বিডিআর বিদ্রোহে সাজাপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তি সাজা ভোগ শেষ করার পর তার বিরুদ্ধে অন্য কোনো মামলা না থাকলে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কারাগার থেকে খালাস পান বলে সংসদে সাফ জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) বিকালে জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে নওগাঁ-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. ফজলে হুদার লিখিত প্রশ্নের জবাবে তিনি এই বক্তব্য দেন। প্রশ্ন ছিল, বিডিআর বিদ্রোহে সাজাপ্রাপ্ত অনেক সদস্য সাজা ভোগ করে বের হওয়ার পরও আওয়ামী লীগ আমলের মামলায় হয়রানির শিকার হচ্ছেন। এ ধরনের হয়রানি বন্ধে মন্ত্রণালয় সুনির্দিষ্ট কোনো পদক্ষেপ নেবে কি না এবং সাজা শেষ হওয়া বিডিআর বিদ্রোহে সাজাপ্রাপ্তদের দ্রুত খালাসের পরিকল্পনা আছে কি না। ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে এই অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়।
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “বিডিআর বিদ্রোহ সংক্রান্ত মামলাসমূহ ইতোমধ্যে আদালতের সুনির্দিষ্ট বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়েছে।” তিনি আরও জানান, প্রচলিত আইন অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি সাজা ভোগ করার পর তার বিরুদ্ধে নতুন কোনো মামলা থাকলে তা যথাযথ তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে থাকে। অর্থাৎ, সাজা শেষ হলেই কেউ স্বয়ংক্রিয়ভাবে মুক্তি পান না, তার বিরুদ্ধে অন্য মামলা থাকলে সেই মামলার নিষ্পত্তি হওয়া পর্যন্ত তাকে কারাগারে থাকতে হয়। এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট হলো, যাদের বিরুদ্ধে এখনো মামলা চলছে, তারা আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে নন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও স্পষ্ট করে বলেন, “শুধুমাত্র পরিচয়, পূর্ববর্তী সাজা বা রাজনৈতিক বিবেচনার ভিত্তিতে কেউ যেন কোনো প্রকার অযথা হয়রানির শিকার না হয়, সে লক্ষ্যে পুলিশকে স্পষ্ট ও কঠোর নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।” তবে কোনো ব্যক্তি যদি আইনবহির্ভূত বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়রানি, মিথ্যা মামলা কিংবা কোনো অযৌক্তিক পরিস্থিতির সম্মুখীন হন, তবে সেই অভিযোগের সত্যতা ও বস্তুনিষ্ঠতা নিবিড়ভাবে যাচাই করে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দ্রুত প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও জানান তিনি। এই বক্তব্যে দুই দিকের বার্তা স্পষ্ট, হয়রানি বন্ধে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, আবার অভিযোগ প্রমাণিত হলে ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।
প্রসঙ্গত, ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় তৎকালীন বিডিআর সদর দপ্তরে সংঘটিত বিদ্রোহে ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তা ও ৭ জন বেসামরিক নাগরিকসহ মোট ৭৪ জন নিহত হন। এই হত্যাকাণ্ডের বিচারে ১৮টি বিশেষ আদালত গঠন করা হয়। এরপর বাহিনীর নাম পরিবর্তন করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) রাখা হয়। বিচারিক প্রক্রিয়ায় নিম্ন আদালত ১৫২ জনকে মৃত্যুদণ্ড, ১৬১ জনকে যাবজ্জীবন, ২৫৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেয় এবং ২৭৮ জনকে মামলা থেকে খালাস দেয়। হাইকোর্ট পরে ১৩৯ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে, ১৮৫ জনকে যাবজ্জীবন দেয় এবং ২৮৩ জনকে খালাস দেয়। তবে হত্যা মামলায় খালাস পাওয়া বা সাজা শেষ হওয়া অনেকের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক আইনের মামলা চলমান থাকায় দীর্ঘদিন তাদের কারাগারে থাকতে হয়েছে।
এই বাস্তবতা থেকেই গত কয়েক বছর ধরে বিডিআর সদস্যদের মুক্তির দাবি জোরালো হয়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে হত্যা মামলায় খালাসপ্রাপ্ত ও সাজা শেষ হওয়া ১৭৮ জন বিডিআর সদস্য বিস্ফোরক মামলায় জামিন পেয়ে কারাগার থেকে মুক্তি পান। এরপর ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত আরও কয়েক ধাপে কয়েকশ সদস্য জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। কিন্তু এখনো ১৬১ জন বিডিআর সদস্য বিস্ফোরক মামলার বিচার চলার কারণে কারাগারে আছেন। তাদের পরিবার ও স্বজনরা দীর্ঘদিন ধরে মুক্তির দাবিতে মানববন্ধন ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করে আসছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই জবাব তাদের জন্য নতুন করে আশার আলো তৈরি করেছে, তবে এই আশা কতটা বাস্তবে রূপ নেবে, তা নির্ভর করছে বিচারিক প্রক্রিয়ার গতির ওপর।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্য শুধু একটি আইনি ব্যাখ্যা নয়, বরং বিডিআর বিদ্রোহ-পরবর্তী সময়ে সৃষ্ট জটিলতার এক স্পষ্ট চিত্র। একদিকে সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে যারা সাজা শেষ করেছেন কিন্তু অন্য মামলার কারণে জেলে আছেন, অন্যদিকে যারা হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ করছেন, এই দুই ধরনের মানুষই সরকারের নজরে আছেন বলে সংসদে জানানো হলো। এখন দেখার বিষয়, পুলিশের প্রতি দেওয়া কঠোর নির্দেশনা কতটা কার্যকর হয় এবং বিস্ফোরক মামলার বিচার দ্রুত নিষ্পত্তি হয়ে কারাগারে থাকা বিডিআর সদস্যদের ভাগ্য নির্ধারিত হয় কত দ্রুত।

