মুঠোফোনের রিচার্জ করা ব্যালান্স বা ডেটা শেষ হয়ে গেলে গ্রাহকেরা এখন সর্বোচ্চ ২০০ টাকা পর্যন্ত জরুরি ব্যালান্স নিতে পারেন। দেশের মোবাইল অপারেটরগুলো এই সীমা বাড়িয়ে ৫০০ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে। প্রস্তাবে ২০০ থেকে ৫০০ টাকার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১০ টাকা সেবা ফি এবং তার ওপর কর যুক্ত হবে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) সর্বশেষ কমিশন সভায় বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। তবে এই সুবিধা গ্রাহকের প্রয়োজন মেটাচ্ছে, নাকি ছোট অঙ্কের ঋণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, সে প্রশ্নও উঠেছে।
বিটিআরসির নথি অনুযায়ী, এখন ২০০ টাকা পর্যন্ত জরুরি ব্যালান্স নিলে সেবা ফি ২ টাকা, করসহ ২ টাকা ৭৮ পয়সা। এই সুবিধা দেয় গ্রামীণফোন, রবি ও বাংলালিংক। রাষ্ট্রীয় অপারেটর টেলিটক দিতে পারে সর্বোচ্চ ৫০ টাকা, যার জন্য করসহ ফি ৬ টাকা ৯৫ পয়সা। চার অপারেটরের মোট গ্রাহক ১৯ কোটির বেশি। অপারেটর সূত্র বলছে, প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩৫ লাখ গ্রাহক এই সুবিধা নেন।
সীমা বাড়ানোর পক্ষে অপারেটরদের মূল যুক্তি, বেশি দামের প্যাকেজ কেনার সুযোগ। রবির প্রধান করপোরেট ও রেগুলেটরি কর্মকর্তা সাহেদ আলম বলেন, অনেক সময় গ্রাহকের হাতে থাকা জরুরি ব্যালান্সে প্রয়োজনীয় প্যাকেজ কেনা যায় না। যেমন, কোনো প্যাকেজের দাম ৩১০ টাকা হলে সর্বোচ্চ ২০০ টাকার ব্যালান্সে তা কেনা সম্ভব নয়। সীমা ৫০০ টাকা হলে গ্রাহক নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী বড় প্যাকেজ কিনতে পারবেন।
সুবিধাটির শুরুটা ছিল অন্য রকম। ২০১৯ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি বিটিআরসি নির্দেশ দিয়েছিল, গ্রাহকদের অন্তত ১০ টাকা জরুরি ব্যালান্স দিতে হবে এবং এর জন্য কোনো চার্জ নেওয়া যাবে না। ওই বছরের ২ জুলাই অপারেটরদের সঙ্গে সভায় ঠিক হয়, ১০ টাকা পর্যন্ত ব্যালান্স চার্জমুক্ত থাকবে, এর বেশি হলে চার্জ নেওয়া যাবে। অপারেটরেরা বলছে, এখন এই সুবিধা শুধু টাকা ধার দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর আওতায় মিনিট লোন, ডেটা লোন, ‘বাই নাও পে লেটার’ ও প্যাক কেনার সুবিধাও যুক্ত হয়েছে। গ্রাহক আগে সেবা ব্যবহার করেন, পরে টাকা শোধ করেন। পরের রিচার্জ থেকে বকেয়া ও প্রযোজ্য ফি কেটে নেওয়া হয়। অর্থাৎ জরুরি ব্যালান্সের সঙ্গে ছোট অঙ্কের ঋণের চরিত্রও যুক্ত হয়েছে।
আরেকটি তথ্যও প্রশ্ন বাড়িয়েছে। অপারেটর সূত্র জানিয়েছে, এই ঋণ মূলত অপারেটরেরা নিজে দেয় না। দেয় তাদের সঙ্গে অংশীদারত্বে থাকা অনুমোদিত আর্থিক প্রতিষ্ঠান। তাই সীমা বাড়ানো কতটা গ্রাহকসেবা আর কতটা ঋণ ব্যবসা, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।
সীমা বাড়ানোর উদ্যোগ প্রথম নেয় গ্রামীণফোন। ২০২৬ সালের ৩ মার্চ বিটিআরসিকে চিঠি দিয়ে তারা সর্বোচ্চ ২ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যালান্স দেওয়ার অনুমতি চায়। এর জন্য সর্বোচ্চ ২০ টাকা ফি রাখার প্রস্তাবও ছিল। গ্রামীণফোনের চিফ করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার তানভীর মোহাম্মদ বলেন, ডেটা ব্যবহার ও ডিজিটাল সেবার চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। স্মার্টফোন ব্যবহারকারী ও বেশি ব্যবহারকারী গ্রাহকদের জন্য বর্তমান সীমা অনেক ক্ষেত্রেই পর্যাপ্ত নয়। উচ্চতর সীমা তাঁদের ব্যবহারধারার সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।
অন্য অপারেটরেরা এই প্রস্তাবে আপত্তি জানায়। ২১ জুন বিটিআরসির সঙ্গে সভায় তারা বলে, এতে প্রতিযোগিতায় অসমতা তৈরি হতে পারে এবং অনাদায়ি অর্থের পরিমাণ বাড়তে পারে। এরপর সব অপারেটরের জন্য অভিন্ন প্রস্তাব তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয় মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন অ্যামটবকে।
গত ২৩ জুলাই অ্যামটব ৫০০ টাকা পর্যন্ত জরুরি ব্যালান্সের প্রস্তাব দেয়। তাতে ১০ টাকা পর্যন্ত ফি-মুক্ত, ১০ থেকে ২০০ টাকায় ২ টাকা এবং ২০০ থেকে ৫০০ টাকায় সর্বোচ্চ ১৫ টাকা ফি রাখার কথা বলা হয়। পরে ২০ আগস্ট বিটিআরসি ও অ্যামটবের সভায় ২০০ থেকে ৫০০ টাকার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১০ টাকা ফি রাখার সিদ্ধান্ত হয়। অ্যামটব সূত্র জানায়, গ্রামীণফোন, রবি ও টেলিটক এতে সম্মত। তবে বাংলালিংক ব্যালান্সের অঙ্ক অনুযায়ী ধাপে ধাপে ফি নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছে। তাদের প্রস্তাবে ১১ থেকে ২০ টাকায় ২ টাকা, ২১ থেকে ৫০ টাকায় ৩ টাকা এবং ১৫১ থেকে ২০০ টাকায় ৬ টাকা ফি রাখার কথা আছে। ৪০১ থেকে ৫০০ টাকার ক্ষেত্রে ফি হবে ১০ টাকা।
এই ধাপভিত্তিক কাঠামো কার্যকর হলে সাধারণ গ্রাহকের খরচ বাড়তে পারে। কারণ, এখন ২০০ টাকা পর্যন্ত যেকোনো অঙ্কে ফি ২ টাকা। বাংলালিংকের প্রস্তাবে ২০০ টাকার কম ব্যালান্স নিতেও বেশি ফি দিতে হতে পারে। ২০০ থেকে ৫০০ টাকার জন্য বর্তমান হারে কর যোগ হলে করসহ ফি দাঁড়াতে পারে ১৩ টাকা ৯০ পয়সা।
বিশ্লেষকেরা সীমা বাড়ানোর যুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেন বলেন, এভাবে চললে ‘জরুরি’ শব্দটির অর্থই বদলে যাবে। তাঁর মতে, অপারেটরদের মনোযোগ অর্থলগ্নির দিকে না দিয়ে সেবার মান, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও গ্রাহকদের অভিযোগ নিষ্পত্তির দিকে হওয়া উচিত। এত বড় জরুরি ব্যালান্সের বদলে কলরেট কমানোর উদ্যোগ নেওয়াই ভালো বলে মনে করেন তিনি।
পুরো চিত্র থেকে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়। প্রথমত, ১০ টাকার চার্জমুক্ত জরুরি সহায়তা হিসেবে যে সুবিধার যাত্রা, তা এখন কার্যত ছোট ঋণ পণ্যে রূপ নিয়েছে। দ্বিতীয়ত, ৫০০ টাকার সীমায় অপারেটরদের মধ্যে মোটামুটি ঐকমত্য থাকলেও ফি কাঠামো নিয়ে এখনো মতভেদ রয়েছে। তৃতীয়ত, বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়া সহজ হলে গ্রাহকের ঋণনির্ভরতা বাড়তে পারে। প্রতিবার রিচার্জ থেকে বকেয়া কাটা গেলে সীমিত আয়ের গ্রাহকের হাতে থাকা টাকা আরও কমে যায়। তাই অনুমোদনের আগে বিটিআরসির উচিত ফি, কর ও অনাদায়ি অর্থের দায় কার, তা স্পষ্ট করা এবং গ্রাহকস্বার্থ সুরক্ষার শর্ত নির্ধারণ করা। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বিটিআরসির হাতে। কমিশন কবে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে, তা এখনো জানা যায়নি।

