ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের প্রথম দিন ছিল গত বৃহস্পতিবার। অধিবেশনের শুরুতেই জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল নিয়ে বিরোধী দল জাতীয় সংসদে আপত্তি জানাতে পারে কিংবা প্রতিবাদ হিসেবে ওয়াকআউট করতে পারে—এমন আশঙ্কা ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এসব বিলকে কেন্দ্র করে নয়, বরং প্রশ্নোত্তর পর্বে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর একটি মন্তব্য ঘিরেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে সংসদ।
বিরোধী দলের সদস্যদের আপত্তি, হইচই ও হট্টগোলে প্রায় ১০ মিনিট সংসদের কার্যক্রম ব্যাহত হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বারবার চেষ্টা করেও সফল না হওয়ায় একপর্যায়ে তিনি সংসদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। কিছু সংসদ সদস্যের মধ্যে ক্রমেই অসহিষ্ণুতা লক্ষ করছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধী দলের সদস্যরা প্রশ্ন করবেন, মন্ত্রীরা তার জবাব দেবেন—এটাই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। মন্ত্রীর জবাব সন্তোষজনক না হলে বিরোধী দল সমালোচনা ও প্রতিবাদ করবে। সরকারি দলের সদস্যরা সেই সমালোচনার জবাব দেবেন। মতবিরোধ, বিতর্ক ও যুক্তিতর্কের মধ্য দিয়েই সংসদীয় গণতন্ত্র প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশের সংসদে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে বিতর্ক, বাগ্বিতণ্ডা কিংবা হট্টগোল অবশ্য নতুন কোনো ঘটনা নয়। বর্তমান সংসদেও একাধিকবার হইচই ও ওয়াকআউটের ঘটনা ঘটেছে। তবে মতপার্থক্য যখন ব্যক্তিগত আক্রমণ কিংবা একে অপরকে কথা বলতে না দেওয়ার প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—সংসদে পরমতসহিষ্ণুতার জায়গাটি কোথায়? ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের আচরণের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক সংস্কৃতির পুরোনো সমস্যাগুলোই কি আবার সামনে আসছে?
বৃহস্পতিবারের ঘটনার সূত্রপাত হয় প্রশ্নোত্তর পর্বে। বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ একটি সম্পূরক প্রশ্ন করতে গিয়ে অভিযোগ করেন, দিনদুপুরে ছিনতাই হচ্ছে এবং সংসদ সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটছে। এমনকি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যেখানে যাচ্ছেন, সেখানে তাঁকে কেন্দ্র করে ভুয়া স্লোগান দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। বিরোধী দলের সদস্যের ওপর হামলার মামলায় আসামিদের গ্রেপ্তার না করে মিথ্যা মামলায় বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি। এসব বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদক্ষেপ জানতে চান শফিকুল ইসলাম মাসুদ।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জবাবে বলেন, প্রশ্নের প্রথম এক মিনিট তিনি মনোযোগ দিয়ে শুনতে পারেননি। তাই প্রশ্নটি আবার করার অনুরোধ করেন তিনি। শফিকুল ইসলাম মাসুদ প্রশ্নটি পুনরায় করলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘শাহবাগ স্কয়ারে বক্তৃতা দেওয়া আর পার্লামেন্টে বক্তৃতা দেওয়া এক কথা না।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্যে বিরোধী দলের সদস্যরা আপত্তি জানান। তাঁদের অনেকে নিজ নিজ আসনে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ শুরু করেন।
এর আগে এনসিপির সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহর একটি প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়েও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘এটা প্রশ্ন হলো, না পল্টনের বক্তৃতা হলো, বুঝতে পারিনি।’ সে সময় কয়েকজন সদস্য মৃদু আপত্তি জানালেও পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়নি। কিন্তু শফিকুল ইসলাম মাসুদের প্রশ্নের জবাব দেওয়ার পর বিরোধী দলের সদস্যরা তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখান।
এখানেই মূল প্রশ্নটি সামনে আসে—সংসদে প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে একজন মন্ত্রীর বক্তব্য কতটা রাজনৈতিক কটাক্ষ হতে পারে?
আইন প্রণয়নের পাশাপাশি সংসদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহি নিশ্চিত করা। আর সেই জবাবদিহি নিশ্চিত করার অন্যতম প্রধান মাধ্যম হচ্ছে প্রশ্নোত্তর পর্ব। কার্যপ্রণালী বিধি অনুসরণ করে সংসদ সদস্যরা সরকারের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন করেন এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা সেই প্রশ্নের উত্তর দেন।
কোন দিন কোন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত প্রশ্নোত্তর পর্ব অনুষ্ঠিত হবে, সেটি আগে থেকেই নির্ধারিত থাকে। তারকাচিহ্নিত ও লিখিত প্রশ্নও সংসদ সদস্যদের আগেই সংশ্লিষ্ট শাখায় জমা দিতে হয়। নির্ধারিত দিনে তাঁরা মূল প্রশ্নের পাশাপাশি সম্পূরক প্রশ্ন করার সুযোগ পান। সাধারণত সম্পূরক প্রশ্ন মূল প্রশ্নের সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়া উচিত। তবে প্রশ্নটি মূল বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত না হলেও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী চাইলে তার উত্তর দিতে পারেন।
গত বৃহস্পতিবার স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা জলবায়ুবিষয়ক মূল প্রশ্নের সম্পূরক হিসেবে মক্কা চুক্তি নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে জানতে চেয়েছিলেন। প্রশ্নটি মূল বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত না হলেও পররাষ্ট্রমন্ত্রী তার জবাব দেন। অন্যদিকে শফিকুল ইসলাম মাসুদের সম্পূরক প্রশ্নটি মূল প্রশ্নের সঙ্গেই সম্পর্কিত ছিল।
বিরোধী দলের দুটি প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের সারকথা ছিল—এটি পল্টন ময়দান বা শাহবাগ স্কয়ার নয়, এটি জাতীয় সংসদ; এখানে ‘হাওয়াই’ বা ‘আমভাবে’ নয়, সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন করতে হবে।
সংসদে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়া পুরোপুরি নিষিদ্ধ নয়। বরং সংসদই রাজনীতি ও গণতন্ত্রচর্চার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। তবে সেখানে বক্তব্যের প্রাসঙ্গিকতা ও শালীনতা বজায় রাখার পাশাপাশি কার্যপ্রণালী বিধিও অনুসরণ করতে হয়। একজন মন্ত্রী চাইলে রাজনৈতিকভাবে অথবা মন্ত্রণালয়ের তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে কোনো প্রশ্নের জবাব দিতে পারেন। কিন্তু বিরোধী দলের প্রশ্নকে ‘শাহবাগ স্কয়ার’ কিংবা ‘পল্টনের বক্তৃতা’ হিসেবে আখ্যায়িত করা সংসদ সদস্যদের অবমূল্যায়ন কি না, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
কোনো বক্তব্য অসংসদীয় হয়েছে কি না, তা নির্ধারণের এখতিয়ার স্পিকারের। তিনি জানিয়েছেন, কার্যবিবরণী পরীক্ষা করে কোনো অসংসদীয় বক্তব্য পাওয়া গেলে তা বাদ দেওয়া হবে।
বিরোধী দলের মূল আপত্তি ছিল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর শব্দচয়ন ও শারীরিক ভাষা নিয়ে। বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানের অভিযোগ, ত্রয়োদশ সংসদের শুরু থেকেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সবাইকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে আসছেন।
তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য নিয়ে বিরোধী দলের প্রতিক্রিয়াও প্রশ্নের বাইরে নয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং সংসদ সদস্যদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা বিরোধী দলের মৌলিক অধিকার। কিন্তু সেই প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রীর মন্তব্যের প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে সংসদ সদস্যরা যে ধরনের আচরণ করেছেন, সেটি কতটা ইতিবাচক ও সংসদীয় ছিল, তা নিয়েও আলোচনা প্রয়োজন।
বিরোধী দলের আপত্তির মুখে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তিনবার তাঁর বক্তব্য প্রত্যাহারের কথা বলেন—‘আই উইথড্র’। এরপরও বিরোধী দলের সদস্যরা শান্ত হননি। হইচই চলতে থাকায় বক্তব্য শেষ করতে না পেরে একপর্যায়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বসে যেতে হয়।
বিরোধী দলের প্রায় সব সদস্য দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করতে থাকেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্পিকার তাঁদের বারবার বসতে এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য শুনতে অনুরোধ করেন। তিনি আশ্বস্ত করেন, মন্ত্রীর বক্তব্য শেষ হওয়ার পর বিরোধী দলের কোনো সদস্য কথা বলতে চাইলে তাঁকে সেই সুযোগ দেওয়া হবে। কিন্তু এরপরও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি।
অথচ বিরোধী দলের সামনে সংসদীয় পদ্ধতিতে আপত্তি জানানোর সুযোগ ছিল। স্পিকারের দেওয়া সুযোগ কাজে লাগিয়ে তাঁরা মাইকে বক্তব্য রেখে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মন্তব্যের প্রতিবাদ করতে পারতেন। কারণ কোনো বক্তব্য প্রত্যাহার করার পরও অন্য কাউকে কথা বলতে না দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে বিরোধী দলের ন্যায্য প্রতিবাদের নৈতিক শক্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে।
উত্তপ্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সচেষ্ট ছিলেন। তিনি বিরোধীদলীয় নেতাকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেন। একই সঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য পরীক্ষা করে অসংসদীয় কোনো কিছু পাওয়া গেলে তা কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার আশ্বাসও দেন।
তবে স্পিকারের একটি বক্তব্য নিয়েও বিরোধী দলের পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। বিরোধী দলের উদ্দেশে স্পিকার বলেন, ‘কথা বলার স্বাধীনতা হরণ করবেন না। আপনারা যে কয়জন আছেন, তার দ্বিগুণ-তিন গুণ এ পাশে (সরকারি দলে) আছে। সুতরাং শব্দ করে তাঁর বক্তব্য স্তব্ধ করা যাবে না। আমাকে সংসদ পরিচালনা করতে দিন।’
স্পিকারের সদস্যসংখ্যা উল্লেখ করার বিষয়টিতে আপত্তি জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। তাঁর বক্তব্য, সংসদকে কোনো ‘গুণে’ ভাগ করার পক্ষে তিনি নন। স্পিকারের কাছে সরকারি ও বিরোধী দলের প্রত্যেক সদস্যের বক্তব্যের অধিকার সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত।
এই ঘটনার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—সংসদে এমন পরিস্থিতির জন্য দায় কার?
সরকারি দলের উচিত বিরোধী দলের প্রশ্নকে কেবল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বক্তব্য হিসেবে না দেখে নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহির অংশ হিসেবে গ্রহণ করা। একজন মন্ত্রী শুধু তাঁর দলের প্রতিনিধি নন; নির্বাহী বিভাগের প্রতিনিধি হিসেবেও তিনি সংসদের কাছে জবাবদিহি করেন। তাই তাঁর ভাষা ও ভঙ্গিতে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ছোট করার কোনো উপাদান ছিল কি না, সেটিও পর্যালোচনার বিষয়।
অন্যদিকে সরকারের জবাব সন্তোষজনক না হলে বিরোধী দল সংসদীয় পদ্ধতির মধ্যেই শক্ত প্রতিবাদ জানাতে পারে। প্রশ্ন করা ও প্রতিবাদ করার অধিকার যেমন তাদের রয়েছে, তেমনি অন্যদের বক্তব্য শোনার পরিবেশ বজায় রাখার দায়িত্বও তাদের রয়েছে। প্রতিবাদ করা আর অন্য কাউকে কথা বলতে না দেওয়া এক বিষয় নয়।
সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে ভারসাম্য নিশ্চিত করার দায়িত্ব স্পিকারের। একই ধরনের আচরণের ক্ষেত্রে একই নিয়ম প্রয়োগ করা এবং প্রত্যেক সংসদ সদস্যের বক্তব্যের অধিকার নিশ্চিত করাই তাঁর নিরপেক্ষতার বড় পরীক্ষা।
ক্ষমতাসীন দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা তাকে বিরোধী দলের কণ্ঠকে তুচ্ছ করার অধিকার দেয় না। একইভাবে সংখ্যালঘু অবস্থান বিরোধী দলকে সংসদের কার্যক্রম ব্যাহত করার অধিকারও দেয় না। সংসদকে কার্যকর রাখতে হলে প্রশ্নের জবাবে সহিষ্ণুতা, প্রতিবাদে সংযম এবং সংসদ পরিচালনায় নিরপেক্ষতা—এই তিনটি বিষয়ই সমানভাবে প্রয়োজন।
প্রথম আলোর বিশ্লেষণ

