দীর্ঘ দুই বছরের বিরতির পর অবশেষে অনুষ্ঠিত হলো সরকারের সচিব সভা, যেখানে সরকারি দপ্তরগুলোতে কর্মীদের উপস্থিতি নিশ্চিতে ডিজিটাল হাজিরা চালুর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে প্রশাসনিক অনিয়ম ও দুর্নীতি রোধেও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে এই সভায়।
বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় সাত মাসের মাথায় মঙ্গলবার বিকেলে সচিবালয়ে এই সভা অনুষ্ঠিত হয়, যাতে সভাপতিত্ব করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব। প্রশাসনিক সূত্র জানিয়েছে, এর আগে সবশেষ সচিব সভা হয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকারের শুরুর দিকে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে। তারপর প্রায় দেড় বছর সময় পার হলেও কোনো সচিব সভা আয়োজন করা হয়নি। এতদিন পর এই সভা হওয়ায় প্রশাসনিক পর্যায়ে বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
সচিব সভা মূলত সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কার্যক্রম সমন্বয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম, যেখানে সচিবরা নীতিগত সিদ্ধান্ত, উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং প্রশাসনিক অগ্রাধিকারের বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করেন। এবারের সভার আলোচ্যসূচিতে প্রধানত চারটি বিষয় স্থান পায়—সরকারের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম পর্যালোচনা, ২০২৬ থেকে ২০৩০ সাল মেয়াদি জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র নিয়ে আলোচনা, প্রশাসনিক কার্যক্রমকে আরও গতিশীল ও কার্যকর করার উপায় খোঁজা, এবং জনগণের জন্য উপকারী এমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থাকলে তা নিয়ে আলোচনা।
জানা গেছে, চলমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের প্রসঙ্গটি এবারের সভায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-সংশ্লিষ্ট যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম আরও বাড়তে পারে—এই সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এই ঝুঁকি যাতে দেশের অর্থনীতি ও বিদ্যুৎ খাতে বড় ধাক্কা তৈরি না করে, সে লক্ষ্যে আমদানিনির্ভর জ্বালানির পাশাপাশি দেশীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে সভায়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সরকারের একজন সচিব জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব মোকাবিলায় কী পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে তা নিয়ে বিস্তারিত মতবিনিময় হয়েছে সভায়। এক্ষেত্রে বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার সম্প্রসারণের বিষয়টি, যা নিয়ে সবচেয়ে বেশি সময় ধরে কথা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ওই সচিবের বরাত অনুযায়ী, সভায় সরকারি চাকরিতে শূন্য পদ পূরণ, প্রশাসনিক কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করা, সরকারি ভবন-স্থাপনায় সৌর প্যানেল স্থাপন এবং বেসরকারি খাতকেও সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে উৎসাহিত করার বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনে সৌরশক্তির অংশ কীভাবে বাড়ানো যায়, সে বিষয়েও কথা হয়েছে। এর পাশাপাশি সরকারি অফিসে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ডিজিটাল হাজিরা পদ্ধতি নিশ্চিত করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনিক অনিয়ম ও দুর্নীতি প্রতিরোধ নিয়েও আলোচনা হয়েছে বিস্তারিতভাবে।
সভায় সরকারের অগ্রাধিকারমূলক কর্মসূচি, বিশেষ করে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ ও খাল খনন প্রকল্পের যথাযথ বাস্তবায়নের বিষয়েও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এই কর্মসূচিগুলোর অর্থ ব্যয় এবং উপকারভোগী নির্বাচন প্রক্রিয়ায় পূর্ণ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বজায় রাখতে সংশ্লিষ্ট সচিবদের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে দীর্ঘ বিরতির পর অনুষ্ঠিত এই সচিব সভা প্রশাসনিক জবাবদিহি জোরদার এবং জ্বালানি খাতে ঝুঁকি মোকাবিলার প্রস্তুতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

