শব্দদূষণ ঠেকাতে সরকার যে কঠোর অবস্থান নিয়েছে, তার আঘাত এসে পড়েছে দেশের মোটরসাইকেল খাতে। শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০২৫-এ দুই বা তিন চাকার হালকা যানের হর্নের সর্বোচ্চ শব্দমাত্রা ৮৫ ডেসিবেল নির্ধারণ করা হয়েছে। এরপর গত ২৪ আগস্ট জারি করা আমদানি নীতি আদেশ (২০২৬–২৯) -এ নির্ধারিত সীমার বাইরের হর্নকে আমদানি নিষিদ্ধ পণ্যের তালিকায় রাখা হলে বন্দরে আটকে পড়তে শুরু করে মোটরসাইকেলের যন্ত্রাংশের চালান। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ অবস্থা চলতে থাকলে দেশের মোটরসাইকেল কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।
শব্দদূষণ দেশের শহরগুলোতে দীর্ঘদিনের বড় সমস্যা। বিশেষ করে মোটরযানের হর্ন, হাইড্রোলিক হর্ন আর হুটারের শব্দে জনজীবন অতিষ্ঠ। এই পরিস্থিতিতে ২০০৬ সালের পুরনো বিধিমালা বাতিল করে ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে নতুন বিধিমালা জারি করে সরকার। নতুন বিধিমালায় যানবাহনের ধরন অনুযায়ী হর্নের শব্দমাত্রা ঠিক করে দেওয়া হয়েছে। হালকা যানের জন্য ৮৫ ডেসিবেল, মাঝারি যানের জন্য ৯০ ডেসিবেল এবং ভারী যানের জন্য ১০০ ডেসিবেল নির্ধারণ করা হয়েছে। বিধিমালায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, নির্ধারিত মাত্রার বেশি শব্দ উৎপন্ন করে এমন হর্ন প্রস্তুত, আমদানি, মজুত, বিক্রয়, বিতরণ এমনকি বাণিজ্যিক পরিবহনও করা যাবে না।
নতুন বিধিমালা জারির প্রায় এক বছর পর গত ২৪ আগস্ট বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এসআরও নম্বর ৩০৮-আইন/২০২৬-এর মাধ্যমে জারি হয় আমদানি নীতি আদেশ ২০২৬-২০২৯। এই আদেশে শব্দদূষণ বিধিমালায় নির্ধারিত সীমার বাইরে থাকা হর্নকে সরাসরি আমদানি-নিষিদ্ধ পণ্যের তালিকায় যুক্ত করা হয়। এতে বিপাকে পড়েন মোটরসাইকেল আমদানিকারকরা। কারণ দেশে মোটরসাইকেল সংযোজন ও উৎপাদনে যন্ত্রাংশের বড় একটি অংশ আমদানি করতে হয়।
দেশে ১০টির মতো কোম্পানি মোটরসাইকেল সংযোজন ও উৎপাদন করে। যন্ত্রাংশের বেশির ভাগই আসে আমদানি করে। নতুন নিয়মে যন্ত্রাংশের চালান বন্দরে আটকে গেলে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশ হোন্ডা প্রাইভেট লিমিটেডের প্রধান বিপণন কর্মকর্তা শাহ মোহাম্মদ আশেকুর রহমান বলেন, ৮৫ ডেসিবেলের সীমাটি আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তিনি জানান, এই নতুন নিয়মের কারণেই মোটরসাইকেল আমদানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে মোটরসাইকেলের হর্ন সাধারণত ৯৩ থেকে ১১২ ডেসিবেলের মধ্যে হয়ে থাকে। ভারতে মোটরযানে হর্নের শব্দমাত্রা ৯৩ থেকে ১১২ ডেসিবেল, থাইল্যান্ডেও একই মান।অর্থাৎ বাংলাদেশে যে ৮৫ ডেসিবেলের সীমা ঠিক করা হয়েছে, তা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রচলিত মানের চেয়ে অনেক কম। ফলে যে হর্নগুলো আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী তৈরি, সেগুলোই বাংলাদেশে নিষিদ্ধ হয়ে পড়ছে।
এসিআই মোটরসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সুব্রত রঞ্জন দাস বলেন, জাপানের মতো উন্নত দেশ বুঝেশুনেই শব্দমাত্রা নির্ধারণ করেছে। বাংলাদেশের বাস্তবতা মেনে একটি গ্রহণযোগ্য মাত্রা ঠিক করা জরুরি। তিনি মনে করেন, দেশে শব্দদূষণের মূল সমস্যা হাইড্রোলিক হর্ন। মোটরসাইকেলে এ ধরনের হর্ন কম ব্যবহার করা হয়। তাই হাইড্রোলিক হর্ন বন্ধ করাই হওয়া উচিত, সব হর্নের ওপর একই সীমা চাপিয়ে দেওয়া নয়। তিনি আরও বলেন, কোনো শিল্পের ক্ষেত্রে নীতিমালা ঘন ঘন পরিবর্তন করা উচিত নয়। এতে বিনিয়োগকারীরা নিরুৎসাহিত হন।
পরিবেশ অধিদপ্তরের ঢাকা গবেষণাগারে ২০২২ সালের ১৬ মার্চ বিভিন্ন কোম্পানির ১৩টি মডেলের মোটরসাইকেলের হর্নের শব্দমাত্রা পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষায় সাত মিটার দূরত্বে হর্নের শব্দমাত্রা পাওয়া যায় সর্বনিম্ন ৮৪ দশমিক ৮ ও সর্বোচ্চ ৯৯ দশমিক ২ ডেসিবেল। আর শূন্য দশমিক ৫ মিটার দূরত্বে শব্দমাত্রা ছিল ১০১ দশমিক ১ থেকে ১১৬ ডেসিবেল।এই তথ্য বলছে, বাজারে থাকা বেশির ভাগ মোটরসাইকেলের হর্নই নতুন সীমার চেয়ে বেশি শব্দ উৎপন্ন করে। ফলে শুধু আমদানি নয়, বাজারে থাকা যানবাহনের হর্ন নিয়েও জটিলতা তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশ মোটরসাইকেল এসেম্বলার্স অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক বিপ্লব কুমার রায় পরিবেশমন্ত্রী আবদুল আওয়াল মিন্টুকে এক চিঠিতে জানিয়েছেন, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালায় নির্ধারিত মানমাত্রা পুনর্নির্ধারণ করা প্রয়োজন। তা না হলে বাংলাদেশে মোটরসাইকেলের যন্ত্রাংশ রপ্তানির ক্ষেত্রে আকস্মিক সমস্যা ও জটিল পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটবে। এখন দেখার বিষয়, সরকার শিল্পের বাস্তবতা ও পরিবেশের স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রেখে কেমন সমাধান দেয়। কারণ একটি দিক ঠিক রাখতে গিয়ে অন্যটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা কোনোভাবেই কাঙ্ক্ষিত হবে না।

