দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো ধাপে ধাপে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় চালু করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বাংলাদেশ জুটমিলস কর্পোরেশনের (বিজেএমসি) অধীন এসব মিল আবার উৎপাদনে ফিরলে কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও শিল্পোৎপাদন বাড়বে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। পাশাপাশি অব্যবহৃত সম্পদেরও কাজে লাগানো সম্ভব হবে।
এ পর্যন্ত ইজারা দেওয়া ১৭টি পাটকলের মধ্যে ৯টিতে উৎপাদন শুরু হয়েছে। এতে প্রায় ৯ হাজার ৫০০ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। পুরো উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের কাজের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
সরকার বলছে, নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কর্মসংস্থান বাড়ানো, বিনিয়োগ টানা এবং অব্যবহৃত সম্পদের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতেই এই উদ্যোগ। এর অংশ হিসেবে আরও তিনটি পাটকল বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। মিলগুলো হলো চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের এমএম জুটমিল, রাঙ্গুনিয়ার কেএফডি লিমিটেড এবং নরসিংদীর পলাশের কো-অপারেটিভ জুটমিল।
বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, সম্প্রতি দুটি কোম্পানির সঙ্গে আরও তিনটি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের ইজারা চুক্তি হয়েছে। প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ পেয়েছে সিরাজগঞ্জের জাতীয় জুট মিলস লিমিটেড ও খুলনার স্টার জুট মিলস লিমিটেড। হ্যামকো গ্রুপ পেয়েছে খুলনার প্লাটিনাম জুবিলী জুট মিলস লিমিটেড।
চুক্তি অনুযায়ী, তিনটি মিল চালু হলে কমপক্ষে ১১ হাজার ৬২৯ জনের কর্মসংস্থান হবে। বিনিয়োগ আসবে প্রায় ৬১৯ কোটি টাকা। বার্ষিক মোট আয় হতে পারে প্রায় ১ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা।
মিলভিত্তিক পরিকল্পনা এ রকম: সিরাজগঞ্জের রায়পুরের জাতীয় জুট মিলসে প্রায় ১৫৭ কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা আছে। চালু হলে ৫ হাজার ২৩৮ জনের কাজের সুযোগ হবে। বার্ষিক মোট আয় হতে পারে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা।
খুলনার দিঘলিয়ার স্টার জুট মিলসে বিনিয়োগ হবে প্রায় ২৫০ কোটি টাকা। এখানেও ৫ হাজার ২৩৮ জনের কর্মসংস্থান হবে বলে জানানো হয়েছে। বছরে মোট আয়ের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৫০০ কোটি টাকা।
খুলনার খালিশপুরের প্লাটিনাম জুবিলী জুট মিলসে প্রায় ২১২ কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা আছে। চালু হলে কমপক্ষে ১ হাজার ১৫৩ জনের কর্মসংস্থান হবে। সম্ভাব্য বার্ষিক মোট আয় প্রায় ১৭৫ কোটি টাকা।
বিজেএমসির মুখ্য পরিচালন কর্মকর্তা মো. মামুনুর রশিদ জানান, সংস্থাটির মালিকানায় বর্তমানে ২৫টি পাটকল রয়েছে। ধারাবাহিক লোকসান এবং বেসরকারি খাতের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় না পারায় মিলগুলো বন্ধ করে বেসরকারি খাতে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
তিনি বলেন, ২৫টির মধ্যে ২০টি বেসরকারি খাতে ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১৭টির কার্যক্রম শেষ, বাকি তিনটির প্রক্রিয়া চলছে। অবশিষ্ট পাঁচটির মধ্যে দুটি বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়ায় আছে। মিল দুটি ঢাকার ডেমরার করিম জুট মিলস লিমিটেড ও লতিফ বাওয়ানী জুট মিলস লিমিটেড। এখানে অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
মামুনুর রশিদ আরও জানান, চট্টগ্রামের বিডিসিএফ বাগদাদ-ঢাকা কার্পেট ফ্যাক্টরি লিমিটেড এবং খুলনার আলিম জুটমিলস লিমিটেড নিয়ে মামলা চলছে। সীতাকুণ্ডের আমিন জুটমিলস ফেরত পাওয়া গেছে। ইজারা গ্রহীতা প্রতিষ্ঠান আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে সেখানে উৎপাদন শুরু করতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম বলেন, ২০২০ সালে তৎকালীন সরকার বিজেএমসির পাটকলগুলো বন্ধ করে দেয়। চলতি বছর বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বন্ধ মিলগুলো বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় চালুর উদ্যোগ নেয়। তাঁর ভাষ্য, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অর্থনীতিকে গতিশীল করা ও অব্যবহৃত সম্পদের সঠিক ব্যবহারই এর লক্ষ্য।
তিনি জানান, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) মাধ্যমে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে স্বচ্ছ দরপত্রে মিলগুলো ইজারা দেওয়া হচ্ছে। পরিবেশবান্ধব পাটের ব্যবহার বাড়াতে বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করা হচ্ছে। পাট ও পাটজাত পণ্যে বিনিয়োগ বাড়াতে ঋণ সুবিধাসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এতে পাটের ব্যবহার বাড়বে, কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর পলিথিন ও প্লাস্টিকের ব্যবহার কমবে।
পাটের ব্যবহার বাড়াতে জুট ডাইভার্সিফিকেশন প্রমোশন সেন্টার (জেডিপিসি) কাজ করছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। সরকারি প্রণোদনার পাশাপাশি দেশ-বিদেশে পাটপণ্যের প্রদর্শনী, হস্তশিল্পীদের প্রশিক্ষণ এবং বিদেশে বাংলাদেশ মিশনের মাধ্যমে বাজার সম্প্রসারণে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
২০২০ সালের ১ জুলাই ধারাবাহিক লোকসান ও প্রতিযোগিতায় টিকতে না পারায় বিজেএমসির অধীন ২৫টি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধ করা হয়। তখন প্রায় ২৫ হাজার স্থায়ী শ্রমিককে গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের মাধ্যমে পাওনা মিটিয়ে দেওয়া হয়। পরে মিলগুলো ৫ থেকে ২০ বছরের দীর্ঘমেয়াদে বেসরকারি খাতে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
সংশ্লিষ্টদের আশা, উদ্যোগটি পুরোপুরি বাস্তবায়ন হলে শিল্প খাতে গতি ফিরবে, কর্মসংস্থান বাড়বে এবং পরিবেশবান্ধব পাটশিল্পে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে। তবে এসব কর্মসংস্থান ও আয়ের অঙ্ক এখনো পরিকল্পনা ও প্রত্যাশার ভিত্তিতে ধরা। মিলগুলো কত দ্রুত ও কতটা সক্ষমতায় চালু হয়, তার ওপরই নির্ভর করবে বাস্তব ফল।

