বন্ধ রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানার অব্যবহৃত জমি শুধু একই ধরনের শিল্পে ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। নীতিমালা কার্যকর হলে ১০ হাজার ৩০৬ একর জমিতে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক যেকোনো বাণিজ্যিক বা উৎপাদনমুখী উদ্যোগ গড়ার সুযোগ তৈরি হবে। কর্মকর্তারা আশা করছেন, প্রথম ধাপে আগামী বছরের মে থেকে জুনের মধ্যে ছয় থেকে সাতটি সরকারি কারখানা বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ আইন, ২০২৬’-এর ৪৮ ধারার অধীনে লোকসানি রাষ্ট্রীয় সম্পদের বাণিজ্যিক ব্যবহারসংক্রান্ত একটি খসড়া নির্দেশিকা তৈরি করা হয়েছে। এটি এখন পর্যালোচনার চূড়ান্ত পর্যায়ে। পুনরুজ্জীবনের সম্ভাবনা বিবেচনায় পাঁচটি রাষ্ট্রায়ত্ত করপোরেশনের অধীনে ৪৪টি বন্ধ ও লোকসানি প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করেছে সরকার। এগুলোর মোট জমির পরিমাণ প্রায় ১০ হাজার ৩০৬ একর। নীতিমালা কার্যকর হলে স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে এসব জমি বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের জন্য উন্মুক্ত করা হবে।
বর্তমান ব্যবস্থায় সাধারণত কোনো কারখানার অব্যবহৃত জমি একই ধরনের শিল্পে ব্যবহারের কথা বিবেচনা করা হয়। প্রস্তাবিত নীতিমালায় এই বাধ্যবাধকতা শিথিল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফলে জমির অবস্থান, অবকাঠামো, বাণিজ্যিক সম্ভাবনা ও অর্থনৈতিক উপযোগিতা বিবেচনা করে বিনিয়োগকারীরা অন্য শিল্প বা ব্যবসা গড়ার প্রস্তাব দিতে পারবেন। উদাহরণ হিসেবে, পুরোনো চিনিকলের জমি আর চিনিশিল্পেই ব্যবহার করতে হবে না। তবে নির্দিষ্ট কোনো প্রকল্পে সরকার বিশেষ শিল্প বা খাতকে অগ্রাধিকার দিতে পারবে। সেটি দরপত্রের শর্তে উল্লেখ থাকবে এবং মূল্যায়নের সময় বিবেচনায় নেওয়া হবে।
ইনভেস্ট বাংলাদেশের সদস্য নাহিয়ান রহমান রচি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে জানান, এ উদ্যোগে তিনটি মূলনীতি অনুসরণ করা হবে। এগুলো হলো সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার, ন্যায্য ও স্বচ্ছ প্রতিযোগিতা এবং পুরো প্রক্রিয়ার জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা। তাঁর ভাষ্য, সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতেই বিনিয়োগের সুযোগ উন্মুক্ত করা হবে। স্বচ্ছতা ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে বিনিয়োগকারী নির্বাচন হবে দরপত্রের মাধ্যমে।
গত ১৭ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে মুখ্য সচিবের সভাপতিত্বে এক সভায় নীতিমালার সর্বশেষ খসড়া পর্যালোচনা করা হয়। সভায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবং বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটির প্রতিনিধিরা ছিলেন। তাঁদের পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে চূড়ান্ত মতামত দিতে বলা হয়। সেসব মতামত যুক্ত করে খসড়া চূড়ান্ত হবে। এরপর আইনগত যাচাই ও প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেওয়া হবে।
নাহিয়ান রহমান রচি বৃহস্পতিবার টিবিএসকে বলেন, নির্দেশিকা কার্যকরের জন্য রোববার চূড়ান্ত সংস্করণ আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর আশা করছেন তিনি। এরপর সম্পদ বাণিজ্যিকীকরণের প্রক্রিয়া শুরুর জন্য প্রস্তুত থাকবেন তাঁরা।
প্রস্তাবিত নীতিমালায় আট সদস্যের একটি ইনভেস্টমেন্ট ট্রানজ্যাকশন কো-অর্ডিনেশন অ্যান্ড সুপারভিশন কমিটি গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এর সভাপতি হবেন। সম্পদ মূল্যায়ন, লেনদেনের কাঠামো ঠিক করা, দরপত্র পরিচালনা এবং উপযুক্ত বিনিয়োগকারীর সুপারিশে কমিটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
চিহ্নিত ৪৪টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশনের অধীনে ১২টি, বাংলাদেশ স্টিল অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশনের চারটি, বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের ১০টি, বাংলাদেশ সুগার অ্যান্ড ফুড ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের ১৩টি এবং বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের পাঁচটি। নতুন জমি অধিগ্রহণ ও শিল্প অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় না করে বিদ্যমান জমি, কারখানা, বিদ্যুৎ-গ্যাস সংযোগ ও অন্যান্য সুবিধা আবার উৎপাদনশীল কাজে লাগানোই সরকারের লক্ষ্য। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে উৎসাহ দিতে প্রকল্পের ধরন অনুযায়ী ২৫ থেকে ৩০ বছর বা তার বেশি সময়ের জন্য ব্যবস্থাপনা ও জমি ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় আছে।
এসব সম্পদের মধ্যে চিনি, বস্ত্র, পাট, কাগজ, রাসায়নিক, প্রকৌশল, চামড়া, সার ও কাচ উৎপাদনসহ নানা ধরনের শিল্পপ্রতিষ্ঠান আছে। সবচেয়ে বেশি ৩ হাজার ৮৬০ দশমিক ৫০ একর জমি দিনাজপুরের সেতাবগঞ্জ চিনিকলে। ঠাকুরগাঁও চিনিকলে আছে ২ হাজার ৮৮৭ দশমিক ০২ একর এবং রাঙামাটির কর্ণফুলী পেপার মিলসে ৫০১ দশমিক ৭৮ একর। চট্টগ্রামের উত্তর পতেঙ্গায় জেনারেল ইলেকট্রিক ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানির ১২২ দশমিক ৯৬ একর জমির উল্লেখযোগ্য অংশ অব্যবহৃত। সেখানে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব ট্রান্সফরমার কারখানার সম্ভাবনা দেখছে সরকার। টঙ্গীর অ্যাটলাস বাংলাদেশ লিমিটেডের ৯ দশমিক ৬২ একর জমির প্রায় ৬৪ শতাংশ খালি। বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেলের বাড়তে থাকা বাজারকে কাজে লাগিয়ে সেখানে উৎপাদন সম্প্রসারণের সম্ভাবনা রয়েছে।
গত ২০ জুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে আয়োজিত এক রোডশোতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সামনে এই ৪৪টি প্রতিষ্ঠান তুলে ধরা হয়। পুনরুজ্জীবনের সম্ভাব্য মডেল হিসেবে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব, যৌথ উদ্যোগ, দীর্ঘমেয়াদি ইজারা ও কৌশলগত বিক্রয়ের কথা বলা হয়। ইনভেস্ট বাংলাদেশের তথ্যে, উদ্যোগ চালুর প্রথম ১৪-১৫ দিনে প্রায় ৫০টি প্রস্তাব এসেছিল। পরে ১৪টির বেশি কোম্পানি ও শিল্পগোষ্ঠীর কাছ থেকে প্রায় ৯০টি প্রস্তাব পাওয়া গেছে। তবে এসব প্রস্তাবের ভিত্তিতে সরাসরি কাউকে কারখানা বা সম্পদ দেওয়া হবে না। নীতিমালা চূড়ান্ত হলে নতুন করে দরপত্র ডাকা হবে এবং আগে প্রস্তাব দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকেও প্রতিযোগিতায় নামতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা নমনীয়তা ও সুরক্ষার ওপর জোর দিয়েছেন। বিল্ডের চেয়ারপারসন ও ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি আবুল কাসেম খান বলেন, ব্যবসার বাস্তবতা ও এলাকার উপযোগিতা বিবেচনায় দরপত্রের শর্ত যথেষ্ট নমনীয় রাখা উচিত। কোন এলাকায় কোন শিল্প লাভজনক হবে, তা ঠিক করতে গ্যাসের প্রাপ্যতা, যোগাযোগব্যবস্থা ও অন্যান্য অবকাঠামো মূল্যায়ন করা দরকার। এরপর প্রস্তাব যাচাই করে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রে উপযুক্ত বিনিয়োগকারী বেছে নেওয়া যেতে পারে।
নলেজ হাব ইনস্টিটিউট ট্রাস্টের সভাপতি খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হলেও অনুপযুক্ত বিনিয়োগকারীর হাতে এসব সম্পদ চলে যাওয়া ঠেকাতে সুরক্ষাব্যবস্থা থাকা জরুরি। তাঁর মতে, বিনিয়োগকারী বাছাইয়ে ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা, সংশ্লিষ্ট খাতে দক্ষতা, আর্থিক সক্ষমতা, বিনিয়োগযোগ্য অর্থের উৎস এবং অতীত কার্যক্রমের রেকর্ড বিবেচনায় নেওয়া উচিত। সংশ্লিষ্ট শিল্পে প্রকৃত আগ্রহ আছে, এমন অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানকেও প্রস্তাব দিতে আমন্ত্রণ জানানো যেতে পারে।
সব মিলিয়ে বছরের পর বছর অলস পড়ে থাকা বিশাল জমি ও অবকাঠামো কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে। তবে সাফল্য নির্ভর করবে দরপত্র প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ হয় এবং প্রভাবশালী মহলের হাতে সম্পদ চলে যাওয়ার ঝুঁকি কতটা ঠেকানো যায়, তার ওপর। এখন নজর থাকবে আইন মন্ত্রণালয়ে নির্দেশিকার অনুমোদন এবং আগামী বছরের মে-জুনে প্রথম ধাপের হস্তান্তর ঘিরে।

