সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় পে স্কেল বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে এগিয়ে চলেছে। নতুন বেতন কাঠামোর প্রজ্ঞাপনের খসড়া ইতিমধ্যে আইনি যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে, আর এই প্রক্রিয়া শেষ হলেই আনুষ্ঠানিক গেজেট প্রকাশের পথ খুলে যাবে। উল্লেখযোগ্য দিক হলো, এবারের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় সম্পূর্ণ ডিজিটাল পদ্ধতিতে বেতন নির্ধারণের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে।
সরকারি সূত্র অনুযায়ী, মূল প্রজ্ঞাপন প্রকাশের পাশাপাশি সাতটি পৃথক প্রজ্ঞাপন বা এসআরও জারি করা হবে, যেগুলোর মাধ্যমে বিভিন্ন শ্রেণি ও প্রতিষ্ঠানের জন্য নতুন কাঠামো বাস্তবায়নের খুঁটিনাটি নির্দেশনা কার্যকর হবে। এই সাতটি ক্ষেত্র হলো বেসামরিক প্রশাসন, পুলিশ বিভাগ, সীমান্তরক্ষী বাহিনী, সরকারি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, স্বায়ত্তশাসিত ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান, সশস্ত্র বাহিনী এবং বিচার বিভাগ। প্রতিটি ক্ষেত্রের কাঠামোগত ভিন্নতা বিবেচনায় নিয়েই আলাদা আলাদা নির্দেশনা তৈরি করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যারের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় বেতন নির্ধারণ। এই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রতিটি কর্মকর্তা-কর্মচারীর তথ্য হালনাগাদ করা হলে সেই তথ্যের ভিত্তিতে নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয়ভাবেই বেতন নির্ধারিত হয়ে যাবে। ফলে কোন কর্মকর্তা কোন গ্রেডে কী পরিমাণ মূল বেতন পাবেন, তা অনলাইনেই যাচাই করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
এই প্রক্রিয়ায় প্রতিটি কর্মকর্তা-কর্মচারীর পদ, গ্রেড, চাকরিতে যোগদানের তারিখ, বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির হিসাব, পদোন্নতির তথ্য এবং উচ্চতর গ্রেড সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য সঠিকভাবে সিস্টেমে সংযুক্ত করতে হবে। এসব তথ্য যাচাই-বাছাই সম্পন্ন হওয়ার পরই সফটওয়্যার স্বয়ংক্রিয়ভাবে নতুন কাঠামো অনুযায়ী মূল বেতন ও প্রযোজ্য ভাতাসমূহ নির্ধারণ করে দেবে।
এই নতুন পদ্ধতির ফলে প্রচলিত কাগজভিত্তিক প্রক্রিয়ায় বারবার হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ে গিয়ে বেতন পুনর্নির্ধারণ করানোর প্রয়োজনীয়তা অনেকাংশে কমে আসবে। একই সঙ্গে চাকরিজীবীরা নিজেরাই অনলাইনে নিজেদের বেতন কাঠামোয় প্রকৃত অবস্থান এবং প্রাপ্য সুবিধা সম্পর্কে সরাসরি জানতে পারবেন। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, এই স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার ফলে হিসাবগত ভুলত্রুটি, একই সুবিধা একাধিকবার পাওয়ার মতো অনিয়ম এবং অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।
তবে নতুন এই কাঠামো কার্যকর হলেও বেতন বিল প্রক্রিয়াকরণ, ভবিষ্য তহবিল, সরকারি ঋণ, আয়কর হিসাব এবং ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে বেতন ও পেনশন প্রদানের বিদ্যমান ব্যবস্থাগুলো আগের মতোই একই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের আওতায় পরিচালিত হতে থাকবে।
নতুন এই জাতীয় পে স্কেলে বিদ্যমান বিশটি গ্রেডের কাঠামো অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী সর্বনিম্ন গ্রেডে মাসিক মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে বিশ হাজার টাকা, আর সর্বোচ্চ গ্রেডে এই অঙ্ক দাঁড়াবে এক লাখ ছাপ্পান্ন হাজার টাকায়।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, নতুন এই বেতন কাঠামো কার্যকর ধরা হচ্ছে চলতি বছরের জুলাই মাসের প্রথম দিন থেকে, যদিও এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে প্রজ্ঞাপন ও সংশ্লিষ্ট প্রজ্ঞাপনগুলো জারি হওয়ার পরই।
অর্থ বিভাগ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, মূল প্রজ্ঞাপন প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই যেন দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা যায়, সে লক্ষ্যে প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত দুই ধরনের প্রস্তুতিই এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীর কাঠামোগত ভিন্নতা বিবেচনায় নিয়ে পৃথক নির্দেশনা তৈরির কাজও একই সঙ্গে চলছে।
সামগ্রিকভাবে দেখা যায়, বেতন নির্ধারণ প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে নিয়ে আসার এই উদ্যোগ সরকারি প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে। তবে এই পদ্ধতির সফলতা নির্ভর করবে মূলত তথ্য হালনাগাদের নির্ভুলতা এবং সময়মতো তা সম্পন্ন করার সক্ষমতার ওপর। প্রায় ষোলো লাখেরও বেশি সরকারি চাকরিজীবীর তথ্য একযোগে হালনাগাদ ও যাচাই করার এই বিশাল কর্মযজ্ঞ কতটা মসৃণভাবে সম্পন্ন হয়, তার ওপরই নির্ভর করবে নতুন পে স্কেল সময়মতো ও নির্ভুলভাবে বাস্তবায়িত হবে কিনা।

