গ্যাসের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মোকাবিলায় বড় পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে দেশে অতিরিক্ত এক হাজার ছয়শ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ সক্ষমতা যুক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। জাপানের রাজধানীতে অনুষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক জ্বালানি সম্মেলনে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি কৌশল তুলে ধরার সময় এই পরিকল্পনার বিস্তারিত জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিমন্ত্রী।
সম্প্রতি টোকিওতে অনুষ্ঠিত পঞ্চদশ এলএনজি উৎপাদক-ভোক্তা সম্মেলনে তিনি জানান, জ্বালানি নিরাপত্তার ধারণা এখন আর শুধু জ্বালানির প্রাপ্যতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। নির্ভরযোগ্য সরবরাহ, উৎসের বৈচিত্র্য, সাশ্রয়ী মূল্য এবং বাজারের ওঠানামার সঙ্গে দ্রুত খাপ খাওয়ানোর সক্ষমতা—এসবই এখন সমান গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ধাপে ২০২৮ সালের মধ্যে মহেশখালীতে বসানো হবে ছয়শ মিলিয়ন ঘনফুট সক্ষমতার একটি নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল। এরপর দ্বিতীয় ধাপে ২০৩০ সালের মধ্যে মাতারবাড়ীতে গড়ে তোলা হবে এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট সক্ষমতার একটি স্থলভিত্তিক টার্মিনাল। বর্তমানে দেশে সচল থাকা দুটি ভাসমান টার্মিনালের মাধ্যমে দৈনিক প্রায় এগারোশ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে, যেখানে বার্ষিক চাহিদা রয়েছে প্রায় সাত মিলিয়ন টনের কাছাকাছি।
বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, দ্রুত নগরায়ণ, শিল্প খাতের সম্প্রসারণ এবং বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে গ্যাসের প্রয়োজনীয়তা প্রতি বছরই বাড়ছে। কিন্তু দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন এই চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না বহু বছর ধরে। ফলে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এখন জাতীয় সরবরাহ ব্যবস্থার অপরিহার্য একটি স্তম্ভে পরিণত হয়েছে। নতুন দুটি টার্মিনাল চালু হলে দেশের গ্যাস গ্রহণ ও পুনর্গ্যাসীকরণ সক্ষমতা বর্তমান অবস্থার তুলনায় বড় পরিসরে বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করছে সংশ্লিষ্ট মহল।
শুধু স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনাতেই সীমাবদ্ধ নেই সরকারের চিন্তাভাবনা। প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, চলতি দশকের শেষ নাগাদ অর্থাৎ ২০৩০ সাল পর্যন্ত সময়ে অতিরিক্ত তিন থেকে চার মিলিয়ন টন এলএনজি সক্ষমতা যুক্ত হতে পারে। এরপর পরবর্তী দশকে, অর্থাৎ ২০৪০ সাল নাগাদ এই সক্ষমতা বেড়ে সতেরো থেকে আঠারো মিলিয়ন টনে পৌঁছানোর সম্ভাবনার কথাও জানিয়েছেন তিনি। এ থেকে স্পষ্ট যে, সরকার এলএনজিকে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি কৌশলের একটি স্থায়ী অংশ হিসেবেই বিবেচনা করছে, স্বল্পমেয়াদি সমাধান হিসেবে নয়।
সরবরাহ ঝুঁকি কমাতে সংগ্রহ প্রক্রিয়াতেও বৈচিত্র্য আনার কথা জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী। সরকার-থেকে-সরকার চুক্তি, আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্র এবং সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি—এই তিন ধরনের পদ্ধতি একসঙ্গে ব্যবহার করে বিভিন্ন উৎস থেকে এলএনজি সংগ্রহের কৌশল নেওয়া হয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বা সরবরাহে হঠাৎ কোনো বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিলেও যেন দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা স্থিতিশীল থাকে।
আমদানির পাশাপাশি নিজস্ব ভূখণ্ডে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের উদ্যোগও জোরদার করছে সরকার। এই লক্ষ্যে সম্প্রতি ঘোষণা করা হয়েছে একটি নতুন সমুদ্রভিত্তিক বিডিং রাউন্ড, যেখানে অংশগ্রহণের জন্য আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আগামী নভেম্বরের শেষ পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে। বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে মুনাফা প্রত্যাবাসন, কর পরিশোধে সহযোগিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজস্ব কাঠামোর স্থিতিশীলতার মতো একাধিক সুবিধা রাখা হয়েছে এই বিডিং প্রক্রিয়ায়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সমুদ্র এলাকায় নতুন করে গ্যাসের মজুত পাওয়া গেলে তা দীর্ঘমেয়াদে আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষত বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে দাম ওঠানামার ঝুঁকি বিবেচনায় নিলে, নিজস্ব উৎস থেকে গ্যাস প্রাপ্তি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে অনেক বেশি সুসংহত করতে পারে।
সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, স্বল্প ও দীর্ঘ—দুই মেয়াদেই একটি সমন্বিত জ্বালানি কৌশল সাজানোর চেষ্টা করছে সরকার। একদিকে আমদানিনির্ভর অবকাঠামো সম্প্রসারণ, অন্যদিকে দেশীয় উৎস অনুসন্ধানে বিনিয়োগ আকর্ষণ—এই দ্বিমুখী প্রচেষ্টার মাধ্যমে আগামী দিনের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা মোকাবিলার প্রস্তুতি নিচ্ছে দেশ। তবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তা এবং বাস্তবায়নের সময়সীমা মেনে প্রকল্পগুলো শেষ করার সক্ষমতার ওপরই নির্ভর করবে এই পরিকল্পনার প্রকৃত সাফল্য।

