কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে গভীর নলকূপ বসাতে গিয়ে ভূগর্ভ থেকে গ্যাস বেরিয়ে আসার ঘটনায় নতুন সম্ভাবনার কথা বলছেন পেট্রোবাংলা ও বাপেক্সের কর্মকর্তারা। তাঁদের ধারণা, গ্যাস নির্গমনের ওই স্থানে জ্বালানি তেল বা অন্য কোনো হাইড্রোকার্বন উপজাত থাকতে পারে। শুক্রবার রাতে ছোট ইনানীতে মোস্তফা সিকদারের বাড়ির উঠানে জ্বলতে থাকা শিখা পর্যবেক্ষণ করে তাঁরা এই প্রাথমিক ধারণা জানান।
গত ২৭ অক্টোবর সকালে ওই বাড়ির উঠানে নলকূপ বসানোর জন্য খনন চলছিল। এ সময় হঠাৎ গ্যাস বের হতে শুরু করে। একপর্যায়ে সেই গ্যাসে আগুন ধরে যায়। তখন থেকে আগুন জ্বলছে।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) মোহাম্মদ শোয়েব সাংবাদিকদের জানান, ২৯ অক্টোবর পেট্রোবাংলায় একটি বৈঠক হয়। সেখানে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তা এবং কয়েকজন অবসরপ্রাপ্ত মহাব্যবস্থাপক উপস্থিত ছিলেন। বিভিন্ন পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে তাঁরা মত দেন, গ্যাসটি বায়োজেনিক উৎসের নয়, বরং থার্মোজেনিক প্রকৃতির হতে পারে।
ঘটনাস্থল ঘুরে দেখে শোয়েব বলেন, প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে মনে হচ্ছে এখানে অগভীর গ্যাসের আধার আছে, যেখান থেকে আগুনের উৎপত্তি। বাংলাদেশে সাধারণত ভূগর্ভের দেড় থেকে পাঁচ কিলোমিটার গভীরে গ্যাস মেলে। তাই অগভীর স্তরে এ ধরনের গ্যাসের উপস্থিতি বিষয়টিকে আলাদা গুরুত্ব দিচ্ছে।
নির্গত গ্যাসের উৎস, প্রকৃত পরিমাণ এবং উৎসে কোনো লিক আছে কি না, তা নির্ধারণ করতে ১৫ দিন পর্যবেক্ষণ লাগবে বলে জানান শোয়েব। এ সময় কর্মকর্তারা আগুনের শিখার উচ্চতা ও গ্যাস নির্গমনের ধরন নিবিড়ভাবে দেখবেন।
তিনি বলেন, ১৫ দিন পর শিখার উচ্চতা বাড়লে বা অপরিবর্তিত থাকলে গ্যাসের প্রবাহ থামাতে প্রাথমিকভাবে ‘রিলিফ ওয়েল’ বা সহায়ক কূপ খননের কথা ভাবা হবে। এ ধরনের পরিস্থিতি সামলাতে আন্তর্জাতিকভাবে এই প্রযুক্তি ব্যবহার হয়। আর পর্যবেক্ষণের সময় গ্যাসের প্রবাহ কমে গেলে বা বন্ধ হলে পরিস্থিতি বুঝে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
কর্মকর্তারা আরও জানান, আশপাশের কয়েকটি এলাকাতেও গ্যাস জ্বলতে দেখা গেছে। ভূতাত্ত্বিক গঠনের পরিবর্তনের কারণে এমন গ্যাস নির্গমন ঘটতে পারে।
ওই এলাকায় গ্যাস মজুদের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে পরে থ্রিডি জরিপ চালাবে বাপেক্স। জরিপে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক মজুদের ইঙ্গিত মিললে নতুন কূপ খননের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। অর্থাৎ বর্তমান ধারণা এখনো প্রাথমিক, মজুদ নিশ্চিত করতে আরও বৈজ্ঞানিক যাচাই দরকার।
বাপেক্সের ভূতাত্ত্বিক বিভাগের মহাব্যবস্থাপক শামসিয়া মুক্তাদির বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতি সামলানোর অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা বাপেক্সের আছে। নিজস্ব সম্পদ ব্যবহার করেই তাঁরা তা পারবেন। তবে যেকোনো সময় অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখেই সব সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।
একটি বাড়ির উঠানে পাঁচ দিন ধরে গ্যাস জ্বলতে থাকায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি রয়েছে। ঘটনার পর উপজেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে ফায়ার সার্ভিসের কয়েকটি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। গ্যাসখনির সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় বাপেক্সের একটি কারিগরি দলও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় সুপারিশ দিয়েছে।
আগুন নিয়ন্ত্রণে না আসায় জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গত বৃহস্পতিবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে জরুরি বৈঠক হয়। সেখানে আগুনের উৎসের চারপাশের এলাকাকে বিভিন্ন নিরাপত্তা অঞ্চলে ভাগ করে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
এরপর উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পান্না আক্তারের সই করা আদেশে ঘটনাস্থলের ২০০ মিটার ব্যাসার্ধে সাধারণ মানুষের প্রবেশ ও উপস্থিতি নিষিদ্ধ করা হয়। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে। আদেশে ওই এলাকায় আগুন জ্বালানো, ধূমপান, দেশলাই বা লাইটার ব্যবহার এবং স্ফুলিঙ্গ সৃষ্টি করতে পারে এমন যেকোনো কাজ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আদেশ অমান্য করলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে মাইকিং চলছে। ঘটনাস্থলের চারপাশে কাঁটাতারের বেড়া ও লাল নিশান টাঙানো হয়েছে। তবু উৎসুক মানুষের ভিড় পুরোপুরি ঠেকাতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। টানা কয়েক দিন ধরে গ্যাস জ্বলতে থাকায় ইনানীর ছোট খাল এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
একদিকে নতুন গ্যাস বা তেলের সম্ভাবনা, অন্যদিকে আগুন ও বিস্ফোরণের ঝুঁকি, এই দুইয়ের মাঝেই এখন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে। ১৫ দিনের পর্যবেক্ষণ ও পরবর্তী জরিপের ফলাফলই ঠিক করে দেবে, এটি লাভজনক মজুদের ইঙ্গিত কি না। ততক্ষণ পর্যন্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই প্রধান অগ্রাধিকার।

