ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে গাজীপুর ও রাজধানীর মিরপুরে আবারও সড়কে নেমেছেন পোশাকশ্রমিকেরা। সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবস আজ রোববার, ১ নভেম্বর সকাল থেকে তাঁদের অবরোধে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কসহ মিরপুরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। দুই জায়গাতেই পুলিশ বক্সে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। মিরপুর-১০ এলাকায় শ্রমিক ও পুলিশের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গাজীপুরে পাঁচ প্লাটুন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
গাজীপুরে সকাল ৮টার পর থেকে শ্রমিকেরা মহাসড়কে জড়ো হতে শুরু করেন। সাড়ে ৯টার দিকে তাঁরা সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন এবং বেতন বাড়ানোর দাবিতে স্লোগান দেন। কালিয়াকৈর উপজেলার সফিপুর বাজার, চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ, মৌচাক ও তেলিচালা এলাকায় শত শত শ্রমিক লাঠিসোঁটা হাতে অবস্থান নেন। এতে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যান চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে পড়ে। ওই পথের যাত্রীরা চরম দুর্ভোগে পড়েন।
কালিয়াকৈরের রতনপুর এলাকার করণী নিট কম্পোজিট, নিট এশিয়াসহ আশপাশের কয়েকটি কারখানার শ্রমিকেরা কাজে যোগ না দিয়ে সফিপুর বাজার এলাকায় মহাসড়কে নামেন। সকালে কয়েকটি কারখানার শ্রমিকেরা ভেতরে ঢুকে হাজিরা নিশ্চিত করেন। এরপর বেরিয়ে এসে তাঁরা বিক্ষোভে যোগ দেন। আন্দোলনের কারণে আশপাশের বেশ কয়েকটি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।

গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (জিএমপি) কোনাবাড়ী থানার ওসি ইফতেখার হোসেন জানান, ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের কোনাবাড়ী এলাকায় সড়কের মাঝখানে থাকা একটি পুলিশ বক্সে বিক্ষোভকারী শ্রমিকেরা আগুন ধরিয়ে দিয়েছেন। কালিয়াকৈর থানার ওসি শহিদুল ইসলাম বলেন, শ্রমিকেরা সকাল থেকেই মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করছেন। এ কারণে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে।
রাজধানীর মিরপুরেও একই দাবিতে সকাল থেকে সড়ক অবরোধ করেন পোশাকশ্রমিকেরা। মিরপুর-১০, ১১ ও ১২ নম্বর এলাকায় তাঁরা অবস্থান নেওয়ায় গাবতলী থেকে মিরপুর-১০ হয়ে আগারগাঁও-মহাখালী রুটে যান চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। গাবতলী থেকে মিরপুর-১০, ১১, ১২ হয়ে কালশী ও বিমানবন্দর এবং যমুনা ফিউচার পার্ক হয়ে প্রগতি সরণির দিকের পথেও বাস থেকে শুরু করে কোনো যানবাহন চলছে না। তাঁরা মিরপুর-১০ থেকে ১৪ এবং পল্লবীর দিকের সড়কেও অবস্থান করছেন।
সকাল ১১টা পর্যন্ত পুলিশ শ্রমিকদের সড়ক ছেড়ে দিতে বোঝানোর চেষ্টা করে। তাতে কাজ না হওয়ায় ১১টা ২০ মিনিটের দিকে পুলিশ অভিযানে নামে। শ্রমিকদের সরাতে টিয়ার শেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও জলকামান ব্যবহার করা হয়। জবাবে শ্রমিকেরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়েন। সেখানেও একটি পুলিশ বক্সে আগুন দেওয়া হয়। এতে মিরপুর-১০ এলাকা কার্যত রণক্ষেত্রে রূপ নেয়। মিরপুর থানার কর্তব্যরত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) হাফিজুল ইসলাম জানান, রাস্তা থেকে শ্রমিকদের সরিয়ে দিতে পুলিশ কাজ করছে।
অবরোধের প্রভাব পড়েছে পুরো রাজধানীতে। ফার্মগেট, শাহবাগ সড়ক, সায়েন্স ল্যাব ও কাওরান বাজার এলাকায়ও তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়েছে। অফিসগামী যাত্রীদের অনেককে বাস থেকে নেমে হেঁটে অবরোধস্থল পার হতে হয়েছে। এরপর অটোরিকশা বা অন্য বাহনে গন্তব্যে যেতে হয়েছে তাঁদের। অনেকে মেট্রোরেলে উঠেছেন। সড়ক বন্ধ থাকায় মেট্রোরেলে উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে।
মিরপুর-১১ এলাকার বাসিন্দা ইউসুফ আহমেদ জরুরি কাজে তেজগাঁও যেতে গাড়ি নিয়ে বের হয়েছিলেন। অবরোধ দেখে তিনি বাসায় ফিরে যান। পরে গাড়ি রেখে মেট্রোরেলে ফার্মগেট এবং সেখান থেকে তেজগাঁও যান। আরেক যাত্রী ইমন বিকল্প হিসেবে কালশী সড়ক ব্যবহার করেছেন। সেখানে তাঁর মোটরসাইকেল কয়েকবার আটকে দেওয়া হয়। অনুরোধ করে তিনি পার পান।
তেজগাঁও ট্রাফিক বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) রফিকুল ইসলাম বলেন, মিরপুর-১০ থেকে ওই সড়ক পুরোপুরি বন্ধ থাকায় যানজট তৈরি হয়েছে। ওই এলাকার গাড়ি গুলিস্তানে যাওয়ার বিকল্প পথ হিসেবে আশপাশের সড়ক ব্যবহার করছে। ফলে সেসব সড়কেও যানবাহনের চাপ বেড়েছে। তবু শৃঙ্খলা ধরে রাখার চেষ্টা চলছে বলে তিনি জানান।
মজুরির দাবিতে গত কয়েক দিন ধরেই সড়ক অবরোধ করে আন্দোলন চালাচ্ছেন পোশাকশ্রমিকেরা। গতকাল শনিবারও তাঁরা মিরপুর-১০ এলাকা অবরোধ করেছিলেন। আজ আন্দোলন গাজীপুর ও মিরপুর, দুই জায়গাতেই আরও তীব্র আকার নিয়েছে।
আন্দোলনের এই ধারা শিল্পাঞ্চল ও রাজধানীর স্বাভাবিক জনজীবনে বড় চাপ তৈরি করছে। একদিকে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবি, অন্যদিকে সড়ক অবরোধ, সংঘর্ষ ও পুলিশ বক্সে অগ্নিসংযোগের ঘটনা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে সমাধান না হলে কারখানা উৎপাদন, যাতায়াত ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে আরও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এখন নজর থাকবে সরকার, কারখানা মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনার দিকে।

