারজনই কোনো না কোনোভাবে সরকার-সংশ্লিষ্ট—একজন বাহিনীরই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, দুজন সরকারি আমলা, আর একজন সরকার-মনোনীত ব্যক্তি। এমন গঠনে প্রকৃত অর্থে একটি স্বাধীন তদন্ত সম্ভব কি না, সে প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর আশঙ্কা, শুধু নাম পাল্টে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর একটি কৌশল হিসেবে যদি এই উদ্যোগ থেকে যায়, তাহলে সেটি হবে দুঃখজনক।
নতুন আইন কার্যকর হলে র্যাবের বর্তমান কাঠামো সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। এর সঙ্গে সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ বিধিমালা প্রণয়নের পর বাহিনীর বর্তমান জনবল ও সম্পদ এসআরবির কাছে হস্তান্তরিত হিসেবে দেখানো হবে।

