সরকারি চাকরির ১১ থেকে ২০তম গ্রেডে নিয়োগের ক্ষেত্রে মৌখিক বা ভাইভা পরীক্ষার নম্বর সর্বোচ্চ ৪০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রশাসনিক উন্নয়নসংক্রান্ত সচিব কমিটির বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে বলে জানা গেছে। নতুন প্রস্তাবে ১১ ও ১২তম গ্রেডে লিখিত পরীক্ষায় ১০০ নম্বরের বিপরীতে ভাইভায় ৫০ নম্বর, ১৩ থেকে ১৬তম গ্রেডে লিখিত ৬০-এর বিপরীতে ভাইভায় ৪০ এবং ১৭ থেকে ২০তম গ্রেডে লিখিত ও ভাইভা, দুই পরীক্ষাতেই ২৫ নম্বর করে রাখার কথা বলা হয়েছে। বর্তমানে এসব পদে ভাইভার নম্বর ছিল মাত্র ১০। সিদ্ধান্তটি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী এই সিদ্ধান্তকে ‘বিএনপি সরকারের নির্লজ্জ দলীয়করণের অশুভ ইঙ্গিত’ বলে আখ্যা দিয়েছে।
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) এক বিবৃতিতে বলেছেন, বর্তমান সরকার রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে চরম দলীয়করণ শুরু করেছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসনসহ সচিবালয়ের গুরুত্বপূর্ণ পদে দলীয় বিবেচনায় মেধাহীন, অযোগ্য ও বিতর্কিত ব্যক্তিদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “বৈষম্যহীন, দুর্নীতিমুক্ত, ন্যায়ভিত্তিক ও মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ছিল জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম আকাঙ্ক্ষা। অথচ সরকারি চাকরির নিয়োগব্যবস্থায় এমন একটি বিধিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা মেধার মূল্যায়নকে দুর্বল করে নিয়োগে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক প্রভাব ও দুর্নীতির পথ উন্মুক্ত করবে।” লিখিত পরীক্ষা একজন প্রার্থীর জ্ঞান, মেধা ও বিশ্লেষণী সক্ষমতা বস্তুনিষ্ঠভাবে যাচাইয়ের সুযোগ দেয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, “অন্যদিকে মৌখিক পরীক্ষার মূল্যায়ন অনেকাংশেই বোর্ডের ব্যক্তিগত পছন্দ-অপপছন্দের ওপর নির্ভরশীল।”
জামায়াতের পাশাপাশি অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও জোটের নেতারাও এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম বলেছেন, “বিএনপি ক্ষমতার অপব্যবহার করছে। আমরা দেখছি তারা প্রত্যেকটা জায়গায় দলীয়করণ করছে, স্বজনপ্রীতি করছে, সরকারি নিয়োগে ভাইভা নম্বর ৪০০ শতাংশ বাড়িয়েছে, যেন কেউ প্রিলি-রিটেন টিকলেই বিএনপি কোটায় চাকরি দেওয়া যায়।” এনসিপির আহ্বায়ক ও সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, “সরকারি চাকরির ভাইভা পরীক্ষায় ৪০০ শতাংশ নম্বর বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। সবার সঙ্গে আলোচনা না করে নম্বর বাড়ানো হলে সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর কর্মসূচি নেওয়া হবে।” কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে লিখিত পরীক্ষায় মেধা ও যোগ্যতার মূল্যায়ন বাড়িয়ে ভাইভার প্রভাব কমানোর দাবি ছিল। অথচ প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় তার উল্টোটা করা হচ্ছে।”
শুধু রাজনৈতিক নেতারা নন, শিক্ষার্থীরাও রাস্তায় নেমেছেন। সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের একাধিক ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন হয়েছে। বিক্ষোভকারীরা ‘ভাইভা না মেধা, মেধা মেধা’, ‘কোটা গেছে যে পথে, ভাইভা যাবে সে পথে’ এবং ‘বেশি মার্ক ভাইভায়, চাকরি হবে পয়সায়’ এসব স্লোগান দিয়েছেন। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (জকসু) সহসভাপতি মো. রিয়াজুল ইসলাম বলেছেন, “লিখিত পরীক্ষার নম্বর কমিয়ে ভাইভায় নম্বর বাড়ানোর প্রস্তাব দুর্নীতি ও দলীয়করণের সুযোগ তৈরি করবে।” রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সজিবুর রহমান সজিবের ভাষায়, “ভাইভায় ১০ থেকে ৫০ নম্বর করা মেধাধ্বংসকারী সিদ্ধান্ত। এর মাধ্যমে দলীয়করণ, তদবির ও সুপারিশের সুযোগ তৈরি হবে।”
অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে সিদ্ধান্তটিকে ‘দক্ষ ও যোগ্য প্রশাসনিক জনবল নিশ্চিত করার উদ্যোগ’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেছেন, “চাকরির জন্য কেবল বইভিত্তিক জ্ঞান নয়, আরও কিছু দক্ষতা ও অ্যাপটিটিউড প্রয়োজন হয়, যা মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে মূল্যায়ন করা সম্ভব।” তবে ভাইভা তুলনামূলকভাবে ‘সাবজেক্টিভ’ হওয়ায় সেখানে পছন্দের প্রার্থীকে সুবিধা দেওয়ার সুযোগ থাকতে পারে, এই আশঙ্কার সঙ্গেও তিনি দ্বিমত করেননি। জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী জানিয়েছেন, মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বাড়ানোর বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি; বিষয়টি পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো নিয়োগে স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবের সুযোগ বৃদ্ধি। লিখিত পরীক্ষার ফল তুলনামূলকভাবে বস্তুনিষ্ঠ এবং তা সংরক্ষণ, পুনর্মূল্যায়ন ও অডিট করা সম্ভব। কিন্তু ভাইভার নম্বর অতিরিক্ত বাড়লে লিখিত পরীক্ষায় অর্জিত মেধাক্রমকে সহজেই উল্টে দেওয়া সম্ভব। উদাহরণস্বরূপ, একজন প্রার্থী লিখিত পরীক্ষায় ৬০ নম্বর পেলেন, আরেকজন পেলেন ৫০। কিন্তু ভাইভায় দ্বিতীয়জন প্রথমজনের চেয়ে ১৫ বা ২০ নম্বর বেশি পেলে তিনি সামনে চলে আসতে পারেন। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর শিক্ষার্থীরা এই ধরনের সিদ্ধান্ত মেনে নেবে না বলে স্পষ্ট করে দিয়েছেন। এখন দেখার বিষয়, সরকার শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ ও বিরোধী দলগুলোর আপত্তি কতটা আমলে নেয় এবং সিদ্ধান্তটি চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন আকারে জারি করে কি না।

