দেশের অভ্যন্তরীণ আকাশপথে যাত্রী চলাচলের চিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। উন্নত সড়ক যোগাযোগ, তুলনামূলক কম ভাড়া এবং যাতায়াতের বিকল্প বাড়ায় অনেক যাত্রী এখন বিমানের বদলে সড়কপথ বেছে নিচ্ছেন। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে বরিশাল, যশোর, রাজশাহীর শাহ মখদুম এবং সৈয়দপুর বিমানবন্দরে।
গত অন্তত দুই বছর ধরে এই চার বিমানবন্দরে যাত্রীসংখ্যা ক্রমাগত কমছে। তবে দেশের সব বিমানবন্দরের পরিস্থিতি এক নয়। ঢাকার হযরত শাহজালাল, চট্টগ্রামের শাহ আমানত, সিলেটের ওসমানী এবং কক্সবাজার বিমানবন্দরে আগের পতনের পর গত অর্থবছরে যাত্রী চলাচলে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর চিত্র দেখা গেছে।
চার বিমানবন্দরের মধ্যে সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে যশোরে। এরপরই রয়েছে বরিশাল। এই দুই গন্তব্যের ক্ষেত্রে যাত্রী কমে যাওয়ার সঙ্গে পদ্মা সেতুর প্রভাব সরাসরি সম্পর্কিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
২০২২ সালের জুনে পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে ঢাকার সড়ক যোগাযোগে বড় পরিবর্তন আসে। যাত্রার সময় কমে যায়, সরাসরি বাস চলাচল সহজ হয় এবং অনেক যাত্রী তুলনামূলক কম খরচে গন্তব্যে পৌঁছানোর সুযোগ পান। এর ফলে যশোর ও বরিশালের মতো গন্তব্যে বিমানের প্রয়োজনীয়তা অনেক যাত্রীর কাছে আগের তুলনায় কমেছে।
২০২২-২৩ অর্থবছরে যশোর বিমানবন্দর দিয়ে প্রায় ২ লাখ ২১ হাজার যাত্রী যাতায়াত করেছিলেন। মাত্র দুই বছর পর সেই সংখ্যা নেমে আসে ৯২ হাজার ২০০-এর সামান্য বেশি পর্যায়ে।
আরও উদ্বেগজনক চিত্র দেখা যায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মে সময়কালে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ওই সময়ে যশোর বিমানবন্দর দিয়ে প্রায় ৪৪ হাজার যাত্রী চলাচল করেন। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এটি প্রায় অর্ধেক।
এ তথ্য থেকে বোঝা যায়, যশোরে যাত্রী হ্রাস সাময়িক কোনো পরিবর্তন নয়; বরং কয়েক বছর ধরে একটি ধারাবাহিক প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
বরিশালের অবস্থাও প্রায় একই রকম। ২০২২-২৩ অর্থবছরে বরিশাল বিমানবন্দর দিয়ে প্রায় ৫৮ হাজার যাত্রী যাতায়াত করেছিলেন। দুই বছর পর সেই সংখ্যা অর্ধেকেরও নিচে নেমে যায়।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত বরিশালে যাত্রীসংখ্যা আরও বড় হারে কমেছে। ওই সময়ে মাত্র ৮ হাজার ৭০০ যাত্রী বিমানবন্দরটি ব্যবহার করেন। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় পতনের হার ৬৫ শতাংশ।
এই পরিসংখ্যান বরিশাল রুটের ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন তুলছে। কারণ কোনো রুটে যাত্রীসংখ্যা ধারাবাহিকভাবে খুব নিচে নেমে গেলে বিমান সংস্থাগুলোর জন্য সেখানে নিয়মিত উড়োজাহাজ পরিচালনা অর্থনৈতিকভাবে কঠিন হয়ে পড়ে।
রাজশাহীর শাহ মখদুম বিমানবন্দরে যাত্রী কমেছে, তবে যশোর ও বরিশালের মতো তীব্র হারে নয়। দুই বছর আগে এই বিমানবন্দর দিয়ে বছরে দেড় লাখের বেশি যাত্রী যাতায়াত করেছিলেন।
গত অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত সেখানে যাত্রীসংখ্যা নেমে আসে ৮২ হাজার ২০০-তে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এই পতন প্রায় ৩০ শতাংশ।
উত্তরাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ সৈয়দপুর বিমানবন্দরেও যাত্রী কমেছে। গত অর্থবছরের জুলাই থেকে মে সময়কালে বিমানবন্দরটি দিয়ে ৩ লাখের বেশি যাত্রী যাতায়াত করেন। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এই সংখ্যা ১৯ শতাংশ কম।
তবে সৈয়দপুরের পরিস্থিতি বরিশাল বা যশোরের মতো সংকটজনক নয়। উত্তরাঞ্চলের বহু জেলার যাত্রী এখনও সৈয়দপুর বিমানবন্দর ব্যবহার করেন। তা সত্ত্বেও সড়ক যোগাযোগের উন্নয়ন এই রুটেও বিমানের ওপর চাপ তৈরি করছে।
বিমান সংস্থাগুলোর মতে, অভ্যন্তরীণ যাত্রী কমে যাওয়ার পেছনে দুটি কারণ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একটি হলো বিমানভাড়া, অন্যটি উন্নত সড়ক যোগাযোগ।
বেসরকারি বিমান সংস্থা এয়ার অ্যাস্ট্রার প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা মেজ-বাহ-উল ইসলাম জানিয়েছেন, উন্নত সড়ক যোগাযোগের পাশাপাশি তুলনামূলক বেশি বিমানভাড়াও যাত্রী কমার অন্যতম কারণ।
তাঁর মতে, কয়েকটি রুট কার্যত অচল হওয়ার পর্যায়ে চলে গেছে। বরিশাল রুটে যাত্রী এতটাই কম যে সেখানে নিয়মিত কার্যক্রম প্রায় বন্ধের মতো অবস্থায় রয়েছে। যশোর একসময় দেশের গুরুত্বপূর্ণ অভ্যন্তরীণ বিমান গন্তব্যগুলোর একটি হলেও এখন সেখানে দিনে মাত্র এক বা দুটি উড়ান পরিচালিত হচ্ছে।
তিনি জানিয়েছেন, যশোর রুটে একসময় উড়োজাহাজের ব্যবহার সক্ষমতা প্রায় শতভাগ থাকলেও এখন তা প্রায় ১০ শতাংশের কাছাকাছি নেমে এসেছে।
এর অর্থ হচ্ছে, শুধু যাত্রী কমেনি, যাত্রী কমার কারণে পুরো রুটের বাণিজ্যিক কার্যকারিতাও দুর্বল হয়েছে। একটি উড়োজাহাজে পর্যাপ্ত আসন পূরণ না হলে বিমান সংস্থার পরিচালন ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়ে। তখন সংস্থাগুলো স্বাভাবিকভাবেই উড়ানের সংখ্যা কমিয়ে দেয়। উড়ান কমে গেলে যাত্রীদের জন্য সময়সূচির সুবিধাও কমে যায়, যা আবার নতুন করে যাত্রী হ্রাসের কারণ হতে পারে।
সৈয়দপুর রুটেও একই ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। উত্তরাঞ্চলে সড়ক যোগাযোগ আগের তুলনায় উন্নত হওয়ায় কিছু যাত্রী আকাশপথ ছেড়ে সড়কপথে যাচ্ছেন।
তবে সামগ্রিক বিমান চলাচলের চিত্র ভিন্ন। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত দেশের বিমানবন্দরগুলো দিয়ে ১ কোটি ৫৮ লাখের বেশি যাত্রী চলাচল করেছেন।
এই বিপুল যাত্রীর তিন-চতুর্থাংশের বেশি ব্যবহার করেছেন ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। এরপর চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অংশ ছিল ৯ শতাংশ। এর পরের অবস্থানে রয়েছে কক্সবাজার বিমানবন্দর।
এ থেকে স্পষ্ট, দেশের সামগ্রিক বিমানযাত্রী কমে যায়নি; বরং যাত্রী চলাচলের ভৌগোলিক ধরন বদলাচ্ছে। কিছু অভ্যন্তরীণ রুট দুর্বল হচ্ছে, আবার পর্যটন ও আন্তর্জাতিক সংযোগনির্ভর কিছু বিমানবন্দরে চাহিদা বাড়ছে।
ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের জনসংযোগ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মো. কামরুল ইসলাম জানিয়েছেন, চট্টগ্রাম রুটে যাত্রীসংখ্যা প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে। অন্যদিকে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বর্তমানে সিলেটে একটি অতিরিক্ত উড়ান পরিচালনা করছে প্রতিষ্ঠানটি।
তবে সৈয়দপুরে যাত্রী কমায় সেখানে উড়ানের সংখ্যা এবং আসন সক্ষমতা দুটোই কমানো হয়েছে।
রাজশাহী রুটেও কিছুদিন অনিশ্চয়তা ছিল। ইউএস-বাংলা প্রায় দেড় মাস এই রুটে উড়ান বন্ধ রেখেছিল। পরে আবার কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। বর্তমানে সপ্তাহে ছয়টি উড়ান পরিচালিত হচ্ছে।
এই চিত্র দেখায় যে অভ্যন্তরীণ বিমান চলাচলে একক কোনো প্রবণতা নেই। প্রতিটি রুটের বাস্তবতা আলাদা এবং যাত্রী চাহিদার ওপর ভিত্তি করে বিমান সংস্থাগুলো তাদের পরিকল্পনা পরিবর্তন করছে।
কক্সবাজারে উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। পর্যটনকেন্দ্রিক চাহিদা বেশি থাকায় সেখানে উড়ানের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। শুধু ইউএস-বাংলা নয়, এয়ার অ্যাস্ট্রাও কক্সবাজার রুটে উড়ান বাড়িয়েছে।
এর ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ বিমান বাজারে একটি নতুন বিভাজন তৈরি হচ্ছে। যেসব গন্তব্য সড়কপথে দ্রুত ও কম খরচে পৌঁছানো যাচ্ছে, সেখানে বিমানযাত্রী কমছে। আর যেসব গন্তব্যে পর্যটন, দূরত্ব অথবা সময় সাশ্রয়ের প্রয়োজন বেশি, সেখানে আকাশপথের চাহিদা তুলনামূলক শক্তিশালী থাকছে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় ছোট আকারের উড়োজাহাজ যুক্ত করার বিষয়ও বিবেচনা করছে ইউএস-বাংলা। অভ্যন্তরীণ গন্তব্যে যাত্রীসংখ্যা কম থাকলেও ছোট উড়োজাহাজ ব্যবহার করলে কম আসন নিয়েও একটি রুট অর্থনৈতিকভাবে পরিচালনা করা তুলনামূলক সহজ হতে পারে।
অন্যদিকে বিমানভাড়া কম রাখার চেষ্টা করছে বিমান সংস্থাগুলো। এয়ার অ্যাস্ট্রার মেজ-বাহ-উল ইসলাম জানিয়েছেন, উড়োজাহাজের জ্বালানির দাম বর্তমানে ১৬৫ থেকে ১৬৬ ডলারের মধ্যে রয়েছে। তা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানগুলো যাত্রী ধরে রাখতে ভাড়া না বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
কক্সবাজার রুটে সর্বোচ্চ ভাড়া আগে ৬ হাজার ৩০০ টাকা ছিল। সেটি এখন কমিয়ে ৪ হাজার ৩০০ টাকায় আনা হয়েছে।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো কোনো ক্ষেত্রে লোকসান মেনেও ভাড়া কম রাখা হচ্ছে, যাতে যাত্রীরা আকাশপথ থেকে পুরোপুরি সরে না যান এবং যাত্রীসংখ্যা আবার বাড়ানো যায়।
তবে বিমান সংস্থাগুলোর সামনে এখানে একটি কঠিন সমীকরণ রয়েছে। জ্বালানি ও পরিচালন ব্যয় বেশি হলে ভাড়া কমিয়ে রাখা দীর্ঘমেয়াদে কঠিন। আবার ভাড়া বেশি হলে যাত্রীরা বাস বা অন্য সড়ক পরিবহনের দিকে চলে যেতে পারেন। ফলে অভ্যন্তরীণ আকাশপথের ভবিষ্যৎ শুধু বিমান সংস্থার সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে না; সড়ক অবকাঠামো, ভ্রমণের সময়, জ্বালানির মূল্য এবং যাত্রীদের ব্যয়ের সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিশেষ করে পদ্মা সেতু চালুর পর যশোর ও বরিশালের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, বড় অবকাঠামো প্রকল্প শুধু সড়ক পরিবহন ব্যবস্থাকেই বদলায় না, অন্য পরিবহন খাতেও সরাসরি প্রভাব ফেলে।
সড়ক যোগাযোগ যত উন্নত হবে, স্বল্প ও মাঝারি দূরত্বের অভ্যন্তরীণ আকাশপথকে তত বেশি প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হতে পারে। ফলে ভবিষ্যতে ছোট উড়োজাহাজ, নমনীয় সময়সূচি, কম ভাড়া এবং বিশেষ যাত্রীসেবা হয়তো এসব রুট টিকিয়ে রাখার গুরুত্বপূর্ণ উপায় হয়ে উঠবে।
৬ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত পাওয়া তথ্য বলছে, দেশের চারটি অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরে যাত্রী হ্রাস এখন স্পষ্ট বাস্তবতা। তবে একই সঙ্গে কক্সবাজার, সিলেট ও কিছু গুরুত্বপূর্ণ রুটের চাহিদা দেখাচ্ছে যে অভ্যন্তরীণ আকাশপথের বাজার হারিয়ে যাচ্ছে না; বরং তা নতুনভাবে পুনর্বিন্যাস হচ্ছে।
সড়ক ও আকাশপথের এই প্রতিযোগিতায় শেষ পর্যন্ত যাত্রীরাই নির্ধারণ করবেন কোন রুট টিকে থাকবে এবং কোন রুটকে নতুন কৌশলে পরিচালনা করতে হবে।

