বিশ্ব মশা দিবস উপলক্ষে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের বাসিন্দাদের নিত্যদিনের এক ভোগান্তির চিত্র নতুন করে সামনে এসেছে। দিন হোক বা রাত, মশার উৎপাত থেকে যেন কোথাও নিস্তার নেই নগরবাসীর। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলেই অলিগলি, আবাসিক এলাকা, দোকানপাট থেকে শুরু করে অফিসপাড়া পর্যন্ত সর্বত্র বেড়ে যায় মশার দাপট। মশারি টাঙানো, কয়েল জ্বালানো কিংবা বৈদ্যুতিক যন্ত্র ব্যবহার—কোনো কিছুতেই মিলছে না স্থায়ী সমাধান। নগরের বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত ওষুধ ছিটানোর কথা থাকলেও বাস্তবে তার সুফল খুব একটা চোখে পড়ছে না বলে অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের।
এই সংকটের মধ্যেই ডেঙ্গুর পাশাপাশি নতুন করে আলোচনায় এসেছে মশাবাহিত এক বিরল রোগ, যা মস্তিষ্কে প্রদাহ ঘটাতে পারে। গত মে মাসে চট্টগ্রামের একটি পশুচিকিৎসা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপকের আকস্মিক মৃত্যু এই উদ্বেগকে আরও তীব্র করে তুলেছে। চিকিৎসকদের ধারণা, তিনি ওই রোগেই আক্রান্ত হয়েছিলেন, যদিও পরীক্ষার মাধ্যমে তা চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে সব তথ্য এক নয়। তবে তাঁর উপসর্গ এবং স্নায়বিক অবস্থার দ্রুত অবনতির সঙ্গে রোগটির লক্ষণের যথেষ্ট মিল ছিল বলে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ওই অধ্যাপক মে মাসের শুরুতে জ্বরে আক্রান্ত হন, সঙ্গে ছিল মাথাব্যথা, বমি ও শরীরে দুর্বলতা। এরপর দ্রুতই তাঁর অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে। খিঁচুনি ও জ্ঞান হারানোর মতো গুরুতর স্নায়বিক উপসর্গ দেখা দেওয়ায় প্রথমে তাঁকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার আরও অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্য একটি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়, তবে চিকিৎসাধীন অবস্থাতেই তাঁর মৃত্যু হয়।
চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে জানা গেছে, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরপরই তাঁর একাধিকবার স্ট্রোক হয় এবং স্থানান্তরের সময় হৃদযন্ত্র সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনাও ঘটে। চিকিৎসকদের সন্দেহ, ভাইরাসজনিত মস্তিষ্ক প্রদাহই তাঁর দ্রুত স্বাস্থ্য অবনতির কারণ হতে পারে। আরও জানা গেছে, মৃত্যুর কয়েক সপ্তাহ আগে তিনি পার্বত্য এলাকা বান্দরবান ভ্রমণ করেছিলেন এবং সেখান থেকে ফেরার পরই তাঁর মধ্যে জ্বরসহ নানা উপসর্গ দেখা দেয়—যদিও সংক্রমণের সুনির্দিষ্ট স্থান নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।
এই রোগটি মূলত একধরনের মশাবাহিত ভাইরাসজনিত সংক্রমণ, যা নির্দিষ্ট প্রজাতির মশার মাধ্যমে ছড়ায় এবং গুরুতর ক্ষেত্রে মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রে মারাত্মক প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে। জ্বর, মাথাব্যথা, বমি, খিঁচুনি ও জ্ঞান হারানোর মতো লক্ষণ এই রোগের সাধারণ বৈশিষ্ট্য।
জাপানিজ এনসেফালাইটিস নিয়ে উদ্বেগের পাশাপাশি চট্টগ্রামে ডেঙ্গু পরিস্থিতিও উল্লেখযোগ্যভাবে খারাপের দিকে যাচ্ছে। স্বাস্থ্য বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৯ আগস্ট পর্যন্ত চট্টগ্রাম জেলায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন প্রায় দেড় হাজার মানুষ, যার মধ্যে মৃত্যু হয়েছে তিনজনের।
মাসভিত্তিক পরিসংখ্যান বলছে, চলতি আগস্ট মাসেই সংক্রমণের হার সবচেয়ে বেশি—১৯ তারিখ পর্যন্ত ছয়শর বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন। এর আগের মাস জুলাইয়ে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল পাঁচশর বেশি, জুনে সোয়াশ, আর মে থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত মাসপ্রতি আক্রান্তের সংখ্যা ছিল তুলনামূলক কম। হিসাব করলে দেখা যায়, শুধু জুলাই ও আগস্টের ১৯ দিনেই মোট আক্রান্তের প্রায় আশি শতাংশ রোগী শনাক্ত হয়েছেন, যা বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গুর ঝুঁকি কতটা দ্রুত বাড়ে তার স্পষ্ট প্রমাণ।
দীর্ঘমেয়াদি হিসাবেও চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর চিত্র স্বস্তিদায়ক নয়। গত কয়েক বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৩ সালে জেলায় সর্বোচ্চ প্রায় চৌদ্দ হাজার মানুষ আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং মৃত্যু হয়েছিল শতাধিক মানুষের। এরপরের বছরগুলোতেও প্রতি বছর কয়েক হাজার মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন এবং একাধিক প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে।
মশা নিয়ন্ত্রণে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ব্যয় প্রতিবছরই বাড়ছে, কিন্তু তার তুলনায় ফলাফল সন্তোষজনক নয় বলে মনে করছেন নগরবাসী। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে মশা নিয়ন্ত্রণ খাতে প্রায় নয় কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যার একটি বড় অংশ ইতিমধ্যে ওষুধ ও যন্ত্রপাতি কেনায় ব্যয় হয়ে গেছে। এ ছাড়া ওষুধ ছিটানোর কাজে নিয়োজিত কর্মীদের বেতন বাবদও প্রতি মাসে উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় হচ্ছে।
আগের অর্থবছরের তুলনায় এবার বরাদ্দ ও ব্যয় দুটোই বেড়েছে। সংস্থাটির দীর্ঘমেয়াদি হিসাব বলছে, গত দুই দশকে মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে মোট ব্যয় হয়েছে কয়েক কোটি টাকা, যার সিংহভাগই ব্যয় হয়েছে সাম্প্রতিক এক দশকে।
নগরের সব ওয়ার্ডে মশা নিয়ন্ত্রণে কাজ করছেন কয়েকশ কর্মী, যাঁদের দাবি অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় পরপর প্রতিটি এলাকায় নিয়মিত ওষুধ ছিটানো হয়। তবে নগরবাসীর অভিজ্ঞতা ভিন্ন কথা বলছে—অনেকেই অভিযোগ করেছেন দীর্ঘ সময় ধরে মশককর্মীদের এলাকায় দেখা যায় না, আবার কোথাও ওষুধ ছিটানো হলেও তা যথেষ্ট সময় ধরে চলে না। এ বিষয়ে সংস্থাটির এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা কর্মী সংকটের কথা স্বীকার করে বলেছেন, বিপুলসংখ্যক নগরবাসীকে সীমিত জনবল দিয়ে সেবা দেওয়া প্রকৃতপক্ষে কঠিন একটি চ্যালেঞ্জ।
নগর স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ওষুধ ছিটিয়ে মশার বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। নগরের খাল, নালা, ড্রেন, নির্মাণাধীন ভবনের আশপাশ এবং বিভিন্ন পাত্রে জমে থাকা পানি মশার প্রজননের জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করে। বর্ষা মৌসুমে এই সমস্যা আরও প্রকট হয়ে ওঠে—একদিকে জলাবদ্ধতা, অন্যদিকে পানি নামার পর জমে থাকা স্বচ্ছ পানিতে এডিস মশার লার্ভা জন্মানোর সুযোগ তৈরি হয়, আবার নোংরা পানিতে অন্য প্রজাতির মশার বংশবিস্তারও বাড়ে।
এই বাস্তবতায় মশা নিয়ন্ত্রণে নতুন পদ্ধতি প্রয়োগের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। গত বছর সিটি করপোরেশন পরীক্ষামূলকভাবে একধরনের জৈবিক লার্ভিসাইড ব্যবহার শুরু করে, যা মূলত মশার লার্ভা পর্যায়েই ধ্বংস করতে সহায়ক। তবে এই পদ্ধতি কতটা ব্যাপকভাবে ও নিয়মিতভাবে প্রয়োগ হচ্ছে, তা নিয়ে এখনো প্রশ্ন রয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কার্যকর মশা নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রথমে প্রজননস্থল চিহ্নিত করা জরুরি। এরপর নিয়মিত লার্ভা জরিপ, প্রজননস্থল ধ্বংস, প্রয়োজনীয় ওষুধ প্রয়োগ, প্রাপ্তবয়স্ক মশা দমন এবং নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধি—এই সবগুলো পদক্ষেপ একযোগে নেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি নগরের ড্রেন ও খাল নিয়মিত পরিষ্কার রাখা, জলাবদ্ধতা দূর করা এবং নির্মাণাধীন স্থাপনায় জমে থাকা পানি অপসারণে কঠোর নজরদারি বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে সিটি করপোরেশনের এক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রমের পাশাপাশি মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে জনসচেতনতা বাড়ানোর কাজ চলছে। প্রজননস্থল ধ্বংস, নিয়মিত ওষুধ প্রয়োগ এবং নাগরিকদের নিজ নিজ এলাকায় জমে থাকা পানি অপসারণে উদ্বুদ্ধ করার কার্যক্রমও জোরদার করা হয়েছে বলে তিনি জানান।

