বায়ুদূষণ এখন আর শুধু রাজধানীবাসীর একার সমস্যা নয়। এখন গুগল ম্যাপ খুললেই জানা যাবে আপনার এলাকার বাতাস কেমন আছে। সম্প্রতি বাংলাদেশের ৩৪টি জেলার বায়ুর মানসংক্রান্ত তথ্য যুক্ত হয়েছে গুগল ম্যাপে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ সহজেই তাদের আশপাশের বাতাসের গুণমান সম্পর্কে ধারণা পাচ্ছেন। শুধু রাজধানী নয়, গ্রাম-শহর সব জায়গার বাতাসের মান এখন হাতের নাগালে।
গুগল ম্যাপে বায়ুর মান দেখতে খুব সহজ। মোবাইলে গুগল ম্যাপ খুলে ‘লেয়ারস’ বা স্তরচিহ্নে চাপ দিতে হবে। তারপর ‘এয়ার কোয়ালিটি’ নির্বাচন করলেই মানচিত্রে বিভিন্ন স্থান রং ও সংখ্যার মাধ্যমে চিহ্নিত হয়ে যাবে। নির্দিষ্ট কোনো স্থানে চাপ দিলে সেখানে বায়ুমান সূচক বা একিউআই দেখতে পাবেন। এই সূচক ও রং দেখে আপনি বুঝতে পারবেন ওই এলাকার বাতাস ভালো, মাঝারি, অস্বাস্থ্যকর নাকি ঝুঁকিপূর্ণ। যেমন, সবুজ রং মানে বায়ু ভালো, হলুদ মানে মাঝারি, কমলা মানে সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর, আর লাল মানে অস্বাস্থ্যকর।
ঢাকা বিশ্বের অন্যতম দূষিত শহর। অক্টোবর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত বায়ুদূষণের মাত্রা খুব বেশি থাকে, তবে এখন প্রায় সারা বছরই দূষণ থাকছে। যেমন আজ মঙ্গলবার সকাল পৌনে ৯টায় বিশ্বের ১২৭টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ছিল ষষ্ঠ এবং বায়ুর মান ছিল ১৫৭, অর্থাৎ অস্বাস্থ্যকর। বর্ষা শেষের এই সময়েও বাতাসের মান ভালো নেই, যা উদ্বেগজনক।
বাংলাদেশ থেকে এই উদ্যোগে তথ্য ও কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস)। তারা দেশের বিভিন্ন স্থানে পর্যবেক্ষণযন্ত্র বসিয়েছে, যার তথ্য সরাসরি গুগলের ব্যবস্থায় যুক্ত হচ্ছে। বর্তমানে ৩৪ জেলায় তাদের লাইভ মনিটরিং স্টেশন চালু হয়েছে, যা দেশের ৬৪ জেলার প্রায় ৫৩ শতাংশ। নীলফামারী, রংপুর, রাজশাহী, ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, কক্সবাজার, রাঙামাটি, সুনামগঞ্জসহ মোট ৩৪টি জেলায় এই স্টেশন রয়েছে। পর্যায়ক্রমে বাকি জেলাগুলোতেও স্টেশন বসিয়ে ৬৪ জেলাকে এই নেটওয়ার্কে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রতিটি পর্যবেক্ষণযন্ত্রে তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, পিএম২.৫, পিএম১০, কার্বন ডাই-অক্সাইডসহ নানা দূষক পরিমাপের সেন্সর রয়েছে। স্টেশনগুলো সপ্তাহের ৭ দিন ২৪ ঘণ্টা সচল থাকে এবং পাঁচ মিনিট পরপর তথ্য পাঠায়। গুগল বিভিন্ন উৎসের তথ্য সমন্বয় করে ঘণ্টাভিত্তিক বায়ুমান সূচক প্রদর্শন করে।
বায়ুদূষণের ক্ষতি কতটা মারাত্মক, তা বোঝা যায় আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ারের (ক্রিয়া) ২০২৫ সালের এক গবেষণায়। গবেষণায় দেখা গেছে, পিএম২.৫ দূষণের কারণে বাংলাদেশে বছরে ১ লাখ ২ হাজার ৪৫৬ জনের অকালমৃত্যু ঘটে। এর মধ্যে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যু প্রায় ৫ হাজার ২৫৮ জন। পিএম২.৫ হলো বাতাসে ভাসমান ২.৫ মাইক্রোমিটার বা তার চেয়ে কম ব্যাসের অতিক্ষুদ্র কণা, যা ফুসফুসে প্রবেশ করে রক্তপ্রবাহেও মিশে যেতে পারে।
এছাড়া পিএম২.৫ দূষণের কারণে বছরে প্রায় ৬ লাখ ৬৮ হাজার বার হাঁপানি রোগীদের জরুরি বিভাগে যেতে হয় এবং ২৬ কোটি ৩০ লাখ কর্মদিবস নষ্ট হয়। সূক্ষ্ম কণাদূষণের সঙ্গে বছরে প্রায় ৯ লাখ ৪৮৫টি অকাল জন্ম ও ৬ লাখ ৯৬ হাজার ৩৮৯টি কম ওজনের শিশুর জন্মের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। বায়ুদূষণ যে শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়, এটি অর্থনীতির জন্যও বড় ক্ষতি বহন করছে।
ক্যাপসের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক জিয়াউল হক। তিনি বলেন, গুগল ম্যাপের মাধ্যমে বায়ুদূষণের তথ্য আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাবে। তবে তিনি পর্যবেক্ষণযন্ত্রের মান ও তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। কম দামের যন্ত্র দিয়ে করা এই পর্যবেক্ষণে যন্ত্র তিন থেকে চার বছর পরপর বদলানো, রক্ষণাবেক্ষণ ও ক্যালিব্রেশনের ব্যবস্থা থাকা জরুরি।
ক্যাপসের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে প্রাথমিক তথ্য অত্যন্ত জরুরি। স্বাধীনতার পরেও জেলা শহরগুলোয় বায়ুর মান সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ফলে দূষণের উৎস ও দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা কঠিন। ক্যাপসের এই উদ্যোগে ভূমিতে থাকা পর্যবেক্ষণ স্টেশনের তথ্য গুগলের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত হচ্ছে।
বায়ুদূষণ মোকাবিলায় এই উদ্যোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। সাধারণ মানুষ এখন তাদের এলাকার বাতাসের গুণমান সম্পর্কে সচেতন হতে পারবেন, যা দীর্ঘমেয়াদে দূষণ কমানোর প্রচেষ্টাকে গতিশীল করবে। তবে তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা ও যন্ত্রের মান নিশ্চিত করাও সমান জরুরি। সময়ই বলে দেবে, সাধারণ মানুষের এই সচেতনতা কতটা কাজে লাগে।

