আমদানি করা পাটবীজের ওপর নির্ভরতা কমানো, মূল্য সংযোজিত পাটপণ্যের উৎপাদন বাড়ানো এবং রপ্তানি আয় দ্বিগুণ করার লক্ষ্য নিয়ে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পাটশিল্প পুনরুজ্জীবনে মোট ২ হাজার ৩২০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১২টি প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্পগুলো ২০৩০ সালের জুনের মধ্যে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। পুরো অর্থায়ন করবে সরকার।
বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় এসব প্রকল্পের প্রস্তাব তৈরি করেছে। মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অনুবিভাগের যুগ্ম সচিব মো. জাহিদ হোসেন জানান, প্রস্তাবগুলো সম্প্রতি অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে এ তথ্য দেন।
বাংলাদেশ সোনালি আঁশের দেশ হিসেবে পরিচিত। তবু দেশের চাহিদার ৮০ শতাংশের বেশি পাটবীজ এখনো আমদানি করতে হয়। যুগ্ম সচিবের ভাষ্য, কূটনৈতিক বা বাণিজ্যিক সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হলে এই নির্ভরতা বড় ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। সেই ঝুঁকি কমাতেই এ উদ্যোগ।
তিনি আরও বলেন, দেশে উৎপাদিত বীজ অনেক সময় ঠিক সময়ে কৃষকের হাতে পৌঁছায় না। অন্যদিকে বপন মৌসুমের শুরুতেই ভারত থেকে আমদানি করা বীজ মেলে। ফলে মান নিয়ে উদ্বেগ ও বিদেশি সরবরাহকারীর ওপর নির্ভরতা থাকলেও অনেক কৃষক আমদানি করা বীজই বেছে নেন। অর্থাৎ শুধু বীজ উৎপাদন বাড়ালেই হবে না, সময়মতো বিতরণও নিশ্চিত করতে হবে।
মন্ত্রণালয়ের নথি অনুযায়ী, ২০৩১ সালের মধ্যে পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি থেকে বার্ষিক আয় ১৬৪ কোটি ডলারে নেওয়ার লক্ষ্য ঠিক করেছে সরকার। এ পরিকল্পনার আওতায় আরও কয়েকটি লক্ষ্য রয়েছে।
কাঁচা পাটের উৎপাদন প্রায় ১ কোটি ১৫ লাখ বেল থেকে বাড়িয়ে ১ কোটি ২০ লাখ বেলে নেওয়া হবে। স্থানীয় উৎপাদনে দেশের পাটবীজের চাহিদার ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ মেটানো হবে। মূল্য সংযোজিত পাটপণ্যের অংশ ৪৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭০ শতাংশে তোলার লক্ষ্যও আছে।
লক্ষ্যটি কতটা কঠিন, তা বোঝা যায় সাম্প্রতিক রপ্তানির চিত্রে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি থেকে আয় ছিল ১১৬ কোটি ডলার। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা প্রায় ২৪ শতাংশ কমে নেমেছে ৮৮ কোটি ৩৬ লাখ ৯০ হাজার ডলারে। অর্থাৎ ১৬৪ কোটি ডলারে পৌঁছাতে হলে বর্তমান আয় প্রায় দ্বিগুণ করতে হবে।
কর্মকর্তারা বলছেন, রপ্তানি কমার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। মূল্য সংযোজিত পণ্যের উৎপাদন সীমিত। বাজারে প্রবেশের সুযোগ সংকুচিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা বেড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভারতের আরোপ করা অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক।
যুগ্ম সচিব জানান, খাতটির অন্য চ্যালেঞ্জও কম নয়। দেশের ২৬৬টি পাটকলের মধ্যে ৭৩টি বন্ধ হয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিসম্পন্ন পরীক্ষাগার নেই। পাট অধিদপ্তরে বিপুলসংখ্যক পদ শূন্য রয়েছে।
প্রস্তাবিত ১২টি প্রকল্পের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে বীজ উৎপাদন ও আধুনিক যন্ত্রপাতিতে। বীজ উৎপাদনকারী এলাকায় বীজের বর্ধিত উৎপাদন ও বিতরণ কর্মসূচির মাধ্যমে পাটবীজে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে ৩০০ কোটি টাকার প্রস্তাব করা হয়েছে। আধুনিক পাট কাটার ও আঁশ ছাড়ানোর যন্ত্রপাতি কেনায় আরও ৩০০ কোটি টাকা চাওয়া হয়েছে।
মান নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিসম্পন্ন পরীক্ষাগার ও মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়তে ২৮০ কোটি টাকার প্রস্তাব রয়েছে। রাজশাহী ও রংপুরে বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদনকারী রপ্তানিমুখী উদ্যোক্তাদের সহায়তায় ২৫০ কোটি টাকা রাখার পরিকল্পনা আছে।
উৎপাদনশীলতা, আঁশের মান ও রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে যৌথ গবেষণায় ১২০ কোটি টাকা চাওয়া হয়েছে। পাটখড়ি থেকে চারকোল ও অ্যাকটিভেটেড কার্বন তৈরিতেও একই পরিমাণ অর্থ প্রস্তাব করা হয়েছে। পাটের উৎপাদন, বিক্রি, রপ্তানি ও ব্যবহারের তথ্য সংরক্ষণে ডিজিটাল ডেটাবেইস তৈরিতে ১৫০ কোটি টাকার প্রস্তাব রয়েছে।
লবণাক্ততাপ্রবণ ও পাহাড়ি অনাবাদি জমিতে পাটবীজের চাষ বাড়াতে ১০০ কোটি টাকা এবং কাঁচা পাটের মূল্য ব্যবস্থাপনা ও ডিজিটাল ক্রয়ব্যবস্থা উন্নয়নে আরও ১০০ কোটি টাকা চাওয়া হয়েছে। পরিবেশবান্ধব পাট পচানোর প্রযুক্তি উদ্ভাবনে ৫০ কোটি টাকার প্রস্তাব আছে।
সরকারের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদ খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। তিনি পাটবীজে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, উপকূলীয় ও লবণাক্ত এলাকায় চাষ সম্প্রসারণ এবং বহুমুখী মূল্য সংযোজিত পণ্য বাড়ানোর উদ্যোগকে সমর্থন করেন। তবে তাঁর মতে, প্রস্তাবিত কয়েকটি প্রকল্পে খাতটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা উপেক্ষিত থেকে গেছে।
তাঁর বক্তব্য, শুধু উৎপাদন নয়, এ শিল্পের বড় চ্যালেঞ্জ হলো দেশি ও বিদেশি বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি। এ ক্ষেত্রে তিনি পাটজাত মোড়ক বাধ্যতামূলক করার আইনের কথা তুলে ধরেন। আইন অনুযায়ী ২১টি পণ্য পাটের বস্তায় মোড়কজাত করতে হয়। কিন্তু আইন যথাযথভাবে কার্যকর না হওয়ায় এখনো ব্যাপকভাবে প্লাস্টিকের মোড়ক ব্যবহার হচ্ছে। ফলে অভ্যন্তরীণ বাজারে পাটের চাহিদা বাড়ছে না।
রপ্তানি নিয়েও তিনি উদ্বেগ জানান। তাঁর ভাষ্য, পাটজাত পণ্যের প্রধান বাজার এখনো ভারত। কিন্তু দেশটির অ্যান্টি-ডাম্পিং ও কাউন্টারভেইলিং শুল্ক রপ্তানিতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব বাধা দূর করতে সরকারের উদ্যোগ যথেষ্ট নয় বলে তিনি মনে করেন।
গোলাম মোয়াজ্জেম আরও বলেন, বাংলাদেশ এখনো মূলত কাঁচা পাট রপ্তানি করে। আর ভারতের মতো দেশ পাট প্রক্রিয়াজাত করে উচ্চমূল্যের পণ্য তৈরি করছে এবং বেশি মুনাফা করছে। বাংলাদেশেরও বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদন ও রপ্তানির সক্ষমতা গড়ে তোলা উচিত।
কয়েকটি প্রকল্পের বড় অঙ্কের বরাদ্দ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। তাঁর মতে, খাতটির প্রকৃত চাহিদা ও সরকারের বিদ্যমান সক্ষমতার সঙ্গে মিলিয়ে ব্যয় যাচাই করা উচিত। তাঁর ভাষায়, অনেক প্রকল্পই আমলাতান্ত্রিক ও সরবরাহনির্ভর মনে হচ্ছে, অথচ বাজার সম্প্রসারণ ও প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়ানোই মূল চ্যালেঞ্জ। তিনি অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণ, রপ্তানির বাধা দূর করা এবং মোড়কজাতকরণ আইন কার্যকর করাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান।
প্রকল্পগুলো এখনো প্রস্তাব পর্যায়ে আছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পেলে তবেই বাস্তবায়নের পথ খুলবে। বীজ, যন্ত্রপাতি ও গবেষণায় বিনিয়োগ উৎপাদনের দিক শক্ত করতে পারে। তবে বাজার সম্প্রসারণ, শুল্কবাধা কাটানো ও দেশীয় চাহিদা বাড়ানোর পদক্ষেপ না থাকলে রপ্তানি আয় দ্বিগুণ করার লক্ষ্য কঠিন হয়ে থাকবে।

