গত দুই সপ্তাহে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙ্গর ও প্রবেশ চ্যানেলে অন্তত পাঁচটি জাহাজ দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটেছে, যা দেশের প্রধান এই সমুদ্রবন্দরের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা ও নাবিকদের অনভিজ্ঞতা—দুইয়ের মিশেলেই ক্রমেই বিপজ্জনক হয়ে উঠছে বন্দরের প্রবেশপথ।
জানা গেছে, সাগরের আবহাওয়াগত পরিবর্তনের প্রভাবে বন্দর চ্যানেলে স্রোতের গতি ও বাতাসের বেগ একইসঙ্গে বেড়ে গেছে, যার ফলে বড় মাদার ভেসেল ও পণ্য খালাসে ব্যবহৃত লাইটার জাহাজ—উভয়ই বিপাকে পড়ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চ্যানেল সম্পর্কে অপর্যাপ্ত ধারণা, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হলো, তেত্রিশ হাজার টন ডিজেলবাহী একটি ট্যাংকারের সঙ্গে গমবাহী একটি জাহাজের সংঘর্ষ, যাতে ইঞ্জিন রুম ফেটে যায় এবং পুরো জাহাজে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এর কিছুদিনের মধ্যেই আরেকটি জাহাজ বন্দরের প্রবেশমুখে স্টিয়ারিং যন্ত্র বিকল হয়ে বিপাকে পড়ে। এ ছাড়া প্রবল স্রোতের টানে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ধাতব বর্জ্যবাহী একটি জাহাজ পাশের অন্য একটি জাহাজে গিয়ে ধাক্কা মারে। এসব বড় ঘটনার পাশাপাশি ছোট লাইটার জাহাজগুলোর মধ্যেও গত কয়েক সপ্তাহে একাধিক সংঘর্ষ ঘটেছে, যা বঙ্গোপসাগরের এই গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রধান জলপরিমাপ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, স্বাভাবিক আবহাওয়াগত প্রভাবের পাশাপাশি গত দুই মাসে বঙ্গোপসাগরে দক্ষিণ-পশ্চিমা মৌসুমি বায়ুর প্রভাব অস্বাভাবিক রকম বেশি ও সক্রিয় থেকেছে। এর ফলে বন্দরের মূল প্রবেশপথ ও বাইরের নোঙ্গর এলাকা প্রায় সবসময়ই উত্তাল থাকছে, যা দুর্ঘটনা বৃদ্ধির একটি প্রধান কারণ বলে চিহ্নিত করেছে বন্দরের নৌ-বিভাগ। তাঁর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, জোয়ারের বিশেষ পর্যায়, নিম্নচাপ এবং মৌসুমি বায়ু—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে সক্রিয় হওয়ায় জাহাজের নোঙর ঠিকভাবে আটকে থাকতে পারছে না, আবার ছোট জাহাজগুলোর পণ্য ওঠানো-নামানোতেও সমস্যা হচ্ছে।
বন্দর বিশেষজ্ঞ ও একজন অভিজ্ঞ বিচিং মাস্টারের মতে, বহির্নোঙ্গর এলাকায় পানির গভীরতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি মূল চ্যানেল সম্পর্কে নতুন ও বিদেশি নাবিকদের পর্যাপ্ত জ্ঞান না থাকা এবং সঠিক পদ্ধতিতে নোঙর না ফেলার প্রবণতাও দুর্ঘটনা বাড়ার একটি বড় কারণ।
তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, নির্দিষ্ট একটি নোঙর এলাকায় পানির গভীরতা বারো থেকে তেরো মিটার হলেও সেখানে আসা জাহাজগুলোর প্রয়োজন হয় দশ থেকে এগারো মিটার। অথচ নিরাপদ চলাচলের জন্য জাহাজের প্রয়োজনীয় গভীরতার দেড় গুণ পানি থাকা জরুরি—যা না থাকায় ঘটছে দুর্ঘটনা। পাশাপাশি পূর্ণিমা ও অমাবস্যার সময় বাতাসের গতিবেগ বেড়ে গেলে নোঙর সরে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়, আর নোঙর এলাকাগুলো তুলনামূলক ছোট হলেও সেখানে অনেক জাহাজ একসঙ্গে অবস্থান করায় জাহাজ ঘোরানোর সময়ও দুর্ঘটনা ঘটছে।
এ ছাড়া লাইটার জাহাজের মাস্টারদের ভাষ্যে উঠে এসেছে, জাহাজের ওজনের সঙ্গে নোঙরের সামঞ্জস্যহীনতা এবং দক্ষ নাবিকের সংকটও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে কাজ করছে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, প্রকৃতির এই পরিবর্তনশীল আচরণের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বন্দরের নাব্যতা সংকট দ্রুত সমাধান করা, লাইটার জাহাজবহর আধুনিকায়ন করা এবং অভিজ্ঞ পাইলটদের মাধ্যমে জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করা না গেলে যেকোনো সময় বন্দর চ্যানেলে আরও বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারে।

