বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প গত কয়েক বছরে দেশের অন্যতম সফল উৎপাদন খাত হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। স্থানীয় বাজারের বড় অংশের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি দেশের তৈরি ওষুধ এখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও রপ্তানি হচ্ছে। তবে এই শিল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত ওষুধের মূল কাঁচামাল বা সক্রিয় ফার্মাসিউটিক্যাল উপাদান উৎপাদন খাত এখনও নানা সমস্যার মধ্যে রয়েছে।
বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, দক্ষ প্রযুক্তিগত কর্মীর অভাব এবং বিদেশি কাঁচামালের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে দেশের এপিআই শিল্প প্রত্যাশিত গতিতে এগোতে পারছে না। প্রায় দুই দশক আগে যে লক্ষ্য নিয়ে দেশের একমাত্র এপিআই শিল্প পার্ক স্থাপন করা হয়েছিল, সেটিও এখনো পুরো সক্ষমতায় পৌঁছাতে পারেনি।
মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ায় স্থাপিত এপিআই শিল্প পার্কের উদ্দেশ্য ছিল দেশে ওষুধের কাঁচামাল উৎপাদন বাড়ানো এবং আমদানিনির্ভরতা কমানো। কিন্তু শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার চালু না হওয়া, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহের অভাব, উচ্চ পরিচালন ব্যয় এবং দক্ষ জনবলের সংকটের কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো বড় পরিসরে উৎপাদনে যেতে পারছে না।
তাদের মতে, এপিআই শিল্পকে বাণিজ্যিকভাবে সফল করতে হলে ২৪ ঘণ্টার নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ, স্থায়ী গ্যাস সংযোগ এবং প্রতিযোগিতামূলক দামে কাঁচামালের নিশ্চয়তা দিতে হবে।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন গজারিয়ায় ২০০ একর জমির ওপর এপিআই শিল্প পার্ক তৈরি করেছে। এখানে ৪২টি প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২৫টি শিল্প প্রতিষ্ঠানের জন্য। প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়েছিল ২০০৮ সালে এবং ২০২১ সালের জুনে তা সম্পন্ন হয়। পরিকল্পনা ছিল ২০২২ সালের শুরু থেকেই উৎপাদন কার্যক্রম শুরু হবে।
তবে বাস্তবে এখনো পার্কটির কার্যক্রম সীমিত পর্যায়ে রয়েছে। বর্তমানে চারটি প্রতিষ্ঠান সেখানে কার্যক্রম চালাচ্ছে। এগুলো হলো এসিআই ল্যাবরেটরিজ, ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি, হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস এবং ইউনিমেড ইউনিহেলথ ফাইন কেমিক্যালস।
এ ছাড়া বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস, ফার্মাটেক কেমিক্যালস এবং এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালস ২০২৬ সালে নকশা অনুমোদন পেয়েছে এবং উৎপাদন শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে বরাদ্দ দেওয়া অনেক প্লট এখনো ব্যবহার হয়নি। কিছু জায়গায় আগাছা জন্মেছে এবং পানি সরবরাহ ও ড্রেনেজ ব্যবস্থাও সমস্যার মুখে পড়ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
ইবনে সিনা এপিআই ইন্ডাস্ট্রির প্ল্যান্ট প্রধান মো. শামসুল আলম জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে পরীক্ষামূলক উৎপাদন চালালেও এখনো গ্যাস সংযোগ পায়নি। তিনি বলেন, এপিআই উৎপাদন মূলত রাসায়নিক বিক্রিয়াভিত্তিক হওয়ায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জেনারেটর ও ডিজেলের ওপর নির্ভর করে উৎপাদন চালালে খরচ অনেক বেড়ে যায় এবং উৎপাদন প্রক্রিয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
তিনি জানান, প্রতিষ্ঠানটি ২০২৩-২৪ সাল থেকে গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রম চালিয়ে আসছে এবং ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু করেছে। বর্তমানে কয়েকটি পণ্যের স্থায়িত্ব পরীক্ষা চলছে। পরীক্ষার ফলাফল সফল হলে চলতি বছর দুই থেকে তিনটি কম পরিমাণে প্রয়োজনীয় কিন্তু উচ্চমূল্যের এপিআই উৎপাদনের মাধ্যমে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে কাঁচামালের উচ্চমূল্য উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। ভারত ও চীন থেকে আমদানি করা উপাদানের ওপর নির্ভরতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তন সরাসরি দেশের উৎপাদন খাতে প্রভাব ফেলছে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার কার্যকর না হওয়াও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইবনে সিনা এ প্রকল্পে প্রায় ১০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। প্রতিষ্ঠানটি ১৫টি পণ্যের অনুমোদনের জন্য আবেদন করেছিল, যার মধ্যে সাতটির অনুমোদন পাওয়া গেছে। ভবিষ্যতে সোডিয়াম ভ্যালপ্রোয়েট, র্যাবিপ্রাজল, প্যান্টোপ্রাজল, লিনাগ্লিপটিন এবং অ্যাজিথ্রোমাইসিনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এপিআই উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।
শিল্প সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এসব পণ্যের দেশে বড় বাজার রয়েছে। স্থানীয় চাহিদা পূরণের পর ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাজারেও রপ্তানির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এদিকে এপিআই শিল্পের আরেকটি বড় সমস্যা হলো দক্ষ জনবলের অভাব। ইউনিমেড ইউনিহেলথ ফাইন কেমিক্যালসের পরিচালক এস এম মুরাদ হোসাইন জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠানটি পার্কে একটি ছোট গবেষণাগার স্থাপন করেছে এবং সেটি সম্প্রসারণের কাজ চলছে। তবে এখনো বড় পরিসরে উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হয়নি।
তিনি বলেন, এপিআই উৎপাদনের জন্য বিশেষ ধরনের প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশে এই খাতে দক্ষ কর্মীর সংখ্যা খুবই সীমিত। ফলে নতুন প্রকল্প চালু ও পরিচালনায় দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হচ্ছে।
তার মতে, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণেও কাঁচামাল সংগ্রহে সমস্যা তৈরি হচ্ছে। বিভিন্ন দেশে সংঘাত ও সরবরাহ ব্যবস্থার পরিবর্তনের কারণে কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের উৎপাদন কমে গেছে বা বন্ধ হয়েছে। এতে কাঁচামাল সংগ্রহ এবং উৎপাদন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়ছে।
বর্তমানে বাংলাদেশ ওষুধ শিল্পের কাঁচামালের ক্ষেত্রে এখনো ব্যাপকভাবে আমদানির ওপর নির্ভরশীল। দেশের জৈব ও অজৈব ক্ষুদ্র অণুর এপিআই চাহিদার প্রায় ৮৫ শতাংশ বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। এর জন্য বছরে প্রায় ১৫০ কোটি ডলার ব্যয় হয়।
বিশেষ করে ভারত ও চীনের ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা বেশি। শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পথে থাকায় দেশে এপিআই উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো আরও জরুরি হয়ে উঠেছে। কারণ ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়মের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতার গুরুত্ব আরও বাড়বে।
চ্যালেঞ্জ থাকলেও এপিআই শিল্প পার্ককে ঘিরে বড় সম্ভাবনা রয়েছে। প্রকল্পটিতে ইতোমধ্যে প্রায় ১,৬০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে। পুরোপুরি কার্যকর হলে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে আন্তর্জাতিক কোম্পানিকে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এই খাতকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করতে হলে শুধু ওষুধ উৎপাদন নয়, কাঁচামাল উৎপাদনেও সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
এপিআই শিল্পের উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন হবে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি, পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং কার্যকর নীতিগত সহায়তা। এসব সমস্যা সমাধান করা গেলে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প শুধু দেশীয় বাজার নয়, আন্তর্জাতিক বাজারেও আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে।

