দেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় গত কয়েক বছরে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। নতুন কূপ খনন, পুরোনো কূপ সংস্কার এবং উৎপাদন বাড়ানোর বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও জাতীয় গ্রিডে দেশীয় গ্যাসের সরবরাহ বাড়েনি। বরং উল্টো কমেছে। ফলে ক্রমবর্ধমান ঘাটতি পূরণে আমদানীকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরতা দ্রুত বাড়ছে।
২০১৮ সালে দেশে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি শুরু হয়েছিল মূলত স্থানীয় গ্যাসের ঘাটতি সামাল দেওয়ার জন্য। সে সময় জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা মোট গ্যাসের মাত্র ১১ শতাংশ আসত আমদানীকৃত উৎস থেকে। কিন্তু সাত বছরের ব্যবধানে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সেই হিস্যা বেড়ে ৩৬ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ যে জ্বালানি একসময় ঘাটতি মোকাবিলার সহায়ক ব্যবস্থা ছিল, এখন সেটিই জাতীয় গ্যাস সরবরাহের একটি বড় ভিত্তিতে পরিণত হয়েছে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ হয়েছিল ১ হাজার ৭৮ বিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় উৎস থেকে এসেছিল ৯৬৫ বিলিয়ন ঘনফুট। আর আমদানীকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে এসেছিল ১১৩ বিলিয়ন ঘনফুট। সে সময় আমদানির অংশ ছিল মোট সরবরাহের প্রায় ১১ শতাংশ।
সাত বছর পর চিত্রটি অনেকটাই পাল্টে গেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতীয় গ্রিডে মোট গ্যাস সরবরাহ হয়েছে ৯৮০ বিলিয়ন ঘনফুট, যা সাময়িক হিসাব। এর মধ্যে দেশীয় উৎস থেকে সরবরাহ হয়েছে ৬২৮ বিলিয়ন ঘনফুট। বিপরীতে আমদানীকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ দাঁড়িয়েছে ৩৫২ বিলিয়ন ঘনফুটে।
অর্থাৎ এই সময়ে দেশীয় গ্যাসের সরবরাহ ৩৩৭ বিলিয়ন ঘনফুট কমেছে। অন্যদিকে আমদানীকৃত গ্যাসের সরবরাহ বেড়েছে ২৩৯ বিলিয়ন ঘনফুট। এর ফলে জাতীয় গ্রিডে আমদানীকৃত গ্যাসের অংশ ১১ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় ৩৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
এই পরিবর্তনের পেছনে স্থানীয় গ্যাসের উৎপাদন কমে যাওয়া অন্যতম কারণ। দেশের পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর অনেকগুলোতেই সময়ের সঙ্গে উৎপাদন কমেছে। নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার ও উৎপাদনে আনার কাজও প্রত্যাশিত গতিতে এগোয়নি। ফলে একদিকে দেশীয় উৎস থেকে সরবরাহ কমেছে, অন্যদিকে শিল্প, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য খাতে গ্যাসের চাহিদা অব্যাহত রয়েছে।
এই ঘাটতি পূরণ করতেই আমদানীকৃত গ্যাসের ওপর নির্ভরতা বাড়ানো হয়েছে। ফলে জাতীয় গ্রিডের সরবরাহ ব্যবস্থা এখন অনেক বেশি আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
দৈনিক সরবরাহের পরিসংখ্যানেও বিষয়টি স্পষ্ট। পেট্রোবাংলার গ্যাস সরবরাহ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গতকাল জাতীয় গ্রিডে মোট ২ হাজার ৬২৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে। এর মধ্যে আমদানীকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে এসেছে ১ হাজার ২ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ ওই দিনের মোট সরবরাহের প্রায় ৩৮ শতাংশই এসেছে আমদানীকৃত উৎস থেকে।
দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমার বিপরীতে কূপ খনন ও সংস্কারের মাধ্যমে সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু কূপ খননের সংখ্যা বাড়লেই যে গ্যাস উৎপাদন বাড়বে, এমন নিশ্চয়তা নেই। নতুন অনুসন্ধান কূপ, মূল্যায়ন কূপ এবং পুরোনো কূপ সংস্কারের উদ্দেশ্য এক নয়। ফলে মোট কতটি কূপ খনন করা হয়েছে, তার চেয়ে কতটি নতুন গ্যাসের মজুদ আবিষ্কৃত হয়েছে এবং সেখান থেকে বাস্তবে কত গ্যাস উৎপাদনে এসেছে—সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
২০১০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশে ১১২টি কূপ খননের তথ্য পাওয়া যায়। তবে এই সময়ে নতুন করে খনন করা কূপের সংখ্যা ছিল ৩৮টি। এর মধ্যে প্রায় ১০টি ছিল অনুসন্ধান কূপ। বাকি কূপগুলোর বড় অংশ মূল্যায়ন ও সংস্কারকাজে ব্যবহৃত হয়েছে।
এই হিসাব থেকে বোঝা যায়, কূপ খননের মোট সংখ্যা দিয়ে দেশের গ্যাস অনুসন্ধানের প্রকৃত অগ্রগতি পরিমাপ করা যায় না। কোনো পুরোনো কূপ সংস্কার করলে সাময়িকভাবে উৎপাদন বাড়তে পারে, কিন্তু সেটি নতুন গ্যাসের মজুদ আবিষ্কারের সমতুল্য নয়। আবার একটি অনুসন্ধান কূপ খনন করলেও সেখানে বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য গ্যাস পাওয়া যাবে—এমন নিশ্চয়তাও থাকে না।
ফলে কূপ খনন ও সংস্কারে কার্যক্রম থাকলেও জাতীয় গ্রিডে দেশীয় গ্যাসের সরবরাহ বাড়েনি। বরং সামগ্রিক হিসাবে দেশীয় উৎস থেকে সরবরাহ কমেছে। এর অর্থ হলো, অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর যে উদ্যোগগুলো নেওয়া হয়েছে, সেগুলো এখন পর্যন্ত চাহিদা ও ঘাটতির তুলনায় পর্যাপ্ত ফল দিতে পারেনি।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে দীর্ঘদিনের অনুসন্ধান ঘাটতি বড় কারণ। গত দুই দশকে স্থলভাগে নতুন গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে বড় পরিসরের ধারাবাহিক উদ্যোগ নেওয়া যায়নি। একইভাবে বঙ্গোপসাগরের বিস্তীর্ণ এলাকায় গ্যাস অনুসন্ধানেও এক দশকের বেশি সময় ধরে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।
ফলে দেশের সম্ভাবনাময় নতুন গ্যাসের মজুদ শনাক্ত ও উৎপাদনে আনার সুযোগ সীমিত থেকেছে। অন্যদিকে অর্থনীতি ও শিল্প খাতে গ্যাসের প্রয়োজন থেমে থাকেনি। বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা, সার উৎপাদনসহ বিভিন্ন খাতে গ্যাসের চাহিদা বজায় থাকায় সরবরাহ ঘাটতি পূরণের জন্য আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ানো হয়েছে।
দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে পরিকল্পনার ঘাটতিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে ২০২৫ সালের মধ্যে ৫০টি কূপ খননের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেই কর্মসূচি বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। পরে নতুন করে ১৫০টি কূপ খননের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে।
তবে এই নতুন কর্মসূচির ফলও তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়ার সুযোগ নেই। জ্বালানি বিভাগ ও পেট্রোবাংলার ধারণা অনুযায়ী, ১৫০টি কূপ খননের কর্মসূচি বাস্তবায়নে ২০৩২ সাল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। অর্থাৎ দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর বর্তমান পরিকল্পনার ফল পেতে আরও কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হতে পারে।
এই সময়ের মধ্যে গ্যাসের চাহিদা পূরণে আমদানীকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরতা বজায় রাখার প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বড় ধরনের আর্থিক ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপ।
পেট্রোবাংলার হিসাব অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত দেশে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানিতে প্রায় ২ লাখ ৭৭ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। একই সময়ে আমদানীকৃত গ্যাস তুলনামূলক সাশ্রয়ী মূল্যে সরবরাহ করতে সরকারকে ৪৮ হাজার কোটি টাকার বেশি ভর্তুকি দিতে হয়েছে।
অর্থাৎ আমদানিনির্ভর গ্যাস ব্যবস্থার ব্যয় শুধু পণ্য কেনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। আন্তর্জাতিক বাজারের দামের ওঠানামা এবং বিনিময় হারের পরিবর্তনের প্রভাবও এর সঙ্গে যুক্ত। আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের দাম বেড়ে গেলে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হলে সেই ব্যয় আরও বাড়ার ঝুঁকি থাকে।
সরকারকে আবার ভোক্তা ও শিল্পের জন্য গ্যাসের দাম তুলনামূলক সহনীয় রাখতে ভর্তুকি দিতে হয়। ফলে একদিকে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে সরকারি অর্থের ওপরও চাপ তৈরি হচ্ছে।
গ্যাসের এই আমদানিনির্ভরতা শিল্পের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। দেশের বিভিন্ন শিল্পকারখানা নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল। গ্যাসের ঘাটতি হলে উৎপাদন কমে যেতে পারে, কারখানার পরিচালন ব্যয় বাড়তে পারে এবং শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রেও গ্যাসের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ফলে দেশীয় গ্যাসের সরবরাহ কমতে থাকলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পের পাশাপাশি সামগ্রিক অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়তে পারে। সেই জায়গায় আমদানীকৃত গ্যাস একটি তাৎক্ষণিক সমাধান দিতে পারলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে।
এখানে বাংলাদেশের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হলো স্বল্পমেয়াদি সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা তৈরি করা। এলএনজি আমদানি করে বর্তমান ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব, কিন্তু দেশীয় অনুসন্ধান ও উৎপাদন না বাড়ালে ভবিষ্যতে আমদানির অংশ আরও বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
২০১৮-১৯ অর্থবছরে জাতীয় গ্রিডে আমদানীকৃত গ্যাসের অংশ যেখানে ছিল প্রায় ১১ শতাংশ, সেখানে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা ৩৬ শতাংশে পৌঁছেছে। এই পরিবর্তন খুব অল্প সময়ের মধ্যে দেশের গ্যাস সরবরাহ কাঠামোর বড় রূপান্তরকে নির্দেশ করছে।
এখন ১৫০টি কূপ খননের যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, তার বাস্তবায়ন তাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে শুধু কূপের সংখ্যা বাড়ানো যথেষ্ট হবে না। কোথায় অনুসন্ধান করা হচ্ছে, কী ধরনের কূপ খনন করা হচ্ছে, নতুন মজুদ কতটা পাওয়া যাচ্ছে এবং সেই গ্যাস কত দ্রুত উৎপাদনে আনা যাচ্ছে—এসব বিষয়ও সমান গুরুত্ব পাবে।
একই সঙ্গে পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন ধরে রাখার জন্য আধুনিক প্রযুক্তি ও কার্যকর সংস্কার কার্যক্রম প্রয়োজন। নতুন অনুসন্ধান এবং বিদ্যমান ক্ষেত্রের সর্বোচ্চ ব্যবহার—দুই দিকেই সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের গ্যাস খাতে এখন একটি স্পষ্ট বৈপরীত্য দেখা যাচ্ছে। একদিকে কূপ খনন ও সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে দেশীয় গ্যাসের সরবরাহ ক্রমেই কমছে। এর ফলে ঘাটতি পূরণে আমদানীকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।
আট বছরে জাতীয় গ্রিডে এলএনজির অংশ ১১ শতাংশ থেকে ৩৬ শতাংশে ওঠা সেই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রমাণ। আর এর পেছনে রয়েছে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন হ্রাস, নতুন অনুসন্ধানে ধীরগতি এবং চাহিদার তুলনায় সরবরাহের ঘাটতি।
এখন দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে অনুসন্ধান ও উৎপাদন কার্যক্রমকে বাস্তব ফলাফলে রূপ দেওয়া। নতুন কূপ খননের সংখ্যা নয়, বরং সেখান থেকে কত নতুন গ্যাস পাওয়া গেল এবং জাতীয় গ্রিডে কতটা অতিরিক্ত সরবরাহ যোগ হলো—ভবিষ্যতে সাফল্যের মাপকাঠি হওয়া উচিত সেটিই। অন্যথায় কূপ খনন ও সংস্কারে কার্যক্রম চললেও দেশের গ্যাস সরবরাহে আমদানিনির্ভরতা কমার বদলে আরও বাড়তে পারে।

