ঢাকা ও আশপাশের বাজারে বিক্রি হওয়া দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যে নিরাপদ সীমার চেয়ে অনেক বেশি মাত্রায় ভারী ধাতু পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে নমুনায় মিলেছে মানুষ ও পশুর মলে থাকা ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। গবেষকদের মতে, এসব পণ্য দীর্ঘদিন খেলে ক্যানসারসহ গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
গত আগস্টে প্রকাশিত এ গবেষণার শিরোনামে দুগ্ধজাত পণ্যে রাসায়নিক ও জীবাণুজনিত ডবল ঝুঁকির কথা বলা হয়েছে। গবেষণাটি করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞান অনুষদ, বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (বিসিএসআইআর) চট্টগ্রাম গবেষণাগার এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর অ্যাডভান্স রিসার্চ ইন সায়েন্সের গবেষকরা। এতে বিসিএসআইআরের অন্য একটি গবেষণা কেন্দ্রও যুক্ত ছিল।
গবেষণা দল ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ঢাকা ও আশপাশের নির্ধারিত এলাকার বাজার থেকে নমুনা সংগ্রহ করে। দুধ সরবরাহের পুরো শৃঙ্খলে দূষণ কোথায় ঘটছে, তা বোঝার জন্য নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত—দুই ধরনের বাজারকেই গবেষণার আওতায় আনা হয়। খামার, ফেরিওয়ালা, স্থানীয় বাজার ও বাণিজ্যিক দোকান থেকে মোট ৮৪টি নমুনা নেওয়া হয়।
নমুনাগুলোর মধ্যে ছিল ৫০টি কাঁচা দুধ, ১২টি ফোটানো দুধ ও ১০টি পনির। এ ছাড়া ১০টি রাস্তার ঘোল, পাঁচটি বাণিজ্যিক দই, পাঁচটি মিষ্টি বা টক দই এবং ঘি ও মাখনের পাঁচটি যৌথ নমুনা পরীক্ষা করা হয়। শহর থেকে দূরত্ব, ক্রেতার সংখ্যা ও পরিচ্ছন্নতার মতো বিষয় বিবেচনায় নিয়ে নমুনা সংগ্রহের স্থান বাছাই করা হয়।
বিশ্লেষণে কাঁচা ও পাস্তুরিত দুধ, দই, পনিরসহ বিভিন্ন পণ্যে ১৪ ধরনের ভারী ধাতুর উপস্থিতি মিলেছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে সিসা, আর্সেনিক, ক্যাডমিয়াম, পারদ, ক্রোমিয়াম, নিকেল, তামা, দস্তা, ম্যাঙ্গানিজ, সেলেনিয়াম, লোহা, কোবাল্ট, অ্যালুমিনিয়াম ও ভ্যানাডিয়াম।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র পাওয়া গেছে সিসার ক্ষেত্রে। পরীক্ষা করা প্রতিটি দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যে সিসা নির্ধারিত সীমার অনেক ওপরে ছিল। খাবারে সিসার নিরাপদ সীমা প্রতি লিটারে ০.০২ মিলিগ্রাম। অথচ পনিরে পাওয়া গেছে প্রতি লিটারে ০.৭৮৪ মিলিগ্রাম, যা নিরাপদ সীমার প্রায় ৩৯ গুণ।
আর্সেনিকের চিত্রও ভালো নয়। খাবারে এর নিরাপদ মাত্রা প্রতি লিটারে ০.০৫ মিলিগ্রাম। কিন্তু বীজ দই, কাপ দই, ঘোল ও পনিরে তা সীমার অনেক ওপরে পাওয়া গেছে। এর মধ্যে পনিরে মাত্রা ছিল সর্বোচ্চ, প্রতি লিটারে প্রায় ৬২.৮৬ মিলিগ্রাম।
ক্যাডমিয়ামের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। খাবারে এর নিরাপদ সীমা প্রতি লিটারে ০.০১ মিলিগ্রাম। পনিরে পাওয়া গেছে ০.০১৯ মিলিগ্রাম, কাপ দইয়ে ০.০১১ মিলিগ্রাম এবং বীজ দইয়ে ০.০১৪ মিলিগ্রাম। প্রতিবেদনে এসব মাত্রাকে সীমার কয়েক গুণ বেশি বলা হলেও সংখ্যাগুলো সীমার তুলনায় তেমন বেশি নয়। ফলে এ তথ্য মূল গবেষণা থেকে যাচাই করে নেওয়া প্রয়োজন।
পারদের সহনীয় সীমা প্রতি লিটারে ০.০০১ মিলিগ্রাম। কাঁচা দুধ, ফোটানো দুধ ও ঘোলে পারদ পাওয়া যায়নি। তবে পনিরে ০.১৫৭ মিলিগ্রাম এবং ঘিতে ০.০৪৬ মিলিগ্রাম পারদ মিলেছে, যা নিরাপদ মাত্রার বহুগুণ বেশি।
নিকেলের অনুমোদিত সীমা প্রতি লিটারে ০.২ মিলিগ্রাম। কাঁচা দুধ থেকে পনির পর্যন্ত সব পণ্যেই এটি সীমার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি ছিল। পনিরে মাত্রা ছিল সর্বোচ্চ, প্রতি লিটারে ২.৫৪৫ মিলিগ্রাম। ক্রোমিয়াম বেশির ভাগ পণ্যে নিরাপদ সীমা পেরিয়েছে, তবে কিছু ক্ষেত্রে সীমার কাছাকাছি ছিল। তামা ও দস্তার মাত্রা মোটামুটি নিরাপদ সীমার মধ্যেই পাওয়া গেছে।
রাসায়নিক দূষণের পাশাপাশি জীবাণুর চিত্রও উদ্বেগজনক। ব্র্যান্ডের ও ব্র্যান্ডহীন—দুই ধরনের দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যেই ই কোলাই ও সালমোনেলা ব্যাকটেরিয়ার ব্যাপক উপস্থিতি মিলেছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। এ ব্যাকটেরিয়া সাধারণত মানুষ ও পশুপাখির মলমূত্রে থাকে এবং ডায়রিয়া ও পেটের নানা অসুখের কারণ হয়।
গবেষক দলের সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর অ্যাডভান্স রিসার্চ ইন সায়েন্সের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আসমা রহমান জানান, দুধে মাত্রাতিরিক্ত ভারী ধাতু পাওয়া যাচ্ছে। যেহেতু কাঁচা দুধে এগুলো আছে, তাই এ দুধ থেকে তৈরি সব পণ্যেই থাকছে। তাঁর মতে, গরুর খাবার, চারণভূমির মাটি বা পানিতেও ভারী ধাতু থাকতে পারে। তবে ঠিক কোন পথে ধাতু দুধে ঢুকছে, তা এখনো স্পষ্ট করে বলা যাচ্ছে না। কিন্তু দুধে ভারী ধাতু আছে, এটি নিশ্চিত।
গবেষক দলের আরেক সদস্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মো. গোলাম মোস্তফা বলেন, দুধে মলের জীবাণু পাওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তিনি জানান, সাভার থেকে দুধ ঢাকা ও আশপাশের বাজারে আনার সময় তাতে বুড়িগঙ্গার পানি মেশানো হয়, এমন চিত্র গবেষকরা দেখেছেন। গরুর মলমূত্র দুধের সঙ্গে মিশে যায়। ফলে দুধ দেখতে সাদা থাকলেও তাতে ই কোলাই জীবাণু থাকে। তাঁর মতে, দুধ মূলত খামার পর্যায়েই দূষিত হয়। কাঁচা দুধ একবার দূষিত হলে তা দিয়ে তৈরি যেকোনো পণ্যও দূষিত হবে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মুহাম্মদ আব্দুস সবুর ঘটনাটিকে খুবই দুঃখজনক বলেছেন। তাঁর ভাষ্য, ই কোলাই ব্যাকটেরিয়ার কারণে ডায়রিয়া ও জন্ডিসের মতো গুরুতর রোগ হতে পারে। তবে দুধ ভালোভাবে ফোটালে এসব ব্যাকটেরিয়া মারা যায়। অন্যদিকে ভারী ধাতু দীর্ঘ সময় শরীরে গেলে ব্লাড ক্যানসারসহ নানা ধরনের ক্যানসার ও উচ্চ রক্তচাপের মতো জটিলতার ঝুঁকি বাড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যের চাহিদা বাড়লেও সেই অনুপাতে সরকারি নজরদারি বাড়েনি। এ কারণেই দৈনন্দিন পুষ্টির এই বড় উৎস ক্রমে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।
এই গবেষণার ফলাফল কয়েকটি বিষয় সামনে এনেছে। প্রথমত, সমস্যাটি শুধু খোলা বা ব্র্যান্ডহীন দুধের নয়। ব্র্যান্ডের পণ্যেও জীবাণুর উপস্থিতির কথা বলা হয়েছে, যা ভোক্তাদের জন্য বাড়তি দুশ্চিন্তার। তবে প্রতিবেদনে নির্দিষ্ট কোনো ব্র্যান্ডের নাম বা আলাদা ফলাফল উল্লেখ নেই।
দ্বিতীয়ত, ধাতুর উৎস এখনো অস্পষ্ট। পশুখাদ্য, মাটি ও পানি—যেকোনো একটি বা একাধিক পথে দূষণ ঘটতে পারে। উৎস নির্ধারণে আরও গবেষণা না হলে কার্যকর প্রতিরোধ কঠিন হবে।
তৃতীয়ত, গবেষণায় নমুনার সংখ্যা ৮৪টি এবং পণ্যভেদে নমুনা কম। যেমন ঘি ও মাখন মিলিয়ে পাঁচটি, দইয়ের নমুনাও পাঁচটি করে। তাই পুরো বাজারের চিত্র হিসেবে ফলাফলকে চূড়ান্ত ধরে নেওয়ার আগে বড় পরিসরে যাচাই জরুরি।
তবে বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা অগ্রাহ্য করার সুযোগ কম। খামার থেকে বাজার পর্যন্ত দুধের সরবরাহ ব্যবস্থায় নিয়মিত পরীক্ষা, ভেজাল ও দূষণের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ এবং খামারিদের সচেতন করা এখন সময়ের দাবি। সাধারণ ভোক্তাদের জন্য আপাতত পরামর্শ হলো, কাঁচা দুধ ভালোভাবে ফুটিয়ে খাওয়া। এতে জীবাণুজনিত ঝুঁকি কমে। তবে ফোটালে ভারী ধাতু দূর হয় না। সে জন্য উৎস পর্যায়ে দূষণ ঠেকানোই মূল সমাধান।

