বাংলাদেশের বর্তমান বিদ্যুৎ সংকটকে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের ঘাটতি হিসেবে দেখলে পুরো বাস্তবতা বোঝা যাবে না। কারণ দেশে একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে, উৎপাদন সক্ষমতাও বেড়েছে। তারপরও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মানুষকে দীর্ঘ সময় ধরে লোডশেডিংয়ের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংকটের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের নীতিগত ভুল, ব্যয়বহুল বিদ্যুৎ চুক্তি, জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে অবহেলা এবং বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামোয় পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাব।
চলতি মাসে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ঘাটতি এক দিনে ৩ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটের বেশি হয়েছে। এর ফলে গ্রামাঞ্চলের অনেক পরিবারকে প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎবিহীন থাকতে হচ্ছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, দেশের মানুষ প্রশ্ন তুলছে—বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকার পরও কেন এই সংকট?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এর উত্তর খুঁজতে হলে গত তিন দশকের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ নীতির দিকে তাকাতে হবে।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সঞ্চালন ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব। দেশে দ্রুত বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হলেও সেই বিদ্যুৎ মানুষের ঘরে পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় গ্রিড ও সঞ্চালন অবকাঠামো একই গতিতে তৈরি হয়নি।
ফলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যেখানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও তা পুরোপুরি ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
বর্তমানে বাংলাদেশ যে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার জন্য অর্থ ব্যয় করেছে, তার মধ্যে প্রায় ৭ হাজার ৭০০ থেকে ৯ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ অব্যবহৃত পড়ে আছে। এর কিছু অংশ অতিরিক্ত সক্ষমতা, যা দেশের প্রকৃত চাহিদার তুলনায় বেশি। আবার কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র জ্বালানি সংকট বা গ্রিড সংযোগের সমস্যার কারণে উৎপাদনে যেতে পারছে না।
বিদ্যুৎকেন্দ্র আগে তৈরি করে পরে সঞ্চালন ব্যবস্থা উন্নত করার এই পরিকল্পনাগত ভুলের কারণে বাংলাদেশকে বছরে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা বহন করতে হচ্ছে।
দেশের জ্বালানি সংকটের আরেকটি বড় কারণ হলো আমদানিনির্ভরতা। ২০১৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানিতে ১৭.৬ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। এই অর্থ দেশের পুরো এক বছরের অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদনের দেড় গুণেরও বেশি।
অন্যদিকে নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধানে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন পিছিয়ে রয়েছে। গত ৫০ বছরে বাংলাদেশ প্রায় ১০০টি অনুসন্ধান কূপ খনন করেছে। অথচ ভারত শুধুমাত্র ২০১৭–১৮ অর্থবছরেই ৫৪৫টি তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান কূপ খনন করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের সমস্যা প্রাকৃতিক সম্পদের অভাব নয়; বরং বিদ্যমান সম্পদের যথাযথ ব্যবহার ও অনুসন্ধানে দীর্ঘদিনের অবহেলা।
এর একটি বড় উদাহরণ ভোলা উত্তর গ্যাসক্ষেত্র। দেশে গ্যাস সংকট থাকা সত্ত্বেও এই গ্যাসক্ষেত্রের গ্যাস ব্যবহার করার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি হয়নি। ফলে সম্ভাবনাময় একটি দেশীয় উৎস এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
বিদ্যুৎ খাতের ব্যয়বহুল চুক্তিগুলোর মধ্যে ভারতের ঝাড়খণ্ডের আদানি গড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ আমদানির বিষয়টি সবচেয়ে বেশি আলোচিত।
২০২৩ সালে বাংলাদেশ আদানি গড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের জন্য ১৪.০২ টাকা পরিশোধ করেছে। অথচ একই বছর ভারতের বিদ্যুৎ এক্সচেঞ্জে একই ধরনের বিদ্যুতের দাম ছিল ৭.৮৩ টাকা প্রতি ইউনিট। অর্থাৎ বাংলাদেশকে প্রায় ৭৯ শতাংশ বেশি মূল্য দিতে হয়েছে।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রকাশিত জাতীয় পর্যালোচনা কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, এই চুক্তিতে বাংলাদেশের পরবর্তী সেরা বিকল্পের তুলনায় ৩৯.৭ শতাংশ বেশি প্রিমিয়াম ছিল। একই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এই একটি চুক্তির কারণে দেশের জাতীয় গড় বিদ্যুৎ ট্যারিফ ৭.৬৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
২০১৭ সালে স্বাক্ষরিত এই চুক্তির শর্তগুলো দীর্ঘদিন জনসম্মুখে প্রকাশ করা হয়নি। এখন এর প্রভাব সাধারণ মানুষের বিদ্যুৎ বিলেও পড়ছে।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হলো রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। এই কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের সম্ভাব্য খরচ প্রায় ১০ টাকা প্রতি ইউনিট, যা ঢাকার চাহিদা পূরণে ব্যবহৃত তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় প্রায় অর্ধেক।
কিন্তু সমস্যা হলো, রূপপুরের উৎপাদিত বিদ্যুৎ রাজধানীসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পৌঁছানোর জন্য প্রয়োজনীয় সঞ্চালন অবকাঠামো সময়মতো প্রস্তুত হয়নি। অর্থাৎ কম খরচের বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ থাকলেও তা মানুষের কাছে পৌঁছাতে বাধা তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য শক্তির সম্ভাবনাও এখনো যথেষ্ট ব্যবহার করা হয়নি। দেশটি বছরে ২৫০ দিনের বেশি সময় সূর্যালোক পায়, কিন্তু সৌরবিদ্যুৎ খাতে অগ্রগতি তুলনামূলক ধীর।
প্রতিবেশী পাকিস্তান একই ধরনের ভৌগোলিক বাস্তবতা থাকা সত্ত্বেও তিন বছরেরও কম সময়ে ৩৪ হাজার মেগাওয়াট রুফটপ সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা তৈরি করেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় পর মোট সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা দাঁড়িয়েছে মাত্র ১ হাজার ৩২৩ মেগাওয়াট, যা পাকিস্তানের সক্ষমতার প্রায় ৪ শতাংশ।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পার্থক্যের কারণ সূর্যালোকের অভাব নয়; বরং নীতি, অনুমোদন প্রক্রিয়া, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং বিনিয়োগ পরিবেশ।
বাংলাদেশের গ্যাস মজুত নিয়েও রয়েছে উদ্বেগ। বর্তমান ব্যবহারের হার অব্যাহত থাকলে দেশের প্রমাণিত গ্যাস মজুত ২০৩০-এর দশকের শুরুর দিকের পর সংকটে পড়তে পারে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, গ্যাস মজুত শেষ হওয়ার সম্ভাব্য সময়সীমা ২০৩৩ থেকে ২০৪০ সালের মধ্যে।
এই সময়সীমার পার্থক্যই দেখায় যে দেশের জ্বালানি পরিকল্পনায় আরও নির্ভুল ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।
বর্তমানে দেশের অফশোর গ্যাস অনুসন্ধান, নোয়াখালীসহ বিভিন্ন এলাকায় মূল্যায়ন কূপ খনন এবং সঞ্চালন অবকাঠামো উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব পদক্ষেপ আরও ১০, ১৫ বা ২০ বছর আগে নেওয়া হলে বর্তমান সংকট অনেকটাই এড়ানো সম্ভব ছিল।
বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অতীতের ভুল সিদ্ধান্ত থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি, সাশ্রয়ী ও টেকসই জ্বালানি পরিকল্পনা তৈরি করা।
কারণ দেশের বর্তমান বিদ্যুৎ সংকট শুধু উৎপাদনের সমস্যা নয়; এটি পরিকল্পনা, বিনিয়োগ, অবকাঠামো এবং নীতিনির্ধারণের দীর্ঘদিনের দুর্বলতার ফল।
সাধারণ মানুষ প্রতিদিন সন্ধ্যায় যে হিসাব করেন—আজ বিদ্যুৎ থাকবে কি না, কখন যাবে, কখন আসবে—এখন সেই হিসাবই নীতিনির্ধারকদের করতে হবে।
প্রশ্ন হলো, আগামী দশকের জন্য বাংলাদেশ কি এবার সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবে, নাকি অতীতের ভুলের মাশুল আরও দীর্ঘদিন বহন করতে হবে?

