ঢাকার গুলিস্তান-ফুলবাড়িয়া এলাকায় হাঁটলে এখনও যানজট, হকারের ডাক আর নির্মাণকাজের কোলাহল চোখে পড়ে। কিন্তু যে নামটি একসময় এই এলাকার পরিচয় ছিল; বঙ্গবাজার – তা এখন যেন হারিয়ে গেছে নিজের ঠিকানাতেই। ২০২৩ সালের ৪ এপ্রিলের অগ্নিকাণ্ডের পর তিন বছর পেরিয়ে গেলেও বাজারটি এখনো পুনর্নির্মাণাধীন, আর এর হাজারো ব্যবসায়ী ছড়িয়ে পড়েছেন ঢাকার বিভিন্ন প্রান্তে।
এক স্টেশন থেকে বাণিজ্যকেন্দ্র
বঙ্গবাজারের শুরুটা পোশাকের বাজার হিসেবে নয়। ষাটের দশকে ফুলবাড়িয়া রেলস্টেশনকে ঘিরে গড়ে ওঠা একটি অস্থায়ী হকার্স বাজার থেকেই এর যাত্রা। স্টেশন সরে গেলেও গুরুত্বপূর্ণ সড়ক সংযোগস্থলে থাকার সুবাদে জায়গাটি ব্যবসায়ীদের কাছে গুরুত্ব হারায়নি। ১৯৭৫ সালে ঢাকা পৌরসভা পাকা বাজার গড়ার উদ্যোগ নেয়, ১৯৮৫ সালে মালিকানা পায় সিটি কর্পোরেশন, আর আশির দশকের শেষে গড়ে ওঠে পাকা মার্কেট। নব্বইয়ের দশকে এসে বঙ্গবাজার পরিণত হয় দেশের অন্যতম বড় তৈরি পোশাকের বাণিজ্যকেন্দ্রে।
জনপ্রিয়তার রহস্য: এক্সপোর্ট সারপ্লাস
বঙ্গবাজারের আকর্ষণের মূল কারণ ছিল “এক্সপোর্ট সারপ্লাস” পণ্য – রপ্তানির জন্য তৈরি হলেও সামান্য ত্রুটি, বাতিল অর্ডার বা উদ্বৃত্তের কারণে বিদেশে না যাওয়া গার্মেন্টস পণ্য। মানে ভালো, দামে সস্তা – এই সমীকরণেই শিক্ষার্থী থেকে মধ্যবয়সী ক্রেতা পর্যন্ত সবাইকে টেনে আনত বাজারটি। এক সময় ৭০-৮০ টাকায় শার্ট আর ১২০-১৫০ টাকায় প্যান্ট পাওয়া যেত, যা বর্তমান বাজারদরের তুলনায় প্রায় অকল্পনীয়।
বিদেশি ক্রেতা আর দোভাষীদের অর্থনীতি
বঙ্গবাজার শুধু স্থানীয় বাজার ছিল না। নাইজেরিয়া, সুদান, নেপাল, ভুটান, সৌদি আরবসহ নানা দেশের ক্রেতারা নিয়মিত আসতেন লট ধরে পণ্য কিনতে, যা তারা নিজ দেশে কয়েকগুণ বেশি দামে বিক্রি করতেন। কাছাকাছি শেরাটন ও সোনারগাঁওয়ের মতো হোটেলে থাকা বিদেশি অতিথিরাও বাজারটির খোঁজ পেতেন। এই লেনদেনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতেন দোভাষীরা।ইংরেজী, আরবি, ফারসি, রুশ, হিন্দিসহ একাধিক ভাষায় দক্ষ এই মানুষেরা ক্রেতা-বিক্রেতার মাঝে সেতুবন্ধনের কাজ করতেন এবং কমিশনের বিনিময়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন।
আগুনের পর: এক বাজারের বিচ্ছিন্নতা
২০২৩ সালের অগ্নিকাণ্ডে বঙ্গবাজার সম্পূর্ণ পুড়ে যাওয়ার পর ব্যবসায়ীরা ছড়িয়ে পড়েন এনেক্সকো মার্কেট, সিটি প্লাজা, এস ইসলাম প্লাজা, নগর প্লাজা, ট্রেড সেন্টার, এমনকি মিরপুর ও নিউমার্কেট এলাকা পর্যন্ত। কেউ অনলাইন ব্যবসায় ঝুঁকেছেন, কেউ পুঁজি হারিয়ে ব্যবসা থেকে একেবারেই সরে গেছেন। এই বিক্ষিপ্ততার সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে পুরনো ক্রেতা-বিক্রেতা সম্পর্কের – যে পরিচিত দোকানে ক্রেতা নিয়মিত ফিরে আসতেন, আগুনের পর সেই দোকান কোথায় গেছে তা খুঁজে বের করাই এখন কঠিন কাজ।
ছোট ব্যবসায়ীরা পড়েছেন সবচেয়ে কঠিন সংকটে। আগে যেখানে ৫-১৫ হাজার টাকায় দোকান ভাড়া পাওয়া যেত, অন্য মার্কেটে সেই ভাড়া ২০-৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত উঠেছে। পুঁজি হারানো অনেক ব্যবসায়ীর পক্ষে এই বাড়তি খরচ সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
নতুন গন্তব্য: নূরজাহান মার্কেট
বঙ্গবাজারের শূন্যস্থান অনেকটাই দখল করে নিয়েছে নিউমার্কেট-সংলগ্ন নূরজাহান সুপার মার্কেট। মজার বিষয় হলো, এই মার্কেটের বিকাশের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে বঙ্গবাজারেরই ইতিহাস – নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি বঙ্গবাজারের কিছু ব্যবসায়ী এখানে দোকান খোলেন, আর বঙ্গবাজারের সাবেক দোভাষীরাই পরবর্তীতে পুঁজি জমিয়ে এখানে নিজস্ব ব্যবসা দাঁড় করান। আজ প্রায় ৫৬০টি দোকান নিয়ে গড়ে ওঠা এই চারতলা মার্কেট বিদেশি পর্যটক ও পাইকারি ক্রেতাদের কাছেও পরিচিতি পাচ্ছে যেনো অনেকটা বঙ্গবাজারেরই প্রতিচ্ছবি হয়ে।
পুনর্গঠনের পথে বাধা
২০২৩ সালের অগ্নিকাণ্ডের পর ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে ১০৬ কাঠা জমিতে গড়ে উঠছে ১০ তলা ভবনের “বঙ্গবাজার পাইকারি নগর বিপণীবিতান”, যেখানে থাকবে ৩ হাজার ৪২টি দোকান। ইতিমধ্যে প্রায় তিন হাজার ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী দোকান বরাদ্দ পেয়েছেন। তবে বরাদ্দের কিস্তি পরিশোধ করতে গিয়ে চাঁদাবাজি ও নানা হয়রানির অভিযোগ তুলেছেন ব্যবসায়ীরা, যা নতুন করে শঙ্কার জন্ম দিচ্ছে।
পরিশেষে বলতে পারি বঙ্গবাজার আজ একটি ভৌত ঠিকানা হিসেবে অনুপস্থিত থাকলেও এর অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব এখনো ঢাকার বিভিন্ন বাজারে ছড়িয়ে আছে – নূরজাহান মার্কেটের রমরমা ব্যবসা থেকে শুরু করে অনলাইনে টিকে থাকা সাবেক দোকানিদের সংগ্রাম পর্যন্ত। নতুন ভবন নির্মাণ শেষ হলে হয়তো বঙ্গবাজার আবার তার পুরনো নাম ফিরে পাবে, কিন্তু তিন দশকের গড়ে ওঠা যে সামাজিক ও বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক আগুনে ভেঙে পড়েছিল, তা আবার পুনর্গঠন করা সহজ হবে না এটাই এই বাজারের ব্যবসায়ীদের প্রধান উদ্বেগ।
মিজান মাজনুন
আইনজীবী ও সাংবাদিক

