দেশে দীর্ঘদিন ধরে মূল্যস্ফীতির চাপ থাকলেও মানুষের আয় সেই অনুপাতে বাড়েনি। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাড়তি দাম সামলাতে গিয়ে বিশেষ করে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশকে প্রতিদিনের ব্যয়ে কাটছাঁট করতে হচ্ছে। সংসারের প্রয়োজন মেটাতেই যেখানে আয়ের প্রায় পুরোটাই শেষ হয়ে যাচ্ছে, সেখানে ভবিষ্যতের জন্য অর্থ আলাদা করে রাখার সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।
এরই প্রতিফলন দেখা গেছে দেশের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সঞ্চয় পরিস্থিতিতে। একটি জরিপের তথ্য বলছে, গ্রামীণ এলাকার ২৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ মানুষের আনুষ্ঠানিক কিংবা অনানুষ্ঠানিক কোনো ধরনের সঞ্চয় নেই। অর্থাৎ আয় থেকে প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটানোর পর এই জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশের হাতে ভবিষ্যতের জন্য জমিয়ে রাখার মতো কোনো অর্থ অবশিষ্ট থাকে না।
সঞ্চয় করতে না পারা মানুষের বড় অংশের সমস্যার মূল জায়গাটি আয় ও ব্যয়ের ভারসাম্যে। জরিপে অংশ নেয়া ৭৭ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানোর পর তাদের হাতে সঞ্চয়ের মতো বাড়তি অর্থ থাকে না। এর পাশাপাশি অনিয়মিত আয়, অপর্যাপ্ত আয় এবং পুরোনো দায়-দেনা পরিশোধের চাপও অনেক পরিবারকে সঞ্চয়ের সুযোগ থেকে দূরে রাখছে।
প্রায় তিন বছর ধরে দেশের গ্রামীণ মানুষের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিয়ে জরিপ পরিচালনা করছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট। বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘কম্প্রিহেনসিভ রুরাল ফাইন্যান্স স্টাডি’ প্রকল্পের আওতায় পরিচালিত এ জরিপে দেশের ৩৮টি জেলার সাত হাজারেরও বেশি মানুষের সাক্ষাৎকার নেয়া হয়েছে। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সঞ্চয়ের বর্তমান চিত্র উঠে এসেছে।
সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে রয়েছে রংপুর বিভাগ। এখানকার ৪৫ দশমিক ৯৪ শতাংশ গ্রামীণ মানুষের ভবিষ্যতে ব্যবহারের জন্য কোনো সঞ্চয় নেই। শুধু সঞ্চয়ের পরিমাণ নয়, অর্থ রাখার ধরনেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা দেখা যাচ্ছে। রংপুরে মাত্র ৮ দশমিক ৭৫ শতাংশ মানুষ ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অর্থ জমা রাখছেন। বিপরীতে ৪১ দশমিক ৫৬ শতাংশ মানুষ ক্ষুদ্র ঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান বা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কাছে অর্থ সঞ্চয় করছেন।
রংপুরের পর সঞ্চয়ের দিক থেকে সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে সিলেট। এ বিভাগের ৩৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ গ্রামীণ মানুষের কোনো আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক সঞ্চয় নেই। চট্টগ্রামে এই হার ৩০ দশমিক ৬৩ শতাংশ, ঢাকায় ২৬ দশমিক ৯২ শতাংশ, খুলনায় ২১ দশমিক ৫৬ শতাংশ, রাজশাহীতে ১৯ দশমিক ৪ শতাংশ, ময়মনসিংহে ১৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ এবং বরিশালে ১০ দশমিক ৬৩ শতাংশ। সব বিভাগ মিলিয়ে দেশের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ২৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ মানুষ মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর পর সঞ্চয়ের জন্য কোনো অর্থ হাতে রাখতে পারছেন না।
সঞ্চয় না হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে জীবনযাত্রার ব্যয়। জরিপে অংশ নেয়া ৭৭ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, মৌলিক প্রয়োজন মেটাতেই তাদের আয়ের পুরোটা ব্যয় হয়ে যায়। ফলে সঞ্চয়ের সুযোগ তৈরি হয় না। আবার ৩২ শতাংশ মানুষ অনিয়মিত আয়কে এবং ২২ শতাংশ মানুষ অপর্যাপ্ত আয়কে সঞ্চয়ের পথে প্রধান বাধা হিসেবে দেখেছেন। আরও ১৫ শতাংশ জানিয়েছেন, দায়-দেনা পরিশোধ করতেই তাদের আয়ের পুরো অর্থ চলে যায়।
এ পরিস্থিতিকে শুধু সঞ্চয় কমে যাওয়ার বিষয় হিসেবে দেখলে সমস্যার গভীরতা পুরোপুরি বোঝা যাবে না। কারণ সঞ্চয় না থাকা মানে একটি পরিবার হঠাৎ কোনো বিপদের মুখে পড়লে তার হাতে সামাল দেওয়ার মতো নিজস্ব অর্থও থাকে না। অসুস্থতা, কাজ হারানো, আয় বন্ধ হয়ে যাওয়া কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো পরিস্থিতিতে তখন ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়তে পারে।
জরিপ পরিচালনা দলের সদস্য ও গবেষণা ফেলো ড. ফারহানা নার্গিসের মতে, গ্রামীণ পরিবারগুলো সঞ্চয়ের সুফল সম্পর্কে জানলেও আনুষ্ঠানিক সঞ্চয় ব্যবস্থায় যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে নানা বাধার মুখোমুখি হচ্ছে। ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা, কম আর্থিক সচেতনতা, অনিয়মিত আয়ের ধরন এবং প্রচলিত অনানুষ্ঠানিক সঞ্চয় ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা এ সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলছে।
এই বাস্তবতায় শুধু ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সেবা বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হবে না। গ্রামীণ মানুষের আয় যদি স্থিতিশীল না হয়, তাহলে নতুন কোনো সঞ্চয় ব্যবস্থা চালু হলেও সেখানে নিয়মিত অর্থ জমা রাখা তাদের জন্য কঠিন হয়ে থাকবে। তাই আর্থিক সচেতনতার পাশাপাশি আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ড. ফারহানা নার্গিস মনে করেন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোকে কাজে লাগিয়ে গ্রামভিত্তিক আর্থিক সচেতনতা কর্মসূচি চালানো যেতে পারে। এতে মানুষ আয়-ব্যবস্থাপনা, সঞ্চয়ের প্রয়োজনীয়তা এবং আনুষ্ঠানিক আর্থিক সেবার সুবিধা সম্পর্কে আরও ভালোভাবে জানতে পারবে। একই সঙ্গে প্রান্তিক ও অনগ্রসর এলাকায় ব্যাংকের শাখা ও উপশাখা বাড়াতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকেও নির্দেশনা ও প্রণোদনার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
সঞ্চয়ের অভাবের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জরুরি সময়ে পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা। হাতে কিছু সঞ্চয় থাকলে হঠাৎ অসুস্থতা, কাজ হারানো কিংবা দুর্যোগের মতো পরিস্থিতিতে মানুষ নিজের অর্থ ব্যবহার করে সংকট সামাল দিতে পারে। কিন্তু সঞ্চয় না থাকলে একই পরিস্থিতিতে তাকে ঋণ নিতে হতে পারে। ঋণের সুদ ও কিস্তির চাপ পরবর্তী সময়ে পরিবারের ওপর আরও বড় আর্থিক বোঝা তৈরি করতে পারে। একই কারণে সন্তানদের শিক্ষা, বাড়ি নির্মাণ কিংবা অবসরের প্রস্তুতির মতো দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যও বাধাগ্রস্ত হয়।
ব্যক্তিগত সঞ্চয়ের গুরুত্ব জাতীয় অর্থনীতির সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। অর্থনীতিবিদদের মতে, মানুষের ছোট ছোট সঞ্চয় একসময় বিনিয়োগের অর্থে পরিণত হতে পারে। এর মাধ্যমে মূলধন গঠনের সুযোগ বাড়ে, নতুন ব্যবসা ও কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও গতিশীল হতে পারে। কিন্তু বিপুলসংখ্যক মানুষের হাতে সঞ্চয়যোগ্য অর্থ না থাকলে এই সম্ভাবনাও সীমিত হয়ে পড়ে।
মূল্যস্ফীতি ও গ্রামীণ অর্থনীতির সীমিত বৈচিত্র্য এ সংকটকে আরও তীব্র করেছে বলে মনে করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। তার বিশ্লেষণে, গত চার বছর ধরে দেশের অর্থনীতি নানা ধরনের চাপের মধ্য দিয়ে গেছে। একদিকে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, অন্যদিকে সেই অনুপাতে মজুরি বাড়েনি। একই সময়ে নতুন কর্মসংস্থান তৈরির গতিও প্রত্যাশিত মাত্রায় ছিল না।
গ্রামীণ অর্থনীতিতে এই চাপের প্রভাব আরও বেশি পড়ার একটি কারণ হলো আয়ের উৎসের সীমাবদ্ধতা। শহরের তুলনায় গ্রামের মানুষের অনেক পরিবার এখনো নির্দিষ্ট কয়েকটি আয়ের উৎসের ওপর নির্ভরশীল। ফলে একটি উৎসে আয় কমে গেলে বিকল্প আয়ের সুযোগ তৈরি করা কঠিন হয়। ড. ফাহমিদা খাতুনের মতে, অনেক পরিবারকে সংসার চালাতে গিয়ে আগের সঞ্চয়ও ভাঙতে হচ্ছে। এতে তাদের হাতে থাকা পুঁজি ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তাও দুর্বল হচ্ছে।
দেশে মূল্যস্ফীতির চাপও দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে। ২০২২ সালের পর দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার মধ্যে দিয়ে মূল্যস্ফীতি বাড়তে শুরু করে। এরপর থেকে তা কাঙ্ক্ষিতভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। এর বিপরীতে মানুষের মজুরি একই গতিতে বাড়েনি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত টানা পাঁচ অর্থবছর গড় মূল্যস্ফীতির চেয়ে মজুরি বৃদ্ধির হার কম ছিল। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মজুরি বেড়েছে ৮ দশমিক ১১ শতাংশ, যেখানে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৬৮ শতাংশ। অর্থাৎ মজুরি বৃদ্ধির তুলনায় মূল্যস্ফীতি ছিল দশমিক ৫৭ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি।
এই হিসাবটি গ্রামীণ পরিবারের সঞ্চয় সংকট বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আয় সামান্য বাড়লেও যদি পণ্য ও সেবার দাম তার চেয়ে দ্রুত বাড়ে, তাহলে প্রকৃত অর্থে পরিবারের হাতে খরচের পরিমাণ কমে যায়। তখন সঞ্চয় করার মতো অর্থ তো দূরের কথা, অনেক পরিবারকে প্রয়োজনীয় কেনাকাটাও কমিয়ে আনতে হয়।
এ অবস্থায় গ্রামীণ মানুষের আর্থিক সক্ষমতা বাড়াতে শুধু সঞ্চয়ের অভ্যাস তৈরির ওপর জোর দিলে হবে না, আয়ের ভিত্তিটিও শক্তিশালী করতে হবে। ড. ফাহমিদা খাতুনের মতে, গ্রামীণ এলাকায় কৃষির পাশাপাশি কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প এবং অন্যান্য অকৃষি খাতের প্রসার ঘটানো জরুরি। তরুণদের কারিগরি ও ডিজিটাল দক্ষতা প্রশিক্ষণের আওতায় এনে নতুন ধরনের কাজের সুযোগ তৈরি করা গেলে স্থানীয় ও বৃহত্তর বাজারে তাদের অংশগ্রহণ বাড়তে পারে।
গ্রামীণ পরিবারের সঞ্চয় কমে যাওয়ার পেছনে খাদ্য ব্যয়ের চাপও বড় ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশে ৬০ শতাংশেরও বেশি পরিবার তাদের মোট আয়ের অন্তত অর্ধেক খাবারের পেছনে ব্যয় করে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর গত বছরের এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গ্রামীণ এলাকার ৩১ দশমিক ৬ শতাংশ পরিবার তাদের আয়ের ৬৫ শতাংশ বা তারও বেশি খাদ্য কিনতে ব্যয় করে। স্বাভাবিকভাবেই আয়ের এত বড় অংশ যদি শুধু খাবারের পেছনে চলে যায়, তাহলে অন্যান্য প্রয়োজন মেটানোর পর সঞ্চয়ের জন্য অর্থ রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
সব মিলিয়ে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সঞ্চয়হীনতার চিত্রটি দেশের বৃহত্তর জীবনযাত্রার সংকটেরই একটি প্রতিফলন। মানুষের আয় যদি মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে না বাড়ে, কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত থাকে এবং পরিবারের আয়ের বড় অংশ খাদ্য ও অন্যান্য মৌলিক ব্যয়ে চলে যায়, তাহলে সঞ্চয় কমে যাওয়াই স্বাভাবিক। আর সঞ্চয় কমতে থাকলে একটি পরিবার শুধু বর্তমানের চাপেই পড়ে না, ভবিষ্যতের যেকোনো অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধেও দুর্বল হয়ে পড়ে।
তাই গ্রামীণ মানুষের সঞ্চয় বাড়ানোর প্রশ্নটি কেবল ব্যাংকে বেশি অর্থ জমা রাখার বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক সচেতনতা, সহজলভ্য আর্থিক সেবা এবং গ্রামীণ অর্থনীতির বৈচিত্র্য। এই জায়গাগুলোতে সমন্বিতভাবে অগ্রগতি না হলে ২৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ সঞ্চয়হীন মানুষের সংখ্যা কমানো কঠিন হবে। বরং দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি ও আয় সংকট চলতে থাকলে ভবিষ্যতে আরও বেশি পরিবার তাদের সঞ্চয় হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

