মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস চর্চায় নতুন মাত্রা যোগ হতে যাচ্ছে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের লেখা নিবন্ধ ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি’ ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের নবম-দশম শ্রেণির ‘বাংলা সাহিত্য’ পাঠ্যপুস্তকে নতুন অধ্যায় হিসেবে যুক্ত হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে লেখা তার ঐতিহাসিক ডায়েরির একটি ছবিও। জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটি (এনসিসিসি) ইতোমধ্যে এ সংক্রান্ত চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে। গত ২৪ আগস্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এনসিসিসির সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই উদ্যোগের ফলে শিক্ষার্থীরা চট্টগ্রাম থেকে সশস্ত্র প্রতিরোধের সূচনা, কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা এবং সম্মুখসমরের আত্মত্যাগের চাক্ষুষ স্মৃতি সরাসরি পাঠ্যবই থেকে জানতে পারবে।
দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে পাল্টে এসেছে। অতীতে একপাক্ষিক ইতিহাস চর্চার অভিযোগ উঠেছে বিভিন্ন সময়ে। বর্তমান সরকার সেই ধারা থেকে বেরিয়ে এসে মুক্তিযুদ্ধে বিভিন্ন ব্যক্তির অবদান নিরপেক্ষভাবে পাঠ্যবইয়ে তুলে ধরার উদ্যোগ নিয়েছে। সেই উদ্যোগের অংশ হিসেবেই জিয়াউর রহমানের এই নিবন্ধটি অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। এনসিটিবির চেয়ারম্যান প্রফেসর মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা বলেছেন, ‘যার যতটুকু অবদান, তা নিরপেক্ষ ও নির্মোহভাবে পাঠ্যবইয়ে তুলে ধরতেই সরকার এ উদ্যোগ নিয়েছে।’ এই নিবন্ধটি নবম-দশম শ্রেণির ‘বাংলা সাহিত্য’ বইয়ের ২২ নম্বর গদ্য হিসেবে স্থান পাচ্ছে এবং এর সঙ্গে জিয়াউর রহমানের মুক্তিযুদ্ধকালীন ডায়েরির একটি ছবিও যুক্ত করা হচ্ছে।
‘স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি’ নিবন্ধে তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান তার সরাসরি অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়েছেন। ১৯৭১ সালের মার্চে চট্টগ্রাম থেকে সশস্ত্র প্রতিরোধের সূচনা, আগ্রাবাদের ব্যারিকেডের সামনে মেজর খালিকুজ্জামানের কাছ থেকে পাকিস্তানি বাহিনীর হামলার খবর পাওয়ার পর ‘উই রিভোল্ট’ উচ্চারণ এবং ষোলশহরে গিয়ে পাকিস্তানি অফিসারদের আটক করার নির্দেশনার কথা উঠে এসেছে এই নিবন্ধে। তিনি লিখেছেন, ২৬ মার্চ রাত ২টা ১৫ মিনিটে চট্টগ্রামে সশস্ত্র স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা হয়। পটিয়ার পাহাড়ে প্রথম মুক্তাঞ্চল গঠন এবং সেখানে প্রতিরোধ বাহিনী সংগঠনের ঘটনাও উঠে এসেছে নিবন্ধে। পাশাপাশি ২৭ মার্চ সন্ধ্যায় কালুরঘাট স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচারের স্মৃতিচারণও রয়েছে।
নিবন্ধটির আগে দেওয়া ব্যাখ্যায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধকে কোনো একক ব্যক্তি বা দলের কৃতিত্ব হিসেবে উপস্থাপন না করার কথা বলা হয়েছে। সেখানে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, মওলানা ভাসানী, শেখ মুজিবুর রহমান, জিয়াউর রহমান ও তাজউদ্দীন আহমদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। লেখক পরিচিতিতে জিয়াউর রহমানকে মহান স্বাধীনতার ঘোষক, সাবেক রাষ্ট্রপতি, সেনাপ্রধান, জেড ফোর্সের অধিনায়ক, ১ নম্বর সেক্টর কমান্ডার ও ‘বীর উত্তম’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এনসিটিবি জানিয়েছে, নিবন্ধটির মূল বর্ণনা শুরুর আগে কিছু ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে যেখানে ১৯৭২ সালে ‘দৈনিক বাংলা’য় প্রকাশিত ‘একটি জাতির জন্ম’ ও ১৯৮০ সালে ‘দৈনিক দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি’ নিবন্ধ দুটিকে মুক্তিযুদ্ধের এক অনন্য দলিল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
শিক্ষাবিদ ও বিশেষজ্ঞরা এই উদ্যোগকে মুক্তিযুদ্ধের বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস তুলে ধরার বড় মাইলফলক হিসেবে দেখছেন। বরেণ্য শিক্ষাবিদ ও জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেছেন, ‘জিয়াউর রহমানের লেখা এই নিবন্ধে ঐতিহাসিক মূল্য আছে। এর মাধ্যমে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা স্বাধীনতার সংগ্রাম সম্পর্কে সচেতন হতে পারবে। পাঠ্যবইয়ে এটি অন্তর্ভুক্ত করা যৌক্তিক।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক শাহ শামীম আহমেদ বলেছেন, ‘এই নিবন্ধ অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ ঘটনা জানার সুযোগ পাবে। অতীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে যেভাবে একপাক্ষিক ইতিহাস চর্চা করা হয়েছে, বর্তমান সরকারের নির্মোহ ও নিরপেক্ষ ইতিহাস তুলে ধরার দৃষ্টিভঙ্গি সেই মানসিকতার অবসান ঘটাবে।’
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক জানিয়েছেন, এনসিসিসি সভায় নিবন্ধটি সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এতে নতুন প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ও নির্মোহ ইতিহাস জানতে পারবে। এখন দেখার বিষয় হলো, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবই প্রণয়ন ও বিতরণ প্রক্রিয়ায় এই সিদ্ধান্ত কতটা সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়িত হয়। কারণ পাঠ্যবই শুধু জ্ঞানের বাহক নয়, এটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ইতিহাস ও মূল্যবোধ হস্তান্তরের প্রধান মাধ্যম। সেই বিবেচনায় ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি’ নিবন্ধটির অন্তর্ভুক্তি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস চর্চায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হয়ে থাকবে।

