রাজস্ব ফাঁকি ও পণ্যের ভুল ঘোষণা ঠেকাতে বেনাপোল কাস্টমস হাউসে নজরদারি ও তল্লাশি জোরদার করা হয়েছে। এতে শুল্ক ফাঁকির বেশ কিছু ঘটনা শনাক্ত হলেও আমদানি পণ্য খালাসে সময় বেড়েছে। কোনো কোনো চালানের পণ্য পরীক্ষা শেষ করে ছাড়পত্র পেতে তিন থেকে চার দিন পর্যন্ত সময় লাগছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
দেশের বৃহত্তম স্থল কাস্টমস স্টেশন বেনাপোলে ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড রিস্ক ম্যানেজমেন্ট (আইআরএম) দল সন্দেহজনক চালানগুলোতে নজরদারি বাড়িয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত চালানগুলোতে সরাসরি পণ্য খুলে শারীরিক পরীক্ষা করা হচ্ছে।
কাস্টমস কর্মকর্তারা জানান, সাম্প্রতিক বিভিন্ন অভিযান ও তল্লাশিতে ঘোষণার অতিরিক্ত পণ্য আনা এবং ঘোষণায় উল্লেখ না থাকা পণ্য আমদানির মতো বেশ কিছু অনিয়ম ধরা পড়েছে। এসব ঘটনায় জড়িত আমদানিকারক ও ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং (সিঅ্যান্ডএফ) এজেন্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, রাজস্ব ফাঁকি ঠেকাতে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। তবে বৈধভাবে আমদানি করা পণ্যের ক্ষেত্রে যেন অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব বা হয়রানি না হয়, সে বিষয়েও কর্তৃপক্ষকে নজর দিতে হবে।
অন্যদিকে কাস্টমস কর্মকর্তাদের দাবি, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নির্দেশনা অনুযায়ী বৈধ চালান দ্রুত খালাসের চেষ্টা করা হচ্ছে।
কাস্টমস কর্মকর্তারা জানান, বেনাপোল কাস্টমস হাউসের কমিশনার মোহাম্মদ ফাইজুর রহমান, যুগ্ম কমিশনার মো. শরফুদ্দিন মিয়া এবং আইআরএম দলের প্রধান সহকারী কমিশনার তৌফিকুল রহমানের তত্ত্বাবধানে নজরদারি ও গোয়েন্দা কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। এতে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে রাজস্ব ফাঁকির বেশ কয়েকটি চেষ্টা শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
কাস্টমস সূত্র জানায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে প্রায় ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকার রাজস্ব আদায় হয়নি। একই সময়ে ভুল ঘোষণা ও ঘোষণাবহির্ভূত পণ্য আমদানির অভিযোগে ১৪টি চালান জব্দ করা হয়। এসব ঘটনায় প্রায় ৩০ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টা শনাক্ত হয়েছে।
রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগে চারটি সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠান—লিংক ইন্টারন্যাশনাল, রয়্যাল এন্টারপ্রাইজ, করিম অ্যান্ড সন্স এবং হুদা ইন্টারন্যাশনাল—এর লাইসেন্স স্থগিত করা হয়েছে।
কাস্টমস কর্মকর্তারা বলছেন, বন্ডেড পণ্য, পোশাক ও রাসায়নিক পণ্যের চালানে তুলনামূলকভাবে অনিয়মের ঘটনা বেশি দেখা যায়।
বেনাপোল কাস্টমস সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টস স্টাফ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক বদরুজ্জামান বনি বলেন, আইআরএম দলের বাছাই করা চালানগুলো খালাসের আগে পুরোপুরি শারীরিক পরীক্ষা করা হয়।
কাস্টমসে কঠোর নজরদারির পাশাপাশি বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে আমদানির পরিমাণও কমেছে। কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেনাপোল দিয়ে ১৫ লাখ ৯১ হাজার ৬৭০ টন পণ্য আমদানি হয়েছিল। আগের অর্থবছরের তুলনায় যা ১ লাখ ২৯ হাজার ৭৯ টন কম।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে আমদানি আরও প্রায় ১ লাখ ৯৭ হাজার টন কমেছে।
আমদানি কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে রাজস্ব আদায়েও। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেনাপোল কাস্টমস হাউসের সংশোধিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১১ হাজার ২৯০ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ৬ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৪২ শতাংশ কম।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বেনাপোল কাস্টমস হাউসের জন্য ১০ হাজার ৫৮৮ কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে এনবিআর। আগের অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় নতুন লক্ষ্য ৭০২ কোটি টাকা কম।
তবে নতুন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে গত অর্থবছরের প্রকৃত আদায়ের চেয়ে প্রায় ৪ হাজার ২৯ কোটি টাকা বেশি রাজস্ব সংগ্রহ করতে হবে।
বেনাপোল কাস্টমস হাউসের কমিশনার ফাইজুর রহমান বলেন, ভুল ঘোষণা দিয়ে রাজস্ব ফাঁকির বিরুদ্ধে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছে।
তিনি বলেন, সন্দেহজনক চালানগুলোতে শতভাগ পরীক্ষা করা হচ্ছে। পাশাপাশি কোনো কাস্টমস কর্মকর্তা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কর্তৃপক্ষের এই কঠোর অবস্থানের ফলে একদিকে রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টা শনাক্ত হচ্ছে, অন্যদিকে আমদানি পণ্য খালাসের সময়ও বাড়ছে। ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা, অনিয়ম ঠেকানোর পাশাপাশি বৈধ চালান দ্রুত ছাড়ের ব্যবস্থাও আরও কার্যকর করা হবে।

