বাংলাদেশে ডায়াবেটিস, ফ্যাটি লিভার, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের মতো অসংক্রামক রোগ দ্রুত বাড়ছে। এর সঙ্গে বদলাচ্ছে মানুষের খাদ্যাভ্যাসও। স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ায় অনেকেই চা, মিষ্টি ও অন্যান্য খাবারে চিনি কমিয়ে দিচ্ছেন। একই সময়ে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিও চিনির ব্যবহার কমার পেছনে ভূমিকা রাখছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের হিসাবে, ২০২১-২২ বিপণন মৌসুমে বাংলাদেশে চিনির ব্যবহার ছিল ২৭ লাখ ৬৭ হাজার টন। ২০২৫-২৬ মৌসুমে তা কমে ১৮ লাখ ৬৩ হাজার টনে নামতে পারে। অর্থাৎ পাঁচ বছরের ব্যবধানে চিনির ব্যবহার কমেছে প্রায় ৩৩ শতাংশ।
প্রধান চিনি ব্যবহারকারী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে এই পতনের হার উল্লেখযোগ্য। বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু দাম বেড়ে যাওয়াই নয়, স্বাস্থ্যসচেতনতার পরিবর্তনও এই প্রবণতার বড় কারণ হয়ে উঠেছে।
দেশে ডায়াবেটিসের বিস্তার উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ সালে বাংলাদেশে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ছিল ৮৪ লাখ। ২০২৪ সালে তা বেড়ে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ ১৩ বছরে রোগীর সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৬৫ শতাংশ।
বর্তমানে ২০ থেকে ৭৯ বছর বয়সী প্রাপ্তবয়স্কদের ১৩ দশমিক ২ শতাংশ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, আক্রান্তদের ৩৯ দশমিক ১ শতাংশ জানেনই না যে তাদের ডায়াবেটিস রয়েছে। সংখ্যায় এই জনগোষ্ঠী প্রায় ৫৪ লাখ ২৬ হাজার।
চিকিৎসকদের হিসাবে, দেশে প্রায় ২০ হাজার শিশুও ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। আগে যেসব রোগ প্রধানত মধ্যবয়সী ও বয়স্ক মানুষের মধ্যে দেখা যেত, এখন সেগুলো তুলনামূলক কম বয়সীদের মধ্যেও দেখা যাচ্ছে।
ডায়াবেটিসের পাশাপাশি উচ্চ রক্তচাপও দ্রুত বাড়ছে। ২০১৭-১৮ সালের বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপের প্রাথমিক ফলাফল অনুযায়ী, ৩৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের প্রায় ৪০ শতাংশ উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত ছিলেন। ২০১১ সালে এই হার ছিল ২৬ শতাংশ।
নারীদের মধ্যে সমস্যাটি আরও বেশি। ২০১৭-১৮ সালের জরিপে ৩৫ বছর বা তার বেশি বয়সী নারীদের ৪৫ শতাংশ এবং পুরুষদের ৩৪ শতাংশের উচ্চ রক্তচাপ ছিল। ২০১১ সালে নারীদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল ৩২ শতাংশ এবং পুরুষদের ১৯ শতাংশ।
এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৪০ সালের মধ্যে দেশে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৪ কোটি ৬০ লাখে পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
উচ্চ রক্তচাপ হৃদরোগ ও স্ট্রোকের অন্যতম বড় ঝুঁকির কারণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে হৃদরোগজনিত অসুস্থতায় ২ লাখ ৮৩ হাজার ৮০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এর ৫২ শতাংশ মৃত্যুর সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপের সম্পর্ক রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এমএস জহিরুল হক চৌধুরীর মতে, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ ও স্ট্রোকের সঙ্গে স্থূলতার সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ। অতিরিক্ত চিনি ও পরিশোধিত শর্করা গ্রহণ শরীরে অতিরিক্ত চর্বি জমা এবং ওজন বৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
তার মতে, এসব রোগের ঝুঁকি কমাতে শুধু চিনি নয়, অতিরিক্ত লবণ ও প্রক্রিয়াজাত খাবারও কমাতে হবে। একই সঙ্গে নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি।
বাংলাদেশে খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন এখন দৈনন্দিন চা পানের অভ্যাসেও দৃশ্যমান। টি ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান শাহ মঈনুদ্দিন হাসানের পর্যবেক্ষণ, স্বাস্থ্যগত কারণে এখন অনেকেই চায়ে চিনি মেশানো বন্ধ করছেন। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের মধ্যে চিনি ছাড়া লিকার চা পানের প্রবণতা বাড়ছে।
বাংলাদেশীয় চা সংসদের সভাপতি কামরান তানভিরুর রহমান মনে করেন, প্রতি কাপ চায়ে অল্প পরিমাণ চিনি কমানো হলেও দেশে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক কাপ চা পান হওয়ায় বছর শেষে চিনির মোট চাহিদায় এর বড় প্রভাব পড়তে পারে।
ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের পাশাপাশি ফ্যাটি লিভারও দেশে বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি হয়ে উঠছে। বাংলাদেশ হেপাটোলজি সোসাইটির গবেষণা অনুযায়ী, দেশে প্রতি তিনজনের একজন ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত। আক্রান্তদের মধ্যে প্রায় এক কোটি মানুষ সিরোসিসের ঝুঁকিতে রয়েছেন।
বিভিন্ন হিসাবে দেশে মোট মৃত্যুর ২ দশমিক ৮২ শতাংশের সঙ্গে লিভারের কোনো না কোনো রোগের সম্পর্ক রয়েছে।
অতিরিক্ত ওজন, পেটের মেদ, ডায়াবেটিস, অস্বাস্থ্যকর খাবার এবং দীর্ঘ সময় শারীরিকভাবে নিষ্ক্রিয় থাকা ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি বাড়ায়।
পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পুষ্টিবিদ নিশাত শারমিন নিশির মতে, অতিরিক্ত চিনি ও পরিশোধিত শর্করা ডায়াবেটিস, ফ্যাটি লিভার ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। এখন অপেক্ষাকৃত কম বয়সীদের মধ্যেও এসব সমস্যা দেখা যাচ্ছে।
তার মতে, সমস্যাটি শুধু চা বা রান্নায় সরাসরি ব্যবহৃত চিনিতে সীমাবদ্ধ নয়। বিস্কুট, বেকারি পণ্য, কোমল পানীয়, রেস্তোরাঁর খাবার ও বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত খাবারের মাধ্যমে শরীরে এমন অনেক চিনি প্রবেশ করে, যা ভোক্তা অনেক সময় বুঝতেই পারেন না।
ফলে কেউ চায়ে চিনি বন্ধ করলেও যদি নিয়মিত মিষ্টিজাতীয় প্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণ করেন, তাহলে মোট চিনি গ্রহণ খুব বেশি কমে নাও আসতে পারে।
বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি জাতীয় অধ্যাপক এ কে আজাদ খানও খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রায় পরিবর্তনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তার মতে, সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম চলছে, তবে দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যক্তিগত জীবনযাপনেও পরিবর্তন প্রয়োজন।
চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি বাজারের তথ্যেও চিনির চাহিদা কমার বিষয়টি স্পষ্ট। ২০২২-২৩ মৌসুমে দেশে চিনির ব্যবহার ছিল ২২ লাখ ৩৭ হাজার টন। ২০২৩-২৪ মৌসুমে তা কমে ২০ লাখ ৪৫ হাজার টনে এবং ২০২৪-২৫ মৌসুমে ১৮ লাখ ৯০ হাজার টনে নেমে আসে।
২০২৫-২৬ মৌসুমে তা আরও কমে ১৮ লাখ ৬৩ হাজার টন হতে পারে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে।
তবে চিনির ব্যবহার কমার পুরো কৃতিত্ব স্বাস্থ্যসচেতনতাকে দিচ্ছেন না বাজারসংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপও বড় কারণ।
কভিড-১৯ মহামারীর পর আন্তর্জাতিক বাজারে চিনির দাম বেড়েছে। সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন এবং আখ থেকে জৈব জ্বালানি উৎপাদন বৃদ্ধিও বৈশ্বিক বাজারে প্রভাব ফেলেছে। একই সময়ে বাংলাদেশে চাল, ডাল, ভোজ্যতেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে।
ফলে অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে মিষ্টি, বেকারি পণ্য এবং অন্যান্য চিনিনির্ভর খাবারে ব্যয় কমিয়েছে।
বেসরকারি একটি বড় চিনি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তার মতে, স্বাস্থ্যসচেতনতা এবং ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া—এই দুই কারণই চিনির চাহিদা কমিয়েছে। মানুষের মধ্যে এখন চিনি বিভিন্ন জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়ায়—এমন ধারণা শক্ত হয়েছে।
তার মতে, পরিবর্তন অনেক সময় শুরু হচ্ছে চায়ে চিনি বাদ দেওয়ার মাধ্যমে। পাশাপাশি ডায়াবেটিসের বিস্তার এবং মিষ্টিজাতীয় পণ্যের ব্যবহার কমে যাওয়ায় সামগ্রিক চাহিদায়ও প্রভাব পড়ছে।
চাহিদা কমে যাওয়ার প্রভাব উৎপাদনেও পড়েছে। ওই প্রতিষ্ঠানের দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় সাড়ে ৫ হাজার টন হলেও বর্তমানে উৎপাদন হচ্ছে প্রায় আড়াই হাজার টন।
রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলগুলোর পরিস্থিতিও দুর্বল। বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, একসময় রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলে বছরে প্রায় দুই লাখ টন চিনি উৎপাদিত হতো। ২০১৯-২০ মৌসুমে ১৫টি চিনিকলে উৎপাদন ছিল ৮২ হাজার টনের বেশি।
২০২২-২৩ মৌসুমে তা নেমে আসে ২১ হাজার ৩১৪ টনে। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ মৌসুমে নয়টি মিলে উৎপাদন হয়েছে ৪৩ হাজার ৩২৬ টন।
রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলগুলো দীর্ঘদিন ধরে বড় ধরনের লোকসানে রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এসব কারখানা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের লোকসান ছিল প্রায় ৪৭৭ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরে এই লোকসান ছিল প্রায় ৫৫৫ কোটি টাকা।
সরকারি চিনিকলে প্রতি কেজি চিনি উৎপাদনে ব্যয় এখন প্রায় ৩০০ টাকা। অথচ বাজারে খুচরা পর্যায়ে প্রতি কেজি চিনির দাম প্রায় ১২৫ টাকা। এই বিশাল ব্যবধান রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিশিল্পের আর্থিক দুর্বলতাকে আরও স্পষ্ট করে।
বর্তমানে দেশের প্রায় ৯৭ শতাংশ চিনি কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সরবরাহ করে। একসময় চাহিদা বাড়তে থাকায় এসব কোম্পানি উৎপাদন সক্ষমতাও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছিল।
কিন্তু গত পাঁচ-ছয় বছর ধরে চিনির চাহিদায় নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি থাকায় অনেক বড় মিল তাদের পূর্ণ সক্ষমতার চেয়ে কম উৎপাদন করছে।
মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কামালের মতে, বাংলাদেশের ভোক্তাদের খাদ্যাভ্যাসে নীরব কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটছে। ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা বেড়েছে। ফলে চা-কফি থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াজাত খাবারেও কম চিনি গ্রহণের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
তার মতে, এর সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতিও যুক্ত হয়েছে। পরিবারগুলো মিষ্টিজাতীয় পণ্যে খরচ কমিয়েছে এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতেও চিনির চাহিদা কমেছে।
বাংলাদেশে চিনির ব্যবহার কমার এই প্রবণতা তাই শুধু খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনের গল্প নয়। এর পেছনে একই সঙ্গে কাজ করছে দ্রুত বাড়তে থাকা অসংক্রামক রোগ, স্বাস্থ্যসচেতনতা, মূল্যস্ফীতি, ক্রয়ক্ষমতার চাপ এবং প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের চাহিদায় পরিবর্তন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সরাসরি চিনি খাওয়া কমলেও দেশের ডায়াবেটিস, ফ্যাটি লিভার ও উচ্চ রক্তচাপের রোগী এখনো দ্রুত বাড়ছে। অর্থাৎ শুধু চায়ের কাপ থেকে চিনি বাদ দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস, প্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণ, শরীরচর্চা, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার দিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

