রাজধানীর সচিবালয়ে সরকারি কর্মকর্তারা এখন নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই অফিসে পৌঁছাচ্ছেন, কিন্তু দেশের জেলা-উপজেলা পর্যায়ে চিত্রটা একেবারে উল্টো। সাধারণ মানুষের মুখে মুখে এখন একটাই প্রশ্ন ঘুরছে—সকাল নয়টার অফিস আসলে শুরু হয় কয়টায়।
সরকারপ্রধান নিজে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে নির্ধারিত সময়ের আগেই কার্যালয়ে পৌঁছানো শুরু করেছেন। তাঁকে অনুসরণ করে মন্ত্রী-সচিবসহ শীর্ষ কর্মকর্তারাও সকাল নয়টার মধ্যে অফিসে হাজির হচ্ছেন। এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকেও সব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে প্রতিদিন সকাল নয়টা থেকে নয়টা চল্লিশ মিনিট পর্যন্ত বাধ্যতামূলকভাবে কর্মস্থলে উপস্থিত থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা এই নির্দেশনার সঙ্গে মেলে না। অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী নির্ধারিত সময়ের এক থেকে দেড় ঘণ্টা পরে অফিসে আসছেন, আবার কেউ কেউ সকালে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করেই কর্মস্থল থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন। এর ফলে সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষকে প্রতিনিয়ত ভোগান্তির মুখে পড়তে হচ্ছে।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরা গত দুই দিন দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় সরেজমিন পরিদর্শন করে এই চিত্র তুলে ধরেছেন। রাজধানীর প্রধান সরকারি দপ্তরগুলো—যেমন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা, ভূমি ভবন, খাদ্য ভবন, সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ এবং দুই সিটি করপোরেশনের অধিকাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সময়মতো উপস্থিত পাওয়া গেলেও কয়েকজনকে সোয়া নয়টা পর্যন্তও পাওয়া যায়নি; সহকর্মীরা জানান তাঁরা বৈঠকে আছেন। রাজধানীর বিভিন্ন আঞ্চলিক ও ভূমি অফিসেও একই চিত্র দেখা গেছে। জেলা-উপজেলা পর্যায়ের বেশিরভাগ দপ্তরে এখনো সময়ানুবর্তিতার ঘাটতি স্পষ্ট।
সরকার গঠনের পরপরই অফিস সময় মেনে চলার বিষয়টিতে সরকারপ্রধান নিজে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। কয়েক মাস আগে তৎকালীন এক প্রতিমন্ত্রী নারায়ণগঞ্জের একটি ইউনিয়ন ভূমি অফিসে আকস্মিক পরিদর্শনে গিয়ে প্রায় আধা ঘণ্টা বারান্দায় বসে কর্মকর্তাদের জন্য অপেক্ষা করেছিলেন। নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পরও দায়িত্বশীল কাউকে না পেয়ে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এরপর কয়েকজন মন্ত্রী ও জনপ্রতিনিধি সরকারি দপ্তরে আকস্মিক পরিদর্শনে গেলে কিছুদিনের জন্য সময়ানুবর্তিতা কিছুটা বেড়েছিল, তবে সেই উন্নতি স্থায়ী হয়নি।
দেশের বিভিন্ন জেলায় সরেজমিন অনুসন্ধানে একই ধরনের অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে। এক জেলার কৃষি সম্প্রসারণ দপ্তরে সকাল সাড়ে আটটায় গিয়ে দেখা গেছে অধিকাংশ চেয়ার ফাঁকা; দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা কেউ নয়টার পর, কেউ দশটার পরও অফিসে পৌঁছেছেন। আবার কয়েকজন কর্মকর্তা সাড়ে নয়টার মধ্যেই অফিস থেকে বেরিয়ে বিকেল সাড়ে চারটার পর ফিরেছেন—যদিও তাঁরা বৈঠক ও প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণের কথা জানিয়েছেন।
আরেক জেলার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল দপ্তরে সকাল নয়টায় প্রধান ফটকই বন্ধ পাওয়া যায়; প্রায় আধা ঘণ্টা পর একজন কর্মচারী এসে গেট খোলেন। এক জেলার উপজেলা পরিষদে পৌনে নয়টায় বেশিরভাগ দপ্তরে কর্মকর্তা অনুপস্থিত ছিলেন, নির্বাহী কর্মকর্তা এসেছেন নয়টার কিছু পর, আর কয়েকজন কর্মকর্তা পৌনে দশটা পর্যন্তও অফিসে আসেননি—তাঁরা মাঠ পরিদর্শন বা বৈঠকে থাকার কথা জানিয়েছেন।
একটি উপজেলায় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী প্রায় দশটা পর্যন্ত অনুপস্থিত ছিলেন, মৎস্য কর্মকর্তা নাশতা করতে বের হয়ে পরে মাঠ পরিদর্শনে যাওয়ার কথা জানান, আর হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা জেলা পর্যায়ে পরামর্শের কথা বলে অনুপস্থিতির কারণ ব্যাখ্যা করেন। আরেক জেলার খাদ্য নিয়ন্ত্রকের দপ্তরে উপজেলা পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা সাড়ে দশটা পর্যন্তও অফিসে না আসায় তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। একটি পৌরসভায় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সময়মতো এলেও তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের অধিকাংশই দশটার আগে আসেন না বলে দেখা গেছে। একটি গণপূর্ত দপ্তরে সকাল নয়টায় মাত্র তিন-চারজন কর্মকর্তা-কর্মচারী উপস্থিত ছিলেন, অধিকাংশই দশটার মধ্যেও পৌঁছাননি।
একটি নির্বাচন কার্যালয়ে সকাল নয়টায় কয়েকজন অফিস সহায়ক ছাড়া অন্য কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী উপস্থিত ছিলেন না, নির্বাচন কর্মকর্তা নয়টা দশ মিনিটের পর অফিসে আসেন। একটি ভূমি অফিসে সকাল নয়টা থেকে সাড়ে দশটা পর্যন্ত সেবাপ্রার্থীরা অপেক্ষা করলেও অনেক কর্মকর্তাকে নির্ধারিত সময়ে পাওয়া যায়নি; একজন সেবাপ্রার্থী জানান, জমির নামজারি ও খতিয়ান সংশোধনের জন্য প্রায় এক মাস ধরে ঘুরছেন তিনি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আগের দিনের জেলা প্রশাসক কার্যালয় পরিদর্শন, বৃষ্টি ও ব্যক্তিগত সমস্যার কারণ দেখিয়ে দেরির ব্যাখ্যা দেন।
পার্বত্য একটি উপজেলায় সমাজসেবা, মৎস্য, শিক্ষা, পরিসংখ্যান, সমবায়সহ প্রায় এগারোটি সরকারি দপ্তর মাত্র একজন করে কর্মচারী দিয়ে চলছে বলে জানা গেছে। এমনকি সেই একজন কর্মচারীকেও অনেক সময় খুঁজে পাওয়া যায় না, আর অধিকাংশ দপ্তরের কার্যক্রম কার্যত শুরু হয় দুপুরের পর। ফলে দুর্গম এলাকার বাসিন্দারা সেবা নিতে গিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়ছেন। স্থানীয় প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা জানান, গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি দপ্তরে দীর্ঘ নয় বছর ধরে কোনো স্থায়ী কর্মকর্তা পদায়ন করা হয়নি, যা সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে।
সব মিলিয়ে চিত্রটি স্পষ্ট—কেন্দ্রীয় প্রশাসনে সময়ানুবর্তিতার যে উদাহরণ তৈরি হয়েছে, তা এখনো মাঠপর্যায় পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেনি। নিয়মিত তদারকি ও জবাবদিহিতার অভাবে এই ব্যবধান দিন দিন আরও প্রকট হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সুত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন

