ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সম্ভাব্য ঢাকা সফর নিয়ে ভারতীয় হাইকমিশনারের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। আজ মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। একই সঙ্গে দুই দেশের সম্পর্কে কিছু চ্যালেঞ্জ আছে বলেও স্বীকার করেছেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, সেগুলো সংলাপের মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা চলছে।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এ ধরনের কোনো আলাপ হয়নি। বৈঠকটি পুরোপুরি সৌজন্যমূলক ছিল। তবে তিনি এ-ও বলেন, সফর নিয়ে কিছু আলোচনা হয়েছে এবং এ বিষয়ে তাঁরা ইতিবাচক। প্রতিমন্ত্রী জানান, নতুন দায়িত্ব পাওয়ার পর হাইকমিশনারের সঙ্গে এটাই তাঁর প্রথম সাক্ষাৎ।
বৈঠকের পরিবেশ নিয়ে তিনি বলেন, আলোচনা খুব ভালো, আন্তরিক ও ফলপ্রসূ হয়েছে। কিছু চ্যালেঞ্জ অবশ্যই আছে, তবে সংলাপ ও আলোচনার মাধ্যমে সেগুলো মোকাবিলা করা হবে। ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি ইতিবাচক।
বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় নানা বিষয়ের পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ইস্যুও উঠে আসে। এর মধ্যে ছিল নিউইয়র্কে সদ্য শেষ হওয়া ৮১তম জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের প্রসঙ্গ। প্রতিমন্ত্রী পারস্পরিক স্বার্থ ও জনগণের কল্যাণে ভারতের সঙ্গে ভবিষ্যৎমুখী এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাপূর্ণ উপায়ে কাজ করার বিষয়ে বাংলাদেশের অঙ্গীকারের কথাও বৈঠকে তুলে ধরেন।
প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে সবচেয়ে নজরকাড়া বিষয় একটি আপাত অসংগতি। এক বাক্যে তিনি বলেছেন, দোভালের সফর নিয়ে আলাপ হয়নি। কিছুক্ষণ পরই বলেছেন, সফর নিয়ে কিছু আলোচনা হয়েছে এবং তাঁরা ইতিবাচক। দুটি কথা একসঙ্গে সত্য হতে পারে, যদি দ্বিতীয় বাক্যে তিনি নির্দিষ্ট সফর নয়, সাধারণভাবে দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের সফর বিনিময়ের কথা বুঝিয়ে থাকেন। কিন্তু প্রতিবেদনে সে ব্যাখ্যা নেই। ফলে দোভালের সফর কি আদৌ পরিকল্পনায় আছে, কে প্রস্তাব দিয়েছে বা কবে হতে পারে, এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর মেলেনি। এই অস্পষ্টতা কূটনৈতিক ভাষার সাধারণ বৈশিষ্ট্যও হতে পারে। সংবেদনশীল বিষয়ে সরাসরি হ্যাঁ বা না না বলে ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়ে রাখা কূটনীতিতে প্রচলিত কৌশল। তবে সিদ্ধান্তে যাওয়ার মতো তথ্য এখানে নেই।
সাংবাদিকদের এই প্রশ্ন তোলার পেছনেও একটি প্রেক্ষাপট আছে। প্রশ্নটি এসেছে, তার মানে সফরের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা বা জল্পনা কোথাও না কোথাও চলছে। প্রতিবেদনে সেই জল্পনার উৎস বা বিস্তারিত বলা হয়নি। তাই এ নিয়ে কিছু নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে একজন প্রতিমন্ত্রীর প্রথম সৌজন্য সাক্ষাতের পরপরই এমন প্রশ্ন ওঠা দেখায়, দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ নিয়ে জনমনে ও গণমাধ্যমে আগ্রহ আছে।
কূটনীতির দৃষ্টিতে সৌজন্য সাক্ষাৎ সাধারণত সম্পর্কের সুর বেঁধে দেওয়ার সুযোগ। এখানে সুরটি নরম ও সমঝোতামূলক। প্রতিমন্ত্রী ‘আন্তরিক ও ফলপ্রসূ’ বলেছেন, ‘ভবিষ্যৎমুখী’ ও ‘পারস্পরিক শ্রদ্ধাপূর্ণ’ সম্পর্কের কথা বলেছেন এবং চ্যালেঞ্জ আছে স্বীকার করেও সমাধান খুঁজতে সংলাপের ওপর জোর দিয়েছেন। শব্দচয়নে বোঝা যায়, বাংলাদেশ সম্পর্কের উত্তেজনা কমিয়ে আলোচনার পথে থাকতে চাইছে। ‘পারস্পরিক শ্রদ্ধা’ কথাটিও লক্ষণীয়। এটি অনেক সময় সমতাভিত্তিক সম্পর্কের প্রত্যাশা বোঝাতে ব্যবহার হয়, তবে প্রতিমন্ত্রী এই শব্দ কী প্রেক্ষাপটে ব্যবহার করেছেন, প্রতিবেদনে তা স্পষ্ট নয়।
সবচেয়ে বড় ফাঁক হলো চ্যালেঞ্জগুলো কী, তা বলা হয়নি। প্রতিমন্ত্রী শুধু বলেছেন, কিছু চ্যালেঞ্জ আছে। কোন বিষয়গুলো এর মধ্যে পড়ে, সেগুলো আলোচনায় উঠেছে কি না, প্রতিবেদনে তার উল্লেখ নেই। তবে গত কয়েক দিনের খবরে দুই দেশের বাণিজ্যিক টানাপোড়েনের একটি উদাহরণ এসেছে। ২৪ সেপ্টেম্বর ভারত বাংলাদেশি পাটপণ্যে টনপ্রতি সর্বোচ্চ ৪৪৫ ডলার অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক ঘোষণা করেছে। এ বিষয়টি আজকের বৈঠকে উঠেছিল কি না, তা প্রতিবেদন থেকে জানা যায় না। উদাহরণটি শুধু বোঝাতে দেওয়া যে বাণিজ্য, সীমান্ত ও অন্যান্য ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে আলোচনার বিষয়ের অভাব নেই।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের প্রসঙ্গ তোলাও তাৎপর্যপূর্ণ। বৈঠকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে দুই দেশের অবস্থান ও যোগাযোগ নিয়ে কথা হয়ে থাকতে পারে। তবে কোন বিষয়ে কী আলোচনা হয়েছে, সে বিবরণ প্রতিবেদনে দেওয়া হয়নি। তাই এ থেকে কোনো নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত টানা যাবে না।
আরেকটি লক্ষণীয় দিক বৈঠকের ধরন। এটি সৌজন্য সাক্ষাৎ, আনুষ্ঠানিক আলোচনা নয়। সৌজন্য সাক্ষাতে সাধারণত কোনো চুক্তি বা সিদ্ধান্ত হয় না। এতে পরিচিত হওয়া, সম্পর্কের দিকনির্দেশ ঠিক করা এবং ভবিষ্যৎ আলোচনার ভিত্তি তৈরির সুযোগ থাকে। তাই এই বৈঠক থেকে বড় কোনো ফলাফল আশা করা যুক্তিসংগত নয়। বরং এটি কতটা সহায়ক পরিবেশ তৈরি করল এবং পরবর্তী ধাপে কী আসে, সেটিই বিবেচ্য।
ভারতের পক্ষ থেকে বৈঠক নিয়ে কোনো বিবৃতি বা প্রতিক্রিয়া প্রতিবেদনে আসেনি। এখানে শুধু বাংলাদেশের প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য আছে। ফলে বৈঠকের আলোচনার পুরো চিত্র একপক্ষীয় সূত্রে পাওয়া। কূটনৈতিক বৈঠকের বিবরণে দুই পক্ষের ব্যাখ্যায় পার্থক্য থাকা অস্বাভাবিক নয়।
সব মিলিয়ে বার্তাটি এমন: সম্পর্কে চ্যালেঞ্জ আছে, কিন্তু আলোচনার দরজা খোলা এবং সুর ইতিবাচক। দোভালের সফর হবে কি না, তা নিয়ে এখনো পরিষ্কার কিছু বলা হয়নি। সামনে তিনটি বিষয় নজরে রাখা দরকার। প্রথমত, উচ্চপর্যায়ের সফর নিয়ে সরকারি পর্যায় থেকে সুনির্দিষ্ট ঘোষণা আসে কি না। দ্বিতীয়ত, প্রতিমন্ত্রী যে চ্যালেঞ্জের কথা বলেছেন, সেগুলো নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনার কোনো সূচি ঠিক হয় কি না। তৃতীয়ত, ভারতের পক্ষ থেকে বৈঠক নিয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া আসে কি না। এই তিনটির উত্তরেই বোঝা যাবে, আজকের সৌজন্য সাক্ষাৎ কেবল আনুষ্ঠানিকতা ছিল, নাকি সম্পর্কের পরবর্তী ধাপের সূচনা।

