সরকারি কেনাকাটা ও নির্মাণ কাজের দরপত্রে নতুন উদ্যোক্তা, স্টার্টআপ এবং দীর্ঘদিন সুযোগবঞ্চিত ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণ সহজ করতে বড় ধরনের আইনি সংস্কারে হাত দিয়েছে সরকার। বিদ্যমান পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইনে পরিবর্তন এনে দরপত্রে অংশ নেওয়ার জন্য পূর্ববর্তী কাজের অভিজ্ঞতা ও উচ্চ বার্ষিক টার্নওভারের যে কঠোর শর্ত এতদিন বাধ্যতামূলক ছিল, তা শিথিল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
গত রোববার প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই সংক্রান্ত একটি সংশোধনী অধ্যাদেশ নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে। বৈঠক-সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে জাতীয় সংসদের অধিবেশন চলমান না থাকায় এটি প্রাথমিকভাবে অধ্যাদেশ আকারেই জারি হবে, পরে আসন্ন কোনো অধিবেশনে তা পূর্ণাঙ্গ আইনে রূপান্তরিত হবে।
এই সংশোধনের ফলে নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য সরকারি কেনাকাটার টেন্ডারে অংশগ্রহণের পথ অনেকটাই সহজ হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট দুটি সরকারি সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা, যাঁরা এই সংশোধনী প্রস্তাবের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। তবে বিশেষায়িত ও জটিল প্রকৃতির কাজের ক্ষেত্রে আলাদা শর্ত আরোপের ক্ষমতা সরকারের হাতে থাকছে বলেও জানানো হয়েছে।
এমন উদ্যোগ নেওয়ার পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, বিদ্যমান পদ্ধতিতে বড় অঙ্কের টেন্ডারে অংশ নিতে হলে অতীত অভিজ্ঞতা ও বড় অঙ্কের বার্ষিক লেনদেনের প্রমাণ দিতে হয়। এই শর্তের কারণে গত দেড় দশকে যাঁরা সরকারি কাজ পেয়ে এসেছেন, মূলত তাঁরাই এখনো ‘অভিজ্ঞ’ হিসেবে অগ্রাধিকার পাচ্ছেন। এই বৃত্ত ভাঙতেই আইন সংশোধনের এই পদক্ষেপ বলে জানানো হয়েছে।
প্রস্তাবিত সংশোধনীতে আরও বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক দরপত্রে অংশ নিতে হলে বিদেশি ঠিকাদার বা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে বাধ্যতামূলকভাবে দেশীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ গঠন করতে হবে। পাশাপাশি অনিয়মের অভিযোগে কোনো প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করার আগে লিখিতভাবে কারণ দর্শানোর নোটিশ এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়ার বিধানও যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে, যা বর্তমান আইনে নেই।
সরকারের নীতিনির্ধারকদের ভাষ্য, এই সংশোধনী কার্যকর হলে সরকারি কেনাকাটায় দীর্ঘদিনের আলোচিত সিন্ডিকেট প্রথা ভাঙবে এবং স্বচ্ছতা ও সুস্থ প্রতিযোগিতা বাড়বে। তবে একই সঙ্গে একটি সমালোচনাও উঠেছে—বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের সহজে সরকারি কাজ পাইয়ে দিতেই এই সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ।
এ বিষয়ে দেশের একটি প্রভাবশালী দুর্নীতিবিরোধী সংস্থার নির্বাহী প্রধান মন্তব্য করেছেন, কোনো নতুন দরদাতার যদি সংশ্লিষ্ট খাতে প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা থাকে এবং তিনি নির্ধারিত কারিগরি শর্ত পূরণ করতে পারেন, তাহলে এই সংশোধনী ইতিবাচক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে তাঁর সতর্কবার্তা হলো, পর্যাপ্ত জ্ঞান বা অভিজ্ঞতা ছাড়াই রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী কোনো পক্ষকে অন্যায্য সুবিধা দেওয়ার ঝুঁকিও একই সঙ্গে থেকে যায়।
বিশেষ পরিস্থিতিতে ক্রয়কারী সংস্থাকে বাড়তি শর্ত আরোপের যে সুযোগ প্রস্তাবিত আইনে রাখা হয়েছে, সে বিষয়েও সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, এতে একই ধরনের পক্ষপাতিত্বের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি তিনি এ-ও উল্লেখ করেন, সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা দীর্ঘদিন ধরে এই আইন সংশোধনের সুপারিশ করে এলেও তাঁদের সঙ্গে কোনো প্রকার আলোচনা ছাড়াই একতরফাভাবে তড়িঘড়ি করে সংশোধনী আনা হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে, যা তাঁর কাছে হতাশাজনক এবং পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েই প্রশ্ন তোলে।
এদিকে মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় আরও বেশি প্রতিযোগিতা তৈরি এবং দেশীয় শিল্পের স্বার্থ সুরক্ষার লক্ষ্যেই এই সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, উন্মুক্ত দরপত্র প্রক্রিয়া আধুনিকীকরণ এবং টেকসই ক্রয় ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যেই আন্তর্জাতিকভাবে প্রচলিত রেটেড ক্রাইটেরিয়া পদ্ধতির অনুরূপ অনুপাতভিত্তিক মূল্যায়ন পদ্ধতি প্রবর্তন করা হচ্ছে।

