ত্রিশ বছর যেকোনো চুক্তির টিকে থাকার জন্যই দীর্ঘ সময়। ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর নয়াদিল্লিতে স্বাক্ষরিত গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি তিন দশক ধরে নীরবে নিয়ন্ত্রণ করে আসছে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের কাছে কতটা পানি পৌঁছাবে। এটি দুই স্বাক্ষরকারী দেশের বিভিন্ন সরকারের পরিবর্তন টিকে গেছে। চুক্তিটির মেয়াদ শেষ হবে ১২ ডিসেম্বর, ২০২৬। এর পরিবর্তে কী আসবে, তা নিয়ে ঢাকা ও নয়াদিল্লিতে আলোচনা চলছে। কিন্তু আলোচনা আর চুক্তি এক বিষয় নয়, এবং প্রথমটির মেয়াদ শেষ হওয়ার সময় দ্বিতীয়টি অস্তিত্বে থাকবে—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই।
তাই এখনই শান্তভাবে প্রশ্ন করা জরুরি, ডিসেম্বর এলে আতঙ্কে নয়—যদি নতুন চুক্তি না হয়, তাহলে কী হবে? বাংলাদেশ কি কেবল নদীর ওপর তার দাবি হারিয়ে ফেলবে এবং ভারত উদার হবে—এই আশায় বসে থাকবে? উদ্বেগটি অমূলক নয়। দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে প্রতি শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার দেওয়া পানির ওপর নির্ভরশীল—সেচ, পানীয় জল, মৎস্যসম্পদ, এমন একটি উপকূল রক্ষা করা, যেটিকে লবণাক্ত পানি এখনো পুরোপুরি গ্রাস করেনি। কিন্তু এই উদ্বেগের পেছনে আন্তর্জাতিক আইন আসলে কীভাবে কাজ করে, সে সম্পর্কে একটি ভুল বোঝাবুঝি রয়েছে। একটি চুক্তিই এমন একমাত্র ব্যবস্থা নয়, যা উজানের রাষ্ট্রকে পানির কলের ওপর লাগামহীন হাত রাখার হাত থেকে বিরত রাখে। এর নিচে রয়েছে আইনের একটি কাঠামো, যা প্রযোজ্য হয়—দুই সরকার কোনো চুক্তিতে স্বাক্ষর করুক বা না করুক।
একটি পুরোনো যুক্তি, যার মীমাংসা বহু আগেই হয়েছে
১৮৯৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটর্নি জেনারেল—বাংলাদেশের পরিভাষায় আইনমন্ত্রীর সমতুল্য—জাডসন হারমন মেক্সিকোর সঙ্গে রিও গ্র্যান্ডে নদী নিয়ে বিরোধে যুক্তি দিয়েছিলেন যে, একটি দেশ তার নিজের ভূখণ্ডের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত পানি নিয়ে যা খুশি করতে পারে; ভাটির দিকে এর পরিণতি বা প্রভাব যা-ই হোক না কেন। আপনি যদি উজানের দেশ হন, তাহলে এটি নিঃসন্দেহে একটি আকর্ষণীয় যুক্তি। এবং কিছু সময়ের জন্য এই আগ্রাসী মতবাদের সমর্থকও ছিল। আজ আর নেই। কোনো স্বীকৃত আদালত কখনো এটি সমর্থন করেনি এবং আজ কোনো গুরুতর সরকারও এটিকে রক্ষা করে না। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রও এক দশকের মধ্যে এই অবস্থান থেকে সরে এসে মেক্সিকোর সঙ্গে একটি পানি বণ্টন চুক্তি করেছিল—যার যতটুকু মূল্যই থাকুক।
অন্য চরম যুক্তিটিও—যে ভাটির দেশ নদীর পানির প্রবাহ চিরকালের জন্য সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় দাবি করতে পারে—সমান দ্রুত ভেঙে পড়ে। এর কারণ খুবই স্পষ্ট: তাহলে উজানের রাষ্ট্রগুলো একটি সেচ খালও নির্মাণ করতে পারত না।
যা টিকে গেছে এবং আজ বাস্তবে যা প্রযোজ্য, তা এই দুই চরম অবস্থানের মাঝামাঝি। নদী ভাগাভাগি করা রাষ্ট্রগুলো নিজেদের ভূখণ্ডের ভেতরের পানির ওপর সার্বভৌমত্ব বজায় রাখে, কিন্তু সেই সার্বভৌমত্বের সঙ্গে কিছু শর্তও যুক্ত থাকে—পানি যুক্তিসঙ্গতভাবে ব্যবহার করতে হবে এবং প্রতিবেশীদের ক্ষতি করা যাবে না।
এটি কোনো তত্ত্ব নয়, যা শিক্ষাবিদদের কল্পনা থেকে এসেছে। ১৯২৯ সালে পার্মানেন্ট কোর্ট অব ইন্টারন্যাশনাল জাস্টিস (PCIJ) বলেছিল, একটি আন্তর্জাতিক নদী তা ভাগাভাগি করা রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একটি “community of interest” বা অভিন্ন স্বার্থের সম্পর্ক সৃষ্টি করে—একটি যৌথ অংশীদারিত্ব, যাকে কোনো একক নদীতীরবর্তী রাষ্ট্র অগ্রাহ্য করতে পারে না। (Territorial Jurisdiction of the International Commission of the River Oder)। এটি আধুনিক প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তি তৈরি করে। ১৯৫৭ সালে ফ্রান্স ও স্পেনের মধ্যে পিরেনিজ পর্বতমালার একটি হ্রদ নিয়ে বিরোধে একটি সালিশি ট্রাইব্যুনাল একই ধরনের বক্তব্য দেয়—উজানের রাষ্ট্রকে কোনো প্রকল্প নির্মাণের জন্য ভাটির রাষ্ট্রের অনুমতি নিতে হয় না, কিন্তু তাকে অবশ্যই আন্তরিকভাবে, সদিচ্ছার সঙ্গে পরামর্শ করতে হবে এবং সত্যিকার অর্থে অপর পক্ষের কথা শুনতে হবে।
বিশ্ব আদালত কী রায় দিয়েছে
এ বিষয়ে সবচেয়ে স্পষ্ট বক্তব্য এসেছে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (ICJ) থেকেই।
১৯৯৭ সালে দানিয়ুব নদীর ওপর বাঁধ নিয়ে হাঙ্গেরি ও স্লোভাকিয়ার বিরোধে আদালত বলেছিল, নদী ভাগাভাগি করা প্রতিটি রাষ্ট্রই এর পানির একটি “equitable and reasonable share”—অর্থাৎ ন্যায়সঙ্গত ও যুক্তিসঙ্গত অংশের অধিকারী। আইসিজে স্পষ্ট করে দিয়েছিল, এটি কেবল কোনো নির্দিষ্ট চুক্তিতে কী লেখা আছে, তার বিষয় নয়; বরং সাধারণভাবে আন্তর্জাতিক আইনের একটি নিয়ম।
তেরো বছর পর, আর্জেন্টিনা ও উরুগুয়ের মধ্যে একটি কাগজ ও পাল্প মিল নিয়ে বিরোধের রায়ে আদালত আরও এক ধাপ এগিয়ে যায়। আদালত বলেছিল, কোনো রাষ্ট্র যদি এমন কোনো প্রকল্প হাতে নেয়, যা একটি যৌথ নদীর ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে, তাহলে তাকে যথাযথ পরিবেশগত সমীক্ষা করতে হবে এবং কাজ শুরু করার আগে প্রতিবেশী রাষ্ট্রকে অবহিত করতে হবে। (Construction of Pulp Mill near Fray Bentos, 2010)।
২০১৫ সালে সান হুয়ান নদীর ওপর সড়ক নির্মাণ নিয়ে কোস্টারিকা ও নিকারাগুয়ার মধ্যে সীমান্ত বিরোধে আদালত আবারও একই দায়িত্বের বিষয়টি নিশ্চিত করে।
সুতরাং, এটি কোনো প্রান্তিক আইনি তত্ত্ব নয়। বরং বিশ্ব আদালত একের পর এক মামলায়, দশকের পর দশক ধরে একই কথা বলে আসছে।
সিন্ধু থেকে একটি সতর্কবার্তা
এই নিয়মগুলো যে গুরুত্বপূর্ণ, সে বিষয়ে যদি কারও সন্দেহ থাকে, তাহলে পাশের দিকেই তাকান। ১৯৬০ সালের ভারত-পাকিস্তান সিন্ধু পানি চুক্তি দক্ষিণ এশিয়ায় পানি কূটনীতির সবচেয়ে কাছাকাছি উদাহরণ। এই চুক্তি দুইটি যুদ্ধ এবং অন্তহীন রাজনৈতিক বৈরিতার মধ্যেও টিকে ছিল। কিশেঙ্গঙ্গা জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যখন সত্যিকারের বিরোধ দেখা দেয়, তখন তারা অস্ত্রের ঝনঝনানি শুরু করেনি। তারা হেগে সালিশের দ্বারস্থ হয়েছিল, যেখানে ২০১৩ সালে ভারতকে ভাটির দিকে ন্যূনতম পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়। উভয় পক্ষই তা মেনে নেয়। দশকের পর দশক ধরে এই চুক্তি সারা বিশ্বে প্রমাণ হিসেবে উদ্ধৃত হয়েছে যে, এমনকি বৈরী প্রতিবেশীরাও শক্তির বদলে আইনের মাধ্যমে একটি অভিন্ন নদী পরিচালনা করতে পারে।
তারপর ২০২৫ সালের এপ্রিলে, ভারত-নিয়ন্ত্রিত জম্মু ও কাশ্মীরে ২৬ জন বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যুর কারণ হওয়া পেহেলগাম ঘটনার পর, ভারত চুক্তিটিকে “in abeyance” বা স্থগিত অবস্থায় রাখে। দুই দেশের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধের সময়ও এর আগে কখনো এমনটি করা হয়নি। ভারত ২০২৬ সাল পর্যন্ত সেই অবস্থান ধরে রেখেছে এবং তাদের বিরুদ্ধে দেওয়া নতুন একটি সালিশি রায়কে এড়িয়ে গেছে বা উপেক্ষা করেছে। মূল বিরোধ নিয়ে যার যা মতই থাকুক, ঢাকার জন্য শিক্ষা অত্যন্ত স্পষ্ট—কোনো চুক্তির বয়স ও খ্যাতি তার টিকে থাকার নিশ্চয়তা নয়। গঙ্গা নিয়ে বাংলাদেশের পরিকল্পনা হওয়া উচিত বাস্তবতাকে সামনে রেখে, স্বস্তিদায়ক অনুমানের ওপর নয়।
এতে বাংলাদেশের অবস্থান কোথায়
এর কোনোটিই নতুন চুক্তির জন্য চাপ কমানোর যুক্তি নয়—বরং ঠিক উল্টোটা। একটি যথাযথ চুক্তি, যেখানে হালনাগাদ পানিপ্রবাহের সূত্র, যৌথ পর্যবেক্ষণ এবং বাস্তবসম্মত বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা থাকবে, তা সব সময়ই সাধারণ আইনি নীতির ওপর নির্ভর করার চেয়ে ভালো। প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইন বাস্তব। কিন্তু এর প্রকৃতি বিস্তৃত, আর বিস্তৃত নিয়মকে একটি নির্দিষ্ট বিরোধে প্রয়োগ করা সব সময়ই চুক্তিতে লিখিত নির্দিষ্ট সংখ্যার তুলনায় কঠিন।
আজকের জলবিদ্যার বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ শর্তে চুক্তি নবায়ন—১৯৫০ থেকে ১৯৮০-এর দশকের তথ্যের পরিবর্তে—ঢাকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হয়ে থাকা উচিত। যৌথ নদী কমিশনের আলোচনায় এবং সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পর্যায়ে এই বিষয়টি সবার চিন্তার কেন্দ্রে থাকা উচিত।
তবে ডিসেম্বর এসে চলে গেলেও যদি কোনো নতুন উত্তরসূরি চুক্তি স্বাক্ষরিত না হয়, বাংলাদেশ কিন্তু শূন্য হাতে থাকবে না। আন্তর্জাতিক প্রথাগত আইন এবং আন্তর্জাতিক বিচার আদালত বারবার যে নীতিগুলো নিশ্চিত করেছে, তার অধীনে ভারত তখনও বাধ্য থাকবে গঙ্গার পানি যুক্তিসঙ্গতভাবে ব্যবহার করতে, বাংলাদেশের নিজস্ব নদী ব্যবহারে গুরুতর ক্ষতি এড়াতে, পানিপ্রবাহে প্রভাব ফেলতে পারে এমন নতুন কোনো প্রকল্প গ্রহণের আগে বাংলাদেশকে অবহিত ও পরামর্শ করতে এবং আগে যথাযথ পরিবেশগত মূল্যায়ন করতে।
এসব এমন কোনো অনুগ্রহ নয়, যা ভারত চাইলে বাংলাদেশকে দেবে। এগুলো আইনি বাধ্যবাধকতা।
বাংলাদেশের উচিত এটি স্পষ্টভাবে, বারবার এবং যেখানে তার কণ্ঠ পৌঁছায় সেখানেই বলা—জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদসহ। এখন থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত, এবং প্রয়োজনে তার পরেও।
একটি নদী কোনো চুক্তি পড়ে না। কাগজে কী লেখা আছে, তা নির্বিশেষে বহু দূরের উজানে নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নদীর পানি বাড়ে-কমে। কিন্তু নদী ভাগাভাগি করা রাষ্ট্রগুলো তবুও আইনের দ্বারা আবদ্ধ থাকে—চুক্তি থাকুক বা না থাকুক।
এখন থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশের দুটি বিষয়ে মনোযোগী থাকা জরুরি, যদি এভাবে বলা যায়—
ন্যায্য নবায়নের জন্য কঠোরভাবে আলোচনা করা এবং ভারতকে এমনভাবে বুঝিয়ে দেওয়া, যাতে কোনো সন্দেহ না থাকে—গঙ্গার পানির ওপর বাংলাদেশের অধিকার কখনোই কেবল ১৯৯৬ সালের চুক্তির কালিতে লেখা ছিল না।
মুহাম্মদ নওশাদ জামির একজন সংসদ সদস্য এবং ব্যারিস্টার-অ্যাট-ল।

