পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে চলতি বছরের সেপ্টেম্বরেই পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ পাওয়ার আশা করা হয়েছিল। গত এপ্রিলে প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক জ্বালানি লোড করার পর সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছিলেন, কয়েক মাসের মধ্যেই পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু হতে পারে। কিন্তু সেপ্টেম্বর এসে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সম্ভাবনা অনেকটাই কমে গেছে। এমনকি চলতি বছরেই রূপপুর থেকে বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়েও এখন নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না।
এই বিলম্বের পেছনে বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে পারমাণবিক চুল্লির নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ। পরীক্ষার সময় দেখা গেছে, চুল্লিতে ব্যবহৃত পাইলট-অপারেটেড রিলিফ ভালভ বা প্রেসারাইজার সেফটি রিলিফ ভালভের দুটি ইউনিট প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ করছে না।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সমস্যাটি আগে থেকে ধারণা করা হয়নি। বাংলাদেশি ও রাশিয়ান প্রকৌশলীরা যৌথভাবে ত্রুটি চিহ্নিত করে সমাধানের চেষ্টা করছেন। রুশ রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটমের বিশেষজ্ঞ এবং প্রধান নকশাবিদ পর্যায়ের কর্মকর্তারাও বিষয়টি নিয়ে কাজ করছেন।
পারমাণবিক চুল্লিতে এই ধরনের ভালভ সাধারণ কোনো যন্ত্র নয়। চুল্লির ভেতরে তাপমাত্রা ও চাপ নিরাপদ সীমায় রাখা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত চাপ নিয়ন্ত্রণে এর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চুল্লির প্রাথমিক কুলিং সিস্টেমে চাপ নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেড়ে গেলে ভালভটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে খুলে অতিরিক্ত চাপ বা বাষ্প বের করে দেয়। চাপ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এলে আবার ভালভ বন্ধ হয়ে যায়।
কিন্তু রূপপুরের প্রথম ইউনিটে পরীক্ষার সময় দুটি ভালভ স্বয়ংক্রিয়ভাবে খুলছে না। উচ্চ তাপমাত্রা ও চাপের পরিবেশে এগুলো সঠিকভাবে কাজ করার কথা থাকলেও একাধিকবার পরীক্ষা করেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি। যন্ত্র খুলে মেরামতের পর পুনরায় স্থাপন করেও সমস্যা পুরোপুরি কাটেনি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে এ ধরনের ত্রুটি উপেক্ষা করে পরবর্তী ধাপে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কারণ চাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ঠিকমতো কাজ না করলে চুল্লির ভেতরে তাপ ও চাপের ভারসাম্য বিঘ্নিত হতে পারে। এর সঙ্গে পুরো রিয়্যাক্টর সেফটি সিস্টেমের সম্পর্ক রয়েছে।
পারমাণবিক শিল্পে সেফটি রিলিফ ভালভের গুরুত্ব বোঝাতে প্রায়ই ১৯৭৯ সালের যুক্তরাষ্ট্রের থ্রি মাইল আইল্যান্ড দুর্ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়। সেখানে একটি চাপ নিয়ন্ত্রণ ভালভ খোলা অবস্থায় আটকে যাওয়ার পর চুল্লির কুল্যান্ট বের হতে থাকে। প্রথম দিকে অপারেটররা ভালভটির প্রকৃত অবস্থাও বুঝতে পারেননি। পরবর্তীতে ঘটনাটি পারমাণবিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হয়ে দাঁড়ায়।
রূপপুরে ব্যবহৃত ভিভিইআর-১২০০ প্রযুক্তিতে নিরাপত্তা বাড়াতে একাধিক স্বাধীন ভালভ রাখা হয়েছে। একটি ভালভে সমস্যা দেখা দিলে অন্যগুলো বিকল্প সুরক্ষা দেওয়ার জন্য নকশা করা হয়েছে। তারপরও প্রতিটি নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে পরীক্ষায় শতভাগ কার্যকর প্রমাণ করতে হয়।
বর্তমান সমস্যাটি মেরামতের মাধ্যমে সমাধান করা গেলে কমিশনিং কার্যক্রম দ্রুত এগোতে পারে। তবে বিদ্যমান ভালভ ব্যবহারযোগ্য না হলে নতুন করে একই স্পেসিফিকেশনের যন্ত্র তৈরি করে আনতে হতে পারে। সেটি হলে সময় আরও বাড়বে।
কারণ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের এ ধরনের যন্ত্রাংশ সাধারণ বাজার থেকে কিনে এনে বসিয়ে দেওয়া যায় না। নির্দিষ্ট চুল্লির নকশা, তাপমাত্রা, চাপ এবং নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুযায়ী যন্ত্র তৈরি করতে হয়। নতুন ভালভ তৈরি, পরিবহন, স্থাপন এবং পুনরায় পরীক্ষা—সব মিলিয়ে পুরো প্রক্রিয়াটি দীর্ঘ হতে পারে।
এখানেই শেষ নয়। ভালভের সমস্যার সমাধান হওয়ার পরও বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করার আগে আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা বাকি রয়েছে। জ্বালানি লোডিং পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হলেও সেটি শেষ ধাপ নয়।
পরবর্তী সময়ে ক্রিটিক্যালিটি টেস্ট, রিয়্যাক্টরের বিভিন্ন নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরীক্ষা, টারবাইন ও জেনারেটরের কার্যকারিতা যাচাই, গ্রিডের সঙ্গে সিঙ্ক্রোনাইজেশন এবং জরুরি পরিস্থিতিতে স্বয়ংক্রিয় সুরক্ষা ব্যবস্থা ঠিকমতো কাজ করছে কি না—এসবসহ শত শত পরীক্ষা সম্পন্ন করতে হবে।
উদাহরণ হিসেবে, হঠাৎ বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে কেন্দ্রের জরুরি ব্যবস্থা কত দ্রুত সক্রিয় হয়, কুলিং ব্যবস্থা ঠিক থাকে কি না, রিয়্যাক্টরের চাপ ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে কি না—এসবও আলাদাভাবে পরীক্ষা করা হয়।
প্রতিটি পরীক্ষার ফল পর্যালোচনা করবে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ। নিয়ন্ত্রক সংস্থা সন্তুষ্ট না হলে পরীক্ষামূলক উৎপাদনের অনুমতি পাওয়া যাবে না। প্রয়োজন হলে কোনো কোনো নিরাপত্তা পরীক্ষা তৃতীয় পক্ষ দিয়েও যাচাই করা হতে পারে।
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষেত্রে সময়ের চেয়ে নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। এজন্য সমস্যা ধরা পড়লে নির্ধারিত সময়সূচি ধরে রাখার পরিবর্তে সমস্যার কারণ খুঁজে বের করে সমাধান করা হয়। তারপর আবার পরীক্ষা করে নিশ্চিত হতে হয় যে একই সমস্যা নতুন করে দেখা দেবে না।
এ কারণে এখনই রূপপুরের প্রথম ইউনিট থেকে ঠিক কবে বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে, সেই তারিখ সরকারও বলতে পারছে না। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অবস্থান হলো, নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে উৎপাদন শুরুর জন্য কোনো ধরনের তাড়াহুড়া করা হবে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পারমাণবিক প্রকল্পে জ্বালানি লোড করার পরও পূর্ণ ক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে যেতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতায় কমিশনিংয়ের সব ধাপ শেষ করে জাতীয় গ্রিডে পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ দিতে প্রায় দশ মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত সময় লাগার নজির রয়েছে।
রূপপুরের প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোড করার পর ইতোমধ্যে ৯০টির বেশি পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে বর্তমান সেফটি ভালভের সমস্যাটি সমাধান না হওয়া পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরবর্তী পরীক্ষাগুলোতে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
প্রকল্পের সময়সূচি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। রাশিয়ার সঙ্গে প্রথম দিকের পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৩ সালেই রূপপুরের প্রথম ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর লক্ষ্য ছিল। কিন্তু করোনা মহামারি, আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থার সংকট, ইউক্রেন যুদ্ধকে ঘিরে ভূরাজনৈতিক জটিলতা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন পর্যায়ের বিলম্বের কারণে সময়সূচি পিছিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রকল্পটির কমিশনিং নিয়ে বাংলাদেশ ও রোসাটমের মধ্যে বিস্তারিত লিখিত সময়সূচি থাকা গুরুত্বপূর্ণ। কোন পরীক্ষা কখন হবে, কোনো যন্ত্রে সমস্যা দেখা দিলে কার দায়িত্বে কীভাবে সমাধান হবে, বিলম্ব হলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এসব বিষয় স্পষ্ট থাকলে প্রকল্প ব্যবস্থাপনা আরও স্বচ্ছ হয়।
রূপপুর নিয়ে মানুষের আগ্রহ বাড়লেও প্রকল্পের বর্তমান অগ্রগতি সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য প্রকাশ না হওয়ায় বিভ্রান্তিও তৈরি হচ্ছে। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, প্রকল্পের জন্য একটি নির্দিষ্ট মিডিয়া সেল বা মুখপাত্র থাকলে পরীক্ষার অগ্রগতি, সমস্যা এবং সমাধান সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য দেওয়া সম্ভব হতো।
রাশিয়ার ঋণ ও কারিগরি সহায়তায় নির্মাণাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট উৎপাদন ক্ষমতা ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। দুটি ইউনিটের প্রতিটির ক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট।
দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ও উৎপাদনের চাপ বিবেচনায় রূপপুরের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়া গুরুত্বপূর্ণ। তবে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষেত্রে দ্রুত উৎপাদন শুরুর চেয়ে নিরাপদ উৎপাদন শুরু করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে তাই রূপপুর থেকে বিদ্যুৎ পাওয়ার জন্য আরও অপেক্ষা করতে হতে পারে। কতদিন অপেক্ষা করতে হবে, সেটি নির্ভর করবে ত্রুটিপূর্ণ সেফটি ভালভের সমস্যার সমাধান, পরবর্তী পরীক্ষাগুলোর ফল এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনের ওপর। সব পরীক্ষা সফলভাবে শেষ হওয়ার পরই রূপপুরের প্রথম ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার পথ খুলবে।

