একটি শিশুর জীবনে বইয়ের সঙ্গে পরিচয়ের সময় কখন – স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর, নাকি অক্ষর চেনার পর? আসলে তারও আগে। শিশুর বইয়ের যাত্রা শুরু হতে পারে জন্মের পর থেকেই। বাবা-মায়ের কণ্ঠে গল্প শোনা, ছবির বইয়ের পাতা ওলটানো, ছড়ার শব্দে আনন্দ পাওয়া এসবই ভবিষ্যতের পাঠাভ্যাসের ভিত্তি তৈরি করে।
কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় আমরা শিশুর হাতে বই তুলে দেওয়ার বিষয়টিকে এখনো অনেকটাই পরীক্ষার ফলাফল ও স্কুলের পড়াশোনার সঙ্গে মিলিয়ে দেখি। বই মানেই যেন পাঠ্যবই। গল্পের বই, ছড়ার বই, বিজ্ঞানভিত্তিক বই কিংবা ছবির বইকে অনেক পরিবার এখনো ‘অতিরিক্ত’ হিসেবে বিবেচনা করে। অথচ একটি শিশুর মনন, কল্পনাশক্তি, ভাষা, প্রশ্ন করার ক্ষমতা এবং অন্যকে বোঝার সক্ষমতা তৈরিতে এই ‘অতিরিক্ত’ বইগুলোর ভূমিকা অসাধারণ।
সমস্যাটি আরও গভীর হয়েছে ডিজিটাল যুগে। স্মার্টফোন, ট্যাব ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সহজলভ্যতায় শিশুর মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে উঠছে। বাংলাদেশে করা এক জরিপেও দেখা গেছে, অভিভাবকদের বড় একটি অংশ শিশুদের বইবিমুখতার প্রধান কারণ হিসেবে ডিজিটাল ডিভাইসের প্রতি আসক্তিকে দেখছেন। একই সঙ্গে দেখা গেছে, যে পরিবারে বড়রা নিয়মিত বই পড়েন, সেসব পরিবারের শিশুদের মধ্যেও বই পড়ার প্রবণতা তুলনামূলক বেশি।
অর্থাৎ শিশুকে বই পড়তে বলার আগে আমাদের নিজেদের প্রশ্ন করতে হবে- *আমরা কি বই পড়ি*?
শিশুর হাতে মোবাইল দিয়ে তাকে বই পড়ার উপদেশ দেওয়া খুব একটা কার্যকর হতে পারে না। সন্তান যদি প্রতিদিন বাবা-মাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফোনে ব্যস্ত থাকতে দেখে, তাহলে বই তার কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে কীভাবে? শিশুর পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার প্রথম পাঠশালা আসলে পরিবার।
বাংলাদেশের আরেকটি বড় সমস্যা হলো বই আছে, কিন্তু বই পৌঁছানোর ব্যবস্থা দুর্বল। রাজধানী বা বড় শহরে বইয়ের দোকান, লাইব্রেরি কিংবা শিশুতোষ বইয়ের কিছুটা সুযোগ থাকলেও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক শিশুর জন্য ভালো বই এখনো সহজলভ্য নয়। অনেক বিদ্যালয়ে লাইব্রেরি থাকলেও সেটি নিয়মিত ব্যবহারের সংস্কৃতি তৈরি হয়নি। ফলে বই থাকে তাকের ভেতরে, কিন্তু শিশু থাকে বইয়ের বাইরে।
এখানেই রাষ্ট্র, সমাজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব।
প্রতিটি স্কুলে কার্যকর শিশু পাঠাগার থাকা দরকার। শুধু আলমারিতে বই সাজিয়ে রাখলেই লাইব্রেরি হয় না। সপ্তাহে নির্দিষ্ট সময় শিশুদের বই পড়ার সুযোগ দিতে হবে। বয়স ও আগ্রহ অনুযায়ী বই বাছাই করার স্বাধীনতা দিতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ে ছোট ছোট কমিউনিটি লাইব্রেরি গড়ে তোলা যেতে পারে। ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে বই বিনিময়, ভ্রাম্যমাণ পাঠাগার ও শিশু পাঠচক্র চালু করা যেতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, *শিশুকে বই পড়ানো যাবে না শুধু – শিশুকে বই ভালোবাসতে শেখাতে হবে*।
একটি শিশু যদি গল্পের বই পড়ে আনন্দ পায়, তাহলে তাকে বইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে দেওয়া উচিত। সে রূপকথা পড়ুক, বিজ্ঞান পড়ুক, প্রাণীজগত পড়ুক, কমিকস পড়ুক কিংবা বাংলাদেশের ইতিহাসের গল্প পড়ুক-শুরুটা হোক তার নিজের আগ্রহ থেকে। বই পড়াকে যদি আরেকটি পরীক্ষার বিষয় বানিয়ে ফেলা হয়, তাহলে বইও তার কাছে পাঠ্যবইয়ের মতোই বিরক্তিকর হয়ে উঠবে।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শুধু কতজন শিশু পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেল, তার ওপর নির্ভর করে না। ভবিষ্যৎ নির্ভর করে *কতজন শিশু প্রশ্ন করতে শেখে, যুক্তি দিয়ে ভাবতে শেখে, ভিন্নমতকে সম্মান করতে শেখে এবং অন্যের কষ্ট বুঝতে শেখে* তার ওপর।
আর এই মানুষ তৈরির কাজে বইয়ের বিকল্প খুব কম। তাই শিশুর জন্মদিনে দামি খেলনার পাশাপাশি একটি বই হোক উপহার। ঈদে, পূজায় কিংবা যেকোনো উৎসবে শিশুর হাতে একটি বই তুলে দেওয়া হোক। বাবা-মা রাতে কিছু সময় সন্তানের সঙ্গে বই পড়ুন। ঘরে ছোট হলেও একটি বইয়ের তাক থাকুক। স্কুলে পাঠাগার থাকুক, আর সেই পাঠাগারে শিশুর প্রবেশাধিকার থাকুক।
কারণ একটি বই হয়তো আজ একটি শিশুর হাতে যাচ্ছে। কিন্তু সেই বইয়ের ভেতর দিয়ে সে যে পৃথিবীটাকে আবিষ্কার করবে, তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে পারে পুরো সমাজে।
শিশুর হাতে বই তুলে দেওয়া কোনো বিলাসিতা নয়; এটি একটি জ্ঞানভিত্তিক, মানবিক ও সহনশীল বাংলাদেশ তৈরির বিনিয়োগ।
আমরা যদি সত্যিই আগামী প্রজন্মকে বদলাতে চাই, তাহলে পরিবর্তনের শুরুটা হতে পারে খুব ছোট একটি জায়গা থেকে – একটি শিশুর হাতে একটি বই দিয়ে।

