সেতু তৈরি হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তার ওপর দিয়ে এখনো চলছে না কোনো যানবাহন। বরিশালের উজিরপুর উপজেলায় প্রায় সাত কোটি টাকা খরচ করে বানানো এই সেতুটি সংযোগ সড়কের অভাবে দেড় বছর ধরে অলস পড়ে আছে। আর এর মূলে রয়েছে জমির মালিকানা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে এক দীর্ঘ বিরোধ।
উজিরপুরের উত্তর ধামুরা খালের ওপর এই সেতুটি বানিয়েছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর। সেতুটি চালু হলে ধামুরা-শোলক-বাটাজোর সড়কের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ তৈরি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সংযোগ সড়ক না থাকায় আশপাশের বেশ কয়েকটি ইউনিয়নের মানুষ—আগৈলঝাড়ার একটি এলাকা, উজিরপুরের দুটি এলাকা এবং গৌরনদীর একটি ইউনিয়নের বাসিন্দারা—এই পথ ব্যবহার করতে পারছেন না।
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের একজন সদস্য জানান, সেতুটি একবার চালু হয়ে গেলে দুই পাড়ের প্রায় এক লাখ মানুষের যাতায়াতের কষ্ট অনেকটাই কমে যাবে।
প্রকৌশল অধিদপ্তরের স্থানীয় দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে তৈরি এই সেতুটি লম্বায় প্রায় চুয়াল্লিশ মিটার, সিমেন্ট-বালু-পাথর-রড দিয়ে তৈরি আরসিসি গার্ডার কাঠামোর এই সেতুর নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ছয় কোটি তিরাশি লাখ টাকা। গ্রামীণ সেতু সহায়তা কর্মসূচির আওতায় ২০২৩ সালের জুলাই মাসে এর নির্মাণকাজ শুরু হয়, আর মূল কাঠামোর কাজ শেষ হয় ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে। দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে এই কাজ সম্পন্ন করে। কিন্তু নির্মাণ শেষ হওয়ার দেড় বছর পার হয়ে গেলেও সংযোগ সড়ক না থাকায় সেতুটি এখনো ব্যবহারের অযোগ্য।
নকশা অনুযায়ী সেতুর দুই প্রান্তেই সংযোগ সড়ক থাকার কথা ছিল। কিন্তু জমির মালিকানা নিয়ে জটিলতায় সেই কাজ আর এগোয়নি। উপজেলা প্রকৌশলী জানান, সেতুর ঢাল নামানোর জন্য প্রায় চৌত্রিশ ফুট খাসজমি রয়েছে, তবে সেই জমি ব্যবহার নিয়ে স্থানীয় কয়েকজনের আপত্তির কারণে কাজ থমকে আছে। তার দাবি, প্রকল্প শুরুর আগেই বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধি ও ভূমি অফিসের কর্মকর্তারা মিলে জমির মালিকানা যাচাই করেছিলেন এবং সব কাগজপত্র ঠিক থাকার পরই নকশা অনুমোদন হয়েছিল। তার মতে, এখনকার বাধা মূলত অযৌক্তিক।
তবে ভিন্ন কথা বলছেন স্থানীয় এক বাসিন্দা, যিনি সেতুর পূর্ব পাশের প্রায় দুই শতক জমির মালিকানা দাবি করছেন। তার ভাষ্য, পুরনো জমির রেকর্ড অনুযায়ী ওই জায়গার মালিক তিনি, আর সংযোগ সড়ক নির্মাণের সময় তার জমি ব্যবহারে তিনি শুরু থেকেই আপত্তি জানিয়ে আসছেন। তার অভিযোগ, যথাযথ অধিগ্রহণ বা ক্ষতিপূরণ ছাড়াই তার জমি ব্যবহারের চেষ্টা চলছে, যা তিনি কোনোভাবেই মেনে নেবেন না। এই বিরোধ নিয়ে তিনি ইতিমধ্যে আদালতে গেছেন এবং সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগও জমা দিয়েছেন উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের কাছে।
সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সেতুর একপ্রান্তে মানুষ কাঠের অস্থায়ী সিঁড়ি বেয়ে ওঠানামা করছে, অন্যপ্রান্তে স্তূপ করে রাখা হয়েছে বালু আর ইট। কোনো গাড়ি চলাচলের সুযোগই নেই সেখানে। এক পথচারী জানান, সংযোগ সড়কের অভাবে কৃষকদের উৎপাদিত ফসল বাজারে নিয়ে যেতেও এখন বাড়তি ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
স্থানীয় প্রশাসনের ভূমি-সংক্রান্ত একজন কর্মকর্তা বলেন, প্রকৌশল অধিদপ্তরের আবেদনের পর তিনি নিজে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। সাম্প্রতিক জরিপে ওই জমি সড়ক হিসেবেই রেকর্ড ও নকশাভুক্ত আছে বলে জানান তিনি, তবে চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত এ নিয়ে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত দেওয়া যাচ্ছে না।
স্থানীয় একটি সুশাসন-বিষয়ক সংগঠনের উপজেলা কমিটির একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি এ প্রসঙ্গে মন্তব্য করেন, এত বিপুল অর্থ ব্যয় করে জনস্বার্থে তৈরি একটি সেতু দেড় বছর ধরে অব্যবহৃত পড়ে থাকা সত্যিই দুঃখজনক এবং এটি দ্রুত সমাধানের দাবি রাখে।

