দেশের প্রধান বিমানবন্দর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নাম বদলানোর কোনো উদ্যোগ সরকারের নেই। বরং আগামী ১৬ ডিসেম্বর থেকে সীমিত পরিসরে চালু হতে যাচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত তৃতীয় টার্মিনাল—এমনটাই জানিয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা মন্ত্রী।
মঙ্গলবার সকালে সরেজমিনে তৃতীয় টার্মিনাল ঘুরে দেখার পর সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হন তিনি। সেখানেই স্পষ্ট করে জানিয়ে দেন, নাম পরিবর্তনের প্রশ্নে জনগণের অর্থ খরচ করার কোনো যৌক্তিকতা তারা দেখছেন না। বরং এই মুহূর্তে সরকারের অগ্রাধিকার হলো টার্মিনালটি যথাসময়ে চালু করা এবং যাত্রীসেবার মান নিশ্চিত করা।
মন্ত্রীর ভাষায়, যেকোনো মূল্যে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে টার্মিনালের দরজা খুলে দিতে চান তারা। প্রাথমিক পর্যায়ে হয়তো একটি বা দুটি ফ্লাইট দিয়েই কার্যক্রমের সূচনা হবে, এরপর ধীরে ধীরে পুরোদমে অপারেশনে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থার পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রতিদিনই চলছে বলে জানান তিনি। সামগ্রিক নির্মাণকাজের অগ্রগতি এখন প্রায় ৫৭ শতাংশে পৌঁছেছে, আর যা বাকি আছে—ইন্টারনেট সংযোগ, যন্ত্রপাতি সংযুক্তকরণ এবং বিভিন্ন সিস্টেমের সমন্বয়—সেগুলো দ্রুত সম্পন্ন করার চেষ্টা চলছে।
পরিদর্শনকালে মন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন প্রতিমন্ত্রী, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের একজন প্রতিমন্ত্রী এবং বিনিয়োগ উন্নয়ন সংক্রান্ত সরকারি সংস্থার প্রধান।
সক্ষমতার দিক থেকে এই টার্মিনাল বিমানবন্দরের চেহারাই বদলে দেবে বলে মনে করছেন মন্ত্রী। পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে বর্তমান ধারণক্ষমতার প্রায় চারগুণ যাত্রী ও বিমান পরিচালনার সক্ষমতা তৈরি হবে। প্রয়োজনীয় জায়গা ও অবকাঠামো ব্যবহার করে একসঙ্গে সর্বোচ্চ ২৫০টি উড়োজাহাজ পরিচালনার মতো ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে বলে তিনি জানান।
আর্থিক দিক থেকেও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে এই প্রকল্পে। জাপানি অংশীদারদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পর টার্মিনাল পরিচালনা থেকে বাংলাদেশের রাজস্ব ভাগ আগের ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৭ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রকল্পের জন্য নেওয়া ঋণের কিস্তি পরিশোধও শুরু হয়ে গেছে, যদিও এখনো প্রায় নয়শ কোটি টাকা বকেয়া রয়ে গেছে।
যাত্রীসেবার মান বাড়াতে বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে লাগেজ হস্তান্তরের সময়ের ওপর। বিমান থেকে নামার পর সর্বোচ্চ পনেরো মিনিটের মধ্যে যাত্রীর হাতে ব্যাগ পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। তৃতীয় টার্মিনালে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কার্যক্রমের অর্ধেকের কাছাকাছি অংশ পরিচালনা করবে দেশীয় জাতীয় বিমান সংস্থা। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে লাগেজ সরবরাহে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে জরিমানার মুখোমুখি হতে হবে বলেও জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রীর প্রত্যাশা, এই টার্মিনাল চালুর সুফল মিলবে আগামী বছর থেকেই—বিশেষ করে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ানোর ক্ষেত্রে। বিমানবন্দরে অবতরণের প্রথম মুহূর্তেই যেন বিদেশি অতিথিরা দেশের অবকাঠামোগত সক্ষমতা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা পান, সেভাবেই টার্মিনালটি সাজানোর কাজ চলছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ডিসেম্বরে আংশিক উদ্বোধনের পর ধাপে ধাপে টার্মিনালের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম চালু করা হবে। আগামী বছরের মাঝামাঝি নাগাদ পুরো টার্মিনালের দায়িত্ব বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের হাতে হস্তান্তরের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে, নাম বদলের বিতর্ক পাশে রেখে সরকারের মনোযোগ এখন পুরোপুরি এই বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পের বাস্তবায়নের দিকেই কেন্দ্রীভূত।

