ঢাকা বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শহর। দেশের অর্থনীতি, প্রশাসন, শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সংস্কৃতির কেন্দ্র হিসেবে এই শহরের গুরুত্ব অপরিসীম। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ জীবিকা, শিক্ষা ও উন্নত ভবিষ্যতের আশায় ঢাকায় আসে। একসময় ঢাকা ছিল নদী, খাল, জলাশয়, সবুজ গাছপালা ও উন্মুক্ত জায়গায় ঘেরা একটি প্রাণবন্ত শহর। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই পরিচয় অনেকটাই হারিয়ে গেছে।
আজকের ঢাকা ক্রমেই একটি কংক্রিটের নগরীতে পরিণত হচ্ছে। যেখানে মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু বাড়ছে না জীবনযাপনের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা। যানজট, বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, জলাবদ্ধতা, তীব্র গরম, খেলার মাঠের সংকট এবং অপরিকল্পিত নির্মাণ—সব মিলিয়ে রাজধানী এখন একটি বড় নগর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
ঢাকার এই অবস্থার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে শিশুদের জীবনে। একটি শিশুর স্বাভাবিক বেড়ে ওঠার জন্য প্রয়োজন খেলার মাঠ, গাছপালা, খোলা জায়গা এবং সামাজিক যোগাযোগের সুযোগ। কিন্তু ঢাকার অনেক শিশুর জীবন এখন সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে অ্যাপার্টমেন্টের চার দেয়ালের মধ্যে। ঘরের বাইরে নিরাপদে হাঁটা, খেলাধুলা করা কিংবা প্রকৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ অনেকেরই নেই।
একসময় একটি পাড়া মানেই ছিল মানুষের মধ্যে পরিচয়, বিকেলের খেলাধুলা, প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক এবং সামাজিক বন্ধন। কিন্তু বর্তমান ঢাকার অ্যাপার্টমেন্টকেন্দ্রিক জীবন মানুষকে একে অপরের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। একই ভবনে শত শত মানুষ বসবাস করলেও অনেক সময় তারা একে অপরকে চেনেন না। শহরের আকার বাড়লেও মানুষের সামাজিক সম্পর্ক সংকুচিত হচ্ছে।
পুরান ঢাকার লালবাগের বালুর মাঠ এই বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার মধ্যে এই মাঠটি স্থানীয় মানুষের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উন্মুক্ত জায়গা। প্রতিদিন শিশু, তরুণ ও বয়স্ক মানুষ এখানে আসে। কেউ খেলাধুলা করে, কেউ হাঁটাহাঁটি করে, কেউ আবার কিছু সময় খোলা পরিবেশে কাটানোর সুযোগ পায়।
কিন্তু ঢাকার মতো বিশাল জনসংখ্যার শহরের জন্য এমন উন্মুক্ত জায়গা অত্যন্ত অপ্রতুল। একটি বাসযোগ্য শহরের জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত মাঠ, পার্ক ও সবুজ এলাকা। অথচ ঢাকায় এসব জায়গা দিন দিন কমছে।
ঢাকার বর্তমান সংকট হঠাৎ তৈরি হয়নি। এটি দীর্ঘদিনের পরিকল্পনার ব্যর্থতার ফল। ঢাকার জন্য বিভিন্ন সময়ে একাধিক নগর পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছিল। ১৯১৭ সালে নগর পরিকল্পনাবিদ স্যার প্যাট্রিক গেডেস ঢাকার জন্য একটি পরিকল্পনা তৈরি করেন, যেখানে শহরের প্রাকৃতিক পরিবেশ, খাল, জলাশয় এবং সবুজ এলাকা সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।
পরবর্তীতে ১৯৫৯ সালের প্রথম মাস্টারপ্ল্যানেও ঢাকার জলাধার, খোলা জায়গা এবং পরিকল্পিত সম্প্রসারণের কথা বলা হয়। কিন্তু এসব পরিকল্পনার বড় অংশ বাস্তবায়িত হয়নি। বরং সময়ের সঙ্গে শহর বেড়েছে অনেকটা অনিয়ন্ত্রিতভাবে।
যেখানে জমি পাওয়া গেছে, সেখানেই ভবন তৈরি হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে শহরের দীর্ঘমেয়াদি প্রয়োজনের চেয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থ বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। এর ফলে ঢাকার প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে এবং শহরের জীবনযাত্রা আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
ঢাকার জমির ব্যবহার পরিবর্তনও শহরের বর্তমান সংকটের অন্যতম কারণ। যেসব জায়গা খোলা থাকার কথা ছিল, সেখানে তৈরি হয়েছে ভবন। যেসব জায়গা জলাধার হিসেবে থাকার কথা ছিল, সেগুলো ভরাট করে তৈরি হয়েছে আবাসন প্রকল্প। যেসব এলাকা আবাসিক থাকার কথা ছিল, সেগুলো ধীরে ধীরে বাণিজ্যিক এলাকায় পরিণত হয়েছে।
ধানমন্ডির পরিবর্তন এর একটি উদাহরণ। একসময় এই এলাকা পরিকল্পিত আবাসিক অঞ্চল হিসেবে গড়ে উঠেছিল। সেখানে কম উচ্চতার বাড়ি, বাগান এবং খোলা জায়গার ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে ধানমন্ডির চরিত্র বদলে গেছে। এখন সেখানে অসংখ্য বহুতল ভবন, অফিস, হাসপাতাল, রেস্টুরেন্ট ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছে।
এই পরিবর্তনের ফলে মানুষের চাপ বেড়েছে, যানজট বেড়েছে এবং একটি পরিকল্পিত এলাকার স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হয়েছে।
ঢাকার সবচেয়ে পরিচিত সমস্যাগুলোর একটি হলো যানজট। একটি আধুনিক শহরের জন্য পর্যাপ্ত রাস্তা প্রয়োজন। কিন্তু ঢাকার আয়তনের তুলনায় রাস্তার পরিমাণ খুবই কম। এই সীমিত সড়কে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক যানবাহন চলাচল করছে।
এর ফলে মানুষ প্রতিদিন দীর্ঘ সময় রাস্তায় আটকে থাকে। কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়, উৎপাদনশীলতা কমে এবং মানুষের মানসিক চাপ বাড়ে। যানজট এখন শুধু একটি যাতায়াত সমস্যা নয়, এটি দেশের অর্থনীতির ওপরও বড় ধরনের চাপ তৈরি করছে।
ঢাকার পরিবেশগত সংকটের আরেকটি বড় কারণ হলো সবুজের ক্ষয়। কয়েক দশকের মধ্যে শহরের গাছপালা, মাঠ এবং খোলা জায়গার বড় অংশ হারিয়ে গেছে। এর জায়গা নিয়েছে কংক্রিটের ভবন।
গাছপালা ও জলাশয় শহরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু এসব কমে যাওয়ার কারণে ঢাকায় গরমের তীব্রতা বাড়ছে। শহরের কংক্রিটের ভবনগুলো দিনের তাপ ধরে রাখে, ফলে রাতেও শহর ঠান্ডা হতে পারে না।
একইভাবে ঢাকার খাল ও জলাশয় হারিয়ে যাওয়াও বড় সমস্যা তৈরি করেছে। একসময় ঢাকা ছিল খালের শহর। এসব খাল পানি নিষ্কাশন এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত।
কিন্তু বছরের পর বছর দখল ও ভরাটের কারণে অনেক খাল হারিয়ে গেছে। এর ফলে বর্ষাকালে সামান্য বৃষ্টিতেই শহরের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। পানি বের হওয়ার স্বাভাবিক পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই সমস্যা দিন দিন বাড়ছে।
ঢাকার পানির ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। শহরের বিপুল পরিমাণ পানি ভূগর্ভ থেকে উত্তোলন করা হয়। অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে।
দীর্ঘমেয়াদে এটি ঢাকার জন্য বড় পরিবেশগত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। একটি বড় শহরের টেকসই ভবিষ্যতের জন্য নিরাপদ পানির উৎস নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ঢাকার ঘনবসতি ও অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ দুর্যোগের ঝুঁকিও বাড়িয়েছে। বিশেষ করে ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে শহরের প্রস্তুতি নিয়ে বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন।
অনেক ভবন নির্মাণে নিয়ম মানা হয়নি। অনেক এলাকায় রাস্তা এতটাই সংকীর্ণ যে জরুরি অবস্থায় উদ্ধারকারী যান প্রবেশ করা কঠিন হয়ে পড়ে। বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে ক্ষয়ক্ষতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হতে পারে।
অগ্নিকাণ্ডও ঢাকার জন্য বড় হুমকি। পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়া নির্মিত ভবন, সরু রাস্তা এবং ঘনবসতির কারণে আগুন লাগলে দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে যায়।
ঢাকার সংকট শুধু পরিবেশ বা অবকাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি একটি সামাজিক সংকটও। শহরের একদিকে রয়েছে আধুনিক সুযোগ-সুবিধায় ভরা এলাকা, অন্যদিকে রয়েছে বিপুলসংখ্যক মানুষের বস্তি ও অনুন্নত জীবনযাপন।
যারা ঢাকার অর্থনীতিকে সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন, সেই নিম্নআয়ের মানুষরাই অনেক সময় নিরাপদ বাসস্থান, স্বাস্থ্যসেবা এবং অন্যান্য নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন।
ঢাকাকে বাঁচাতে হলে শুধু নতুন রাস্তা, ভবন বা প্রকল্প তৈরি করলেই হবে না। প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত নগর পরিকল্পনা। শহরের খাল, জলাশয় ও সবুজ এলাকা রক্ষা করতে হবে। গণপরিবহন ব্যবস্থাকে উন্নত করতে হবে। ভবন নির্মাণে নিয়ম কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে।
একই সঙ্গে ঢাকার বাইরে কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বাড়াতে হবে, যাতে দেশের সব মানুষকে রাজধানীতে আসতে বাধ্য না হতে হয়।
ঢাকার বর্তমান সংকট কয়েক দিনের সৃষ্টি নয়। এটি কয়েক দশকের ভুল সিদ্ধান্ত, পরিকল্পনার ব্যর্থতা এবং অপরিকল্পিত উন্নয়নের ফল।
একটি শহরের উন্নয়ন শুধু উঁচু ভবন বা বড় রাস্তা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। একটি সত্যিকারের উন্নত শহর হলো যেখানে মানুষ নিরাপদে বসবাস করতে পারে, শিশুরা খেলতে পারে, মানুষ স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারে এবং প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে পারে।
ঢাকাকে বাঁচাতে হলে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ একটি শহর হারিয়ে গেলে শুধু ভবন হারায় না, হারিয়ে যায় মানুষের জীবনযাত্রা, স্মৃতি এবং ভবিষ্যৎ।

