তরুণদের ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ৬৮৩ কোটি টাকার একটি মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়। ‘দেশের সকল মহানগরীতে কর্মহীন যুবকদের ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি’ শীর্ষক এই প্রকল্পের আওতায় ৫০ হাজার ১০০ জন তরুণ-তরুণীকে তিন মাসের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। তবে প্রকল্পের জনপ্রতি ব্যয়ের হিসাব নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে। প্রস্তাবিত ব্যয় অনুযায়ী, প্রতিটি প্রশিক্ষণার্থীর জন্য সরকারের খরচ দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১ লাখ ৩৬ হাজার টাকা। অথচ বেসরকারি পর্যায়ে একই ধরনের তিন মাসের ফ্রিল্যান্সিং কোর্সে সাধারণত ১৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত ফি নেওয়া হয়।
প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর। ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ২০৩১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত পাঁচ বছর মেয়াদে দেশের ১৩টি সিটি করপোরেশনের ৫০১টি ওয়ার্ডে এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হবে। প্রশিক্ষণার্থীদের গ্রাফিকস ডিজাইন, ডিজিটাল মার্কেটিং, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, ভিডিও এডিটিংসহ চাহিদাভিত্তিক বিভিন্ন ট্রেডে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। প্রশিক্ষণ শেষে ন্যূনতম ৬০ শতাংশ প্রশিক্ষণার্থীকে আয়মূলক কাজে যুক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রকল্পের মোট ব্যয়ের প্রায় ৯৮ শতাংশই খরচ হবে শুধু প্রশিক্ষণ খাতে। পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানিয়েছে, ৬৮৩ কোটি ১০ লাখ টাকার মধ্যে প্রশিক্ষণ খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৬৯ কোটি ৪৩ লাখ ৬৬ হাজার টাকা। এই অর্থ দিয়ে ৫০ হাজার ১০০ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। সেই হিসাবে জনপ্রতি প্রশিক্ষণ ব্যয় দাঁড়াচ্ছে ১ লাখ ৩৩ হাজার ৬৬ টাকা। এর সঙ্গে প্রশিক্ষণার্থীদের দেওয়া যাতায়াত ভাতা (দৈনিক ২০০ টাকা) ও অন্যান্য সহায়তা যোগ করলে ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ১ লাখ ৩৬ হাজার টাকা।
এই উচ্চ ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। বিডিজবসের প্রধান নির্বাহী এ কে এম ফাহিম মাশরুর বলেন, ‘ফ্রিল্যান্সিং শেখার জন্য বিপুল সরকারি ব্যয়ের প্রয়োজন নেই। ইন্টারনেট ও ইউটিউবের মাধ্যমেও শেখার সুযোগ রয়েছে। বাজারে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকায়ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ নেওয়া যায়।’ আরেকটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, একই অধিদপ্তরের চলমান আরেকটি প্রকল্পে জনপ্রতি খরচ হচ্ছে ১ লাখ ৩ হাজার টাকা। নতুন প্রকল্পে খরচ আরও ৩০ হাজার টাকা বেশি।
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মোতাহার হোসেন অবশ্য জানিয়েছেন, প্রকল্পের ব্যয় শুধু প্রশিক্ষণ বাবদ নয়। প্রশিক্ষণকালীন সময়ে খাবার, প্রতিদিন ২০০ টাকা যাতায়াত ভাতা এবং প্রশিক্ষণার্থীদের জন্য অন্যান্য সহায়তাও এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী প্রশিক্ষণার্থীদের ল্যাপটপসহ প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম দেওয়ার কথাও প্রকল্প প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রকল্পটির উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) ইতিমধ্যে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় এর প্রয়োজনীয়তা, ব্যয়ের খাত, বাস্তবায়ন কাঠামো ও সম্ভাব্য সুফল নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। পিইসি পর্যায়ে অনুমোদন পেলে প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বিবেচনায় পাঠানো হবে।
সরকারি প্রশিক্ষণের ব্যয়সংক্রান্ত এই প্রশ্ন শুধু একটি প্রকল্পের হিসাব নয়; বরং দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে সরকারি অর্থ ব্যয়ের কার্যকারিতা নিয়েও নতুন করে ভাবনার সুযোগ তৈরি করছে। ফ্রিল্যান্সিং খাতের সম্ভাবনা যেমন উজ্জ্বল, তেমনি এই খাতে প্রশিক্ষণের ব্যয় যেন সাশ্রয়ী ও কার্যকর হয়, সেদিকেও নজর দিতে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

