সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নতুন জাতীয় বেতনকাঠামোর আওতায় প্রায় তিন মাসের বকেয়া বেতন একসঙ্গে পেতে যাচ্ছেন। তবে কে কত টাকা পাবেন, তা নির্ভর করছে নতুন বেতন নির্ধারণ বা ‘পে ফিক্সেশন’ প্রক্রিয়ার ফলাফলের ওপর। এই কাজ শুরু হচ্ছে আগামীকাল সোমবার থেকে। আগামী ২০ অক্টোবরের মধ্যে তা শেষ করতে নির্দেশ দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ। বিভাগের সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
এগারো বছর পর সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছে গত ১৯ সেপ্টেম্বর। এখন সেই কাঠামো অনুযায়ী প্রত্যেকের বেতন নতুন করে নির্ধারণ করার পালা। কাজটি সহজ নয়। প্রতিটি কর্মচারীর চাকরির ইতিহাস, পদোন্নতি ও আগের বেতন নির্ধারণের তথ্য মিলিয়ে দেখতে হবে। ফলে প্রক্রিয়াটি একই সঙ্গে প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, বেতন নির্ধারণ শেষ হলে নতুন মূল বেতনের ভিত্তিতে বেতন বিল তৈরি হবে। একই সঙ্গে চূড়ান্ত হবে বকেয়া পাওনার হিসাব। অর্থ বিভাগের সূত্র বলছে, তিন মাসের বকেয়া সরকার একসঙ্গে পরিশোধ করবে। তবে সবার বকেয়া সমান হবে না। গ্রেড, বর্তমান মূল বেতন, নতুন কাঠামোয় নির্ধারিত বেতন এবং বেতন কার্যকরের তারিখ, এই চার বিষয়ের ওপর বকেয়ার অঙ্ক নির্ভর করবে।
নতুন বেতন নির্ধারণ হবে আইবাস প্লাস প্লাসের পে ফিক্সেশন মডিউলে। চাকরিজীবীদের এই পোর্টালে ঢুকে নিজের চাকরিসংক্রান্ত তথ্য দিতে হবে। প্রথমে দিতে হবে ব্যক্তিগত পরিচয়, যার মধ্যে রয়েছে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য, জন্মতারিখ, বর্তমান পদ ও গ্রেড, চাকরিতে যোগদানের তারিখ এবং বর্তমান মূল বেতন। আগের বেতন নির্ধারণের তথ্যও মিলিয়ে দেখতে হবে।
কারও পদোন্নতি, বদলি, টাইম স্কেল, সিলেকশন গ্রেড বা উচ্চতর গ্রেড হয়ে থাকলে সেসব তথ্যও জানাতে হবে। এসবের পক্ষে অফিস আদেশ ও প্রয়োজনীয় নথি হাতে রাখতে হবে। বিশেষ করে নাম, এনআইডি, জন্মতারিখ, পদবি, গ্রেড ও বেতনসংক্রান্ত তথ্য ভালোভাবে যাচাই করা জরুরি। ভুল বা অসম্পূর্ণ তথ্য থাকলে পুরো প্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি হতে পারে।
এই প্রক্রিয়ায় আইবাস প্লাস প্লাসে নিবন্ধিত মুঠোফোন নম্বর লাগবে। কারও এনআইডি না থাকলে চাকরির নথিতে থাকা জন্মতারিখ ও অন্যান্য তথ্য হালনাগাদ করে আবেদন করতে হবে।
চাকরিজীবী অনলাইনে তথ্য জমা দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ কার্যালয় তা যাচাই করবে। তথ্য ও নথির মধ্যে অসংগতি পাওয়া গেলে সংশোধন করতে হতে পারে। অর্থাৎ শুধু অনলাইনে ফরম পূরণ করলেই কাজ শেষ হচ্ছে না। আগের চাকরির ইতিহাস ও বেতন নির্ধারণের তথ্যের সঙ্গে নতুন তথ্যের মিল থাকা বাধ্যতামূলক। অনলাইনে তথ্য দিতে সমস্যা হলে সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার সহায়তা নেওয়ার সুযোগ থাকছে।
প্রক্রিয়াটি সুষ্ঠুভাবে শেষ করতে হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের অনলাইন প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। অর্থ বিভাগের ‘সেবা দেওয়া সক্ষম করতে সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা শক্তিশালীকরণ কর্মসূচি’ (এসপিএফএমএস)-এর আওতায় আইবাস প্লাস প্লাস এই প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। প্রধান হিসাব ও অর্থ কর্মকর্তা, বিভাগীয় হিসাব নিয়ন্ত্রক, জেলা হিসাব ও অর্থ কর্মকর্তা এবং উপজেলা হিসাব কর্মকর্তার কার্যালয়ের সংশ্লিষ্টরা এতে অংশ নিচ্ছেন।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, নতুন কাঠামোয় সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ নির্ধারিত বেতন এক লাখ ৫৬ হাজার টাকা। বেতন-ভাতা দেওয়া হবে ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছরে, ধাপে ধাপে।
ধাপগুলো এ রকম: প্রথম ধাপ চলবে ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত। এ সময় নতুন ও পুরোনো মূল বেতনের পার্থক্যের ৪০ শতাংশ দেওয়া হবে। দ্বিতীয় ধাপ ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত। তখন পার্থক্যের ৭০ শতাংশ মিলবে। তৃতীয় ধাপ শুরু হবে ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে। তখন থেকে পুরো নতুন মূল বেতন কার্যকর হবে। আর ভাতা কার্যকর হবে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে।
হিসাবের ভিত্তি ধরা হয়েছে ২০২৬ সালের ৩০ জুন তারিখে থাকা মূল বেতনকে। অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরে দুই দফায় মূল বেতনের ৭০ শতাংশ দেওয়ার জন্য ৩৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
টাইম স্কেল ও উচ্চতর গ্রেড নিয়ে জটিলতা: নতুন আদেশ অনুযায়ী, কোনো স্থায়ী কর্মচারী পদোন্নতি ছাড়া একই পদে আট বছর পূর্ণ করলে এবং চাকরি সন্তোষজনক হলে পরবর্তী উচ্চতর গ্রেড পাবেন। প্রথম উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার পর একই পদে আরও ছয় বছর চাকরি করলে দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেডের সুযোগ আছে।
তবে অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, আগের কাঠামোয় টাইম স্কেল, সিলেকশন গ্রেড বা উচ্চতর গ্রেড পাওয়া কর্মচারীদের ক্ষেত্রে নতুন কাঠামোর হিসাব নিয়ে জটিলতা রয়েছে। এসব সমাধানের কাজ চলছে।
আদেশের বিধান অনুযায়ী, আগের কাঠামোয় একই পদে দুই বা তার বেশি সিলেকশন গ্রেড, টাইম স্কেল বা উচ্চতর গ্রেড পেয়ে থাকলে নতুন কাঠামোয় ওই পদে আর উচ্চতর গ্রেড মিলবে না। অন্যদিকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত একই পদে মাত্র একটি উচ্চতর স্কেল বা গ্রেড পাওয়া থাকলে পরবর্তী ছয় বছর পূর্ণ হওয়ার পর দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ থাকছে।
অর্থ বিভাগের সূত্রগুলো জানায়, ৫ থেকে ২০ অক্টোবরের বেতন নির্ধারণে বর্তমান বেতনের পাশাপাশি আগের পদোন্নতি, উচ্চতর গ্রেড ও বেতন নির্ধারণের ইতিহাসও সঠিকভাবে যাচাই করতে হবে। এসব তথ্য নির্ভুল থাকলেই নতুন বেতন ও বকেয়ার হিসাব ঠিকভাবে করা যাবে।
প্রথমত, বকেয়ার অঙ্ক সবার জন্য এক নয়। কেউ বেশি, কেউ কম পাবেন। তাই নিজের গ্রেড, মূল বেতন ও কার্যকরের তারিখ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রাখা জরুরি। অন্যের পাওনার সঙ্গে নিজের পাওনা মিলিয়ে হতাশ হওয়ার আগে হিসাবের এই ভিন্নতা মনে রাখা দরকার।
দ্বিতীয়ত, সময় খুব বেশি নয়। পাঁচ অক্টোবর থেকে ২০ অক্টোবর, অর্থাৎ মাত্র ১৬ দিনের মধ্যে লাখ লাখ কর্মচারীর তথ্য প্রক্রিয়া করতে হবে। সার্ভারের চাপ, তথ্য মেলাতে দেরি বা নথির ঘাটতির কারণে কিছু ক্ষেত্রে সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। যাঁরা আগেভাগে নথি গুছিয়ে রাখবেন, তাঁরা তুলনামূলক কম ঝামেলায় থাকবেন।
তৃতীয়ত, যাঁদের টাইম স্কেল, সিলেকশন গ্রেড বা উচ্চতর গ্রেডের ইতিহাস আছে, তাঁদের ক্ষেত্রেই জটিলতা সবচেয়ে বেশি। অর্থ বিভাগ নিজেই স্বীকার করেছে, এই হিসাব নিয়ে কিছু অস্পষ্টতা রয়েছে। ফলে এই শ্রেণির কর্মচারীদের চূড়ান্ত বেতন ও বকেয়া নির্ধারণে বাড়তি সময় লাগতে পারে। এ বিষয়ে অর্থ বিভাগের স্পষ্ট নির্দেশনা এলে বিভ্রান্তি কমবে।
চতুর্থত, অক্টোবরের বেতনের সঙ্গে বকেয়া পাওয়ার বিষয়টি নির্ভর করছে এই প্রক্রিয়া সময়মতো শেষ হওয়ার ওপর। তাই এটি শুধু কর্মচারীদের দায়িত্ব নয়। হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের যাচাই-বাছাইয়ের গতি ও নির্ভুলতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
পঞ্চমত, ধাপে ধাপে বেতন বাড়ানোর সিদ্ধান্তে সরকারের ব্যয়ের চাপ ভাগ করার প্রচেষ্টা স্পষ্ট। চলতি অর্থবছরে ৩৭ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ এর একটি ইঙ্গিত। তবে ২০২৭ সালের জুলাই থেকে পুরো বেতন ও ২০২৮ সালের জানুয়ারি থেকে ভাতা কার্যকর হলে সরকারের বাজেটে চাপ আরও বাড়বে। এর সঙ্গে বাজারে মূল্যস্ফীতির প্রভাব মিলিয়ে কর্মচারীদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কতটা বাড়বে, তা সময়ই বলবে।
নতুন বেতনকাঠামো সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর একটি বড় অগ্রগতি। কিন্তু বকেয়া হাতে পাওয়া পর্যন্ত প্রক্রিয়াটির প্রতিটি ধাপ নির্ভুলভাবে সম্পন্ন করা জরুরি। তথ্য ঠিক রাখা, নথি প্রস্তুত রাখা এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবেদন সম্পন্ন করা, এই তিনটি বিষয়ে মনোযোগ দিলেই কর্মচারীরা অক্টোবরের বেতনের সঙ্গে বকেয়া পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়াতে পারবেন।

