দেশের কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতকে আধুনিক, উৎপাদনশীল ও বাণিজ্যিকভাবে টিকে থাকার মতো সক্ষম করে তুলতে প্রায় চব্বিশ হাজার ছয়শ কোটি টাকা বা প্রায় দুই বিলিয়ন ডলারের একটি বিশাল কর্মসূচি হাতে নিচ্ছে সরকার। দশ বছর মেয়াদে তিনটি ধাপে এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। দেশের কৃষি খাতের ইতিহাসে এত বড় পরিসরের কোনো কর্মসূচি এর আগে নেওয়া হয়নি।
এই ব্যয়ের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বহন করবে সরকার নিজে, বাকি অর্থের জোগান দেবে বিশ্বব্যাংক। কৃষক, বাজার, অর্থায়ন, প্রযুক্তি ও ব্যবসাকে একটি সমন্বিত কাঠামোয় নিয়ে এসে উৎপাদনশীলতা ও কৃষকের আয় বাড়ানো, বাজারসংযোগ জোরদার করা এবং প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়নে কৃষকের প্রবেশাধিকার বাড়ানোই এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য। কৃষি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, বাণিজ্য ও খাদ্য খাতের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে এতে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিটি পর্যায় চার বছরের মেয়াদে চলবে এবং আগের ধাপের অভিজ্ঞতা ও প্রস্তুতির ভিত্তিতে পরের ধাপ এগিয়ে যাবে। “বাংলাদেশ অ্যাগ্রিকানেক্ট প্রোগ্রাম” নামের এই কর্মসূচি ২০২৭ থেকে ২০৩৭ সাল—এই দশ বছরে তিন ধাপে বাস্তবায়ন করবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।
কর্মসূচির আওতায় কৃষকদের উৎপাদন ও বাজারের সঙ্গে সংযুক্ত করতে গঠন করা হবে উৎপাদনশীল গ্রুপ বা পিজি। দেশের চৌষট্টি জেলার আড়াইশ উপজেলায় বাণিজ্যিক সম্ভাবনাময় ফসলভিত্তিক ক্লাস্টারে এই কার্যক্রম চলবে। প্রতিটি ইউনিয়নে তিনটি করে এমন গ্রুপ গঠিত হবে, যার প্রতিটিতে প্রায় ত্রিশজন কৃষক থাকবেন এবং তাদের অন্তত দশ শতাংশ হবেন নারী কৃষক। পাঁচ সদস্যের একটি নির্বাহী কমিটির মাধ্যমে এই গ্রুপগুলো পরিচালিত হবে। কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তি, কৃষি উপকরণ, বাজার ও আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে চার প্রধান ক্ষেত্রে—খামারে উন্নত কর্মসংস্থান, খামারের বাইরের মূল্যশৃঙ্খলে কর্মসংস্থান, কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগে সরাসরি কর্মসংস্থান, এবং কৃষি লজিস্টিক অবকাঠামো পরিচালনার কর্মসংস্থান। এসব ক্ষেত্রে যুব ও নারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে পরিকল্পনায়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ও সেবাদানকারীদের প্রাতিষ্ঠানিক ও কারিগরি সক্ষমতা বাড়াতে ইন্টারনেট অব থিংস, বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল ব্যবস্থা এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দেওয়া হবে। এর পাশাপাশি উত্তম কৃষি পদ্ধতির সনদায়ন, দক্ষ সেচ ব্যবস্থা, কৃষি তথ্য ব্যবস্থা, ই-সম্প্রসারণ, ভৌগোলিক তথ্য ব্যবস্থা এবং কৃষক স্মার্টকার্ড ব্যবস্থা নিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
উৎপাদন বাড়াতে উত্তম কৃষি পদ্ধতি, সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু-সহনশীল কৃষি, দক্ষ সেচ, মাটি ব্যবস্থাপনা, উন্নত জাত, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারিত করা হবে। ক্লাস্টারভিত্তিক উৎপাদন পরিকল্পনার মাধ্যমে ফসল ক্যালেন্ডার, উপকরণের চাহিদা, পণ্যের মান ও বাজারচাহিদার সমন্বয় করা হবে, এবং কৃষকদের যৌথ উৎপাদন, সংগ্রহ, গ্রেডিং, প্যাকেজিং ও বিপণনে সহায়তা দেওয়া হবে। এর পাশাপাশি উত্তম কৃষি পদ্ধতির সনদ, মান নিশ্চয়তা এবং পণ্যের উৎস শনাক্তকরণ ব্যবস্থাও থাকবে এই কর্মসূচির আওতায়। ঝুঁকি কমানোর লক্ষ্যে কৃষি বীমার বাজার উন্নয়নের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখাও প্রস্তুত করা হবে।
সামগ্রিকভাবে এই কর্মসূচির আওতায় কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে প্রায় তিন লাখ ষাট হাজার নতুন ও উন্নত কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য ধরা হয়েছে, যেখানে যুব, নারী ও স্থানীয় উদ্যোক্তাদের বিভিন্ন কৃষিসেবা কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করে নতুন ব্যবসার সুযোগ তৈরি করা হবে।
কর্মসূচির তিনটি ধাপের কাঠামোয় প্রথম ধাপে জোর দেওয়া হবে উৎপাদনশীল গ্রুপ গঠন, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বাজার সংযোগ স্থাপনের ওপর, যাতে রপ্তানিকারক ও বেসরকারি ক্রেতাদের সঙ্গে কৃষকদের একটি বাণিজ্যিক জোট গড়ে ওঠে। দ্বিতীয় ধাপে জোর দেওয়া হবে কৃষকদের ডিজিটাল প্রোফাইল, স্মার্টকার্ড এবং কৃষি অর্থায়ন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের ওপর, যাতে কৃষকরা চলতি মূলধন ও বিনিয়োগ ঋণের সুযোগ পান। আর তৃতীয় ধাপে বিদ্যমান কিছু কেন্দ্রকে কৃষিপণ্য সংগ্রহ, প্যাক হাউস এবং ফসল-পরবর্তী ব্যবস্থাপনা কেন্দ্রে রূপান্তরিত করে আধুনিক কোল্ড-চেইন ও লজিস্টিকস ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে, যাতে উচ্চমূল্যের ও দ্রুত পচনশীল কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ও পরিবহন সহজ হয়।
কর্মসূচির বাস্তবায়ন দায়িত্বে থাকা একজন উপপরিচালক জানিয়েছেন, প্রায় দুই বিলিয়ন ডলারের এই কর্মসূচির আওতায় কৃষকদের প্রশিক্ষণ থেকে শুরু করে সব ধরনের সেবা থাকবে, এবং এতে চারটি মন্ত্রণালয়কে যুক্ত করা হচ্ছে। তার মতে, এই কর্মসূচি সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়িত হলে তিন লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, কৃষি খাতে এত বিশাল অঙ্কের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ সফল হলে তা দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, রপ্তানি সক্ষমতা এবং গ্রামীণ কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, তবে এত বড় ও বহু-মন্ত্রণালয়ভিত্তিক একটি প্রকল্প সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

