জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) সংশোধন, নতুন ভোটার নিবন্ধন কিংবা আবেদনের সর্বশেষ অবস্থা জানতে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) হটলাইন নম্বর ১০৫ চালু করা হয়েছিল নাগরিকদের ভোগান্তি কমানোর উদ্দেশ্যে। কিন্তু দীর্ঘ ১২ বছর পার হলেও এই সেবার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। অনেক নাগরিক এখনো হটলাইন নম্বরটি সম্পর্কে জানেন না। আবার নম্বর জানা থাকলেও ফোন করে প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া সব সময় সম্ভব হচ্ছে না।
নির্বাচন কমিশনের কল সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন পাঁচ হাজারের বেশি ফোন আসে। কিন্তু সীমিত জনবলের কারণে এর মধ্যে মাত্র আড়াই থেকে তিন হাজার কলের উত্তর দেওয়া সম্ভব হয়। একসঙ্গে ২৪টির বেশি কল এলে অতিরিক্ত কলগুলো সরাসরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ফলে অনেক গ্রাহক দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও অপারেটরের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পান না।
এনআইডি সংশোধন, নতুন ভোটার হওয়ার যোগ্যতা, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং আবেদন করার নিয়ম সম্পর্কে প্রাথমিক পরামর্শ দেওয়াই এই কল সেন্টারের মূল কাজ। কিন্তু জনবলসংকটের পাশাপাশি আবেদনসংক্রান্ত তথ্য যাচাইয়ের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ায় গ্রাহকদের প্রত্যাশা অনুযায়ী সেবা দেওয়া যাচ্ছে না। পরিস্থিতি সামাল দিতে এবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর ভয়েস ও কথোপকথন ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা করছে নির্বাচন কমিশন।
প্রতিদিন হাজারো কলের উত্তর দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না
কল সেন্টারের পরিসংখ্যান বলছে, গত ১২ অক্টোবর ২৪ ঘণ্টায় মোট ৬ হাজার ৩৯১টি ফোন এসেছে। এর মধ্যে ৩ হাজার ২৫৩টি কল থেকে গ্রাহকরা সরাসরি অপারেটরের সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছেন। কিন্তু উত্তর দেওয়া সম্ভব হয়েছে মাত্র ২ হাজার ২১৪টি কলে। অর্থাৎ অপারেটরের সহায়তা চাওয়া কলের ৬৮ দশমিক ১ শতাংশের উত্তর দেওয়া হয়েছে। বাকি ১ হাজার ৩৭টি বা প্রায় ৩২ শতাংশ কলের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে।
অক্টোবর মাসে ২৪ ঘণ্টার হিসাবে কল সেন্টারে মোট ১ লাখ ৭৪ হাজার ৯৯১টি ফোন এসেছে। এর মধ্যে ৭৮ হাজার ৪০২টি কল থেকে অপারেটরের সহায়তা চাওয়া হয়। অফিস চলাকালে আসা ৭৫ হাজার ৮৬২টি কলের মধ্যে উত্তর দেওয়া সম্ভব হয়েছে ৪৪ হাজার ৩০০টির। ফলে ৫৬ দশমিক ৫ শতাংশ কলের উত্তর দেওয়া গেলেও ৪৩ দশমিক ৫ শতাংশের উত্তর দেওয়া সম্ভব হয়নি।
গত আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত তিন মাসে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক ছিল। এই সময়ে মোট ৬ লাখ ২১ হাজার ৯৫০টি কল এসেছে। এর মধ্যে ৩ লাখ ২০ হাজার ২৮১টি কল থেকে অপারেটরের সহায়তা চাওয়া হয়। অফিস চলাকালে আসা ২ লাখ ৬৭ হাজার ৪০২টি কলের মধ্যে মাত্র ১ লাখ ৩৪ হাজার ৫৫৫টির উত্তর দেওয়া সম্ভব হয়েছে। অর্থাৎ সহায়তা চাওয়া কলের মাত্র ৪২ শতাংশের উত্তর পেয়েছেন গ্রাহকরা। বাকি ১ লাখ ৮৫ হাজার ৭২৬টি কলের উত্তর দেওয়া সম্ভব হয়নি অথবা সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে।
হটলাইন সম্পর্কে জানেন না অনেক নাগরিক
এনআইডি-সংক্রান্ত তথ্য জানতে হটলাইন চালু থাকলেও অনেক নাগরিক এখনো এর ব্যবহার সম্পর্কে অবগত নন। ফলে সামান্য তথ্যের জন্যও তাঁদের নির্বাচন কমিশনের কার্যালয়ে সরাসরি যেতে হচ্ছে।
সম্প্রতি এনআইডি সংশোধনের আবেদন করে তিন মাসেও কোনো সাড়া না পেয়ে যাত্রাবাড়ী থেকে নির্বাচন কমিশনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আসেন বেসরকারি চাকরিজীবী সুজন সরকার (৪৮)। তিনি জানান, ফোন করে এনআইডি-সংক্রান্ত তথ্য জানার কোনো ব্যবস্থা রয়েছে, তা আগে তাঁর জানা ছিল না।
একইভাবে নতুন ভোটার হওয়ার নিয়ম জানতে উত্তর বাড্ডা থেকে নির্বাচন কমিশনে আসেন কলেজশিক্ষার্থী তন্নি আক্তার (২০)। তাঁরও হটলাইন নম্বর ১০৫ সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল না।
এ ধরনের অসচেতনতার সুযোগে মধ্যস্বত্বভোগী ও দালালদের প্রতারণার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে কম শিক্ষিত নাগরিকদের কেউ কেউ এনআইডি-সংক্রান্ত কাজ করাতে দালালের সহায়তা নিচ্ছেন। এতে তাঁদের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে, এমনকি প্রতারণার শিকার হওয়ার ঘটনাও ঘটছে।
অথচ ১০৫ নম্বরে ফোন করেই এনআইডি-সংক্রান্ত বিভিন্ন সেবার নিয়ম, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং করণীয় সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা পাওয়া সম্ভব।
একসঙ্গে ২৪টির বেশি কল এলেই বিচ্ছিন্ন
হটলাইনটির সক্ষমতার বড় সীমাবদ্ধতা হলো, একসঙ্গে সর্বোচ্চ ২৪টি কল গ্রহণের ব্যবস্থা রয়েছে। এর বেশি কল এলে অতিরিক্ত কলগুলো অপেক্ষমাণ না থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত সময়কে কল সেন্টারের ব্যস্ততম সময় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ সময়ে ২৪ জন এজেন্ট ও সংশ্লিষ্ট কর্মী দায়িত্ব পালন করেন। বিকেলের শিফটে থাকেন ১৪ জন, যাঁদের মধ্যে ১১ জন এজেন্ট। সব মিলিয়ে কল সেন্টারের জনবল ৩৮ জন।
সাধারণত সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দুই শিফটে সেবা দেওয়া হয়। তবে জাতীয় নির্বাচনের মতো বিশেষ সময়ে প্রয়োজন অনুযায়ী সকাল ৬টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত কার্যক্রম চালু রাখা হয়। নতুন কর্মীদের দায়িত্ব দেওয়ার আগে প্রায় ১৫ দিনের প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট আকতারুজ্জামান জানান, একসঙ্গে বেশি ফোন এলে অনেক গ্রাহককে ১৫ থেকে ৩০ মিনিট পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। দীর্ঘ অপেক্ষায় বিরক্ত হয়ে অনেকে ফোন কেটে দেন। কোনো প্রশ্নের উত্তর তাৎক্ষণিকভাবে দেওয়া সম্ভব না হলে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করে পরে গ্রাহককে ফোন করা হয়।
আবেদনের অগ্রগতি জানতে চান বেশির ভাগ গ্রাহক
কল সেন্টারে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন আসে এনআইডি সংশোধনের আবেদন কোন পর্যায়ে রয়েছে, তা নিয়ে। আবেদন জমা দেওয়ার পর দীর্ঘ সময় পার হলেও কোনো অগ্রগতি না থাকলে গ্রাহকরা জানতে চান, কেন আবেদনটি আটকে আছে এবং নিষ্পত্তি হতে আর কত সময় লাগতে পারে।
এ ছাড়া আবেদনটি কোন শ্রেণির, অতিরিক্ত কী কী কাগজপত্র প্রয়োজন এবং পরবর্তী সময়ে কোথায় যোগাযোগ করতে হবে, সে বিষয়েও জানতে চান তাঁরা। ভোটার এলাকা পরিবর্তন এবং এনআইডির বিভিন্ন তথ্য সংশোধনের নিয়ম নিয়েও প্রশ্ন আসে।
তবে কল সেন্টারের অপারেটরদের আবেদন অনুমোদন বা নিষ্পত্তি করার ক্ষমতা নেই। তাঁরা কেবল সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সিদ্ধান্ত, আবেদনের অগ্রগতি এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিতে পারেন। আবেদন অনুযায়ী নিষ্পত্তির দায়িত্ব উপজেলা, জেলা, আঞ্চলিক নির্বাচন অফিস কিংবা এনআইডি মহাপরিচালকের দপ্তরের ওপর নির্ভর করে।
অনেক ক্ষেত্রে আবেদনকারীদের অন্তত ৩০ কর্মদিবস অপেক্ষা করার পরামর্শ দেওয়া হয়। কোনো বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে পূর্ণাঙ্গ তথ্য দেওয়া সম্ভব না হলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা পরবর্তী সময়ে ১০৫ নম্বর থেকেই গ্রাহককে ফোন করে প্রয়োজনীয় তথ্য জানান।
তথ্য যাচাইয়ের সুযোগ বন্ধ, বেড়েছে সীমাবদ্ধতা
কল সেন্টারের সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে আরেকটি বড় সমস্যা তৈরি হয়েছে আবেদনসংক্রান্ত তথ্য সরাসরি দেখার সুযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায়।
আগে সিএমএস পোর্টালের সীমিত প্রবেশাধিকার ব্যবহার করে অপারেটররা কোনো নাগরিকের আবেদন কোন পর্যায়ে রয়েছে, কেন আটকে আছে কিংবা কী ধরনের কাগজপত্রের ঘাটতি রয়েছে, তা দেখতে পারতেন। কিন্তু ২০২৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে এই সুবিধা বন্ধ রয়েছে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই ব্যবস্থা সীমিত করা হয়েছে। কারণ অননুমোদিত ব্যক্তির হাতে এসব তথ্য চলে গেলে দালাল চক্র তা ব্যবহার করে গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করতে পারে।
আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম ফর এনহ্যান্সিং অ্যাকসেস টু সার্ভিসেস প্রকল্পের বর্তমান উপপরিচালক (যোগাযোগ) স্কোয়াড্রন লিডার ইমরুল ইসলাম জানান, নাগরিকদের তথ্যের নিরাপত্তা বজায় রেখেই আবেদনসংক্রান্ত তথ্য দেখার সুবিধা পুনরায় চালু করতে হবে। এ জন্য কল সেন্টারের কর্মী ও ফোনকারী—উভয়ের পরিচয় যাচাইয়ের ব্যবস্থা প্রয়োজন। বিষয়টি নিয়ে তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা কাজ করছেন।
এআই দিয়ে সেবা বাড়ানোর পরিকল্পনা
গ্রাহকদের দীর্ঘ অপেক্ষা এবং কল সেন্টারের ওপর চাপ কমাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর ভয়েস ও কথোপকথন ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা করছে নির্বাচন কমিশন।
এই ব্যবস্থা চালু হলে এনআইডি-সংক্রান্ত সাধারণ ও বহুল জিজ্ঞাসিত প্রশ্নের উত্তর স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাওয়া যাবে। আর জটিল কোনো বিষয়ে জানতে চাইলে গ্রাহকদের সরাসরি মানব প্রতিনিধির সঙ্গে যুক্ত করা হবে। এতে অপারেটরদের ওপর চাপ কমবে এবং সীমিত জনবল দিয়েও বেশি মানুষকে সেবা দেওয়া সম্ভব হবে বলে আশা করছে কমিশন।
ইমরুল ইসলাম বলেন, সাধারণ প্রশ্নের উত্তর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে দেওয়া গেলে নাগরিকরা দ্রুত প্রয়োজনীয় তথ্য পাবেন। এতে অপারেটরদের সময়ও সাশ্রয় হবে। পাশাপাশি হটলাইন সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে অনলাইন ও সরাসরি প্রচার কার্যক্রম চালুর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
১২ বছরেও প্রত্যাশিত সেবা নিশ্চিত হয়নি
নির্বাচন কমিশনের এনআইডি হটলাইন ১০৫-এর কার্যক্রম সীমিত পরিসরে শুরু হয়েছিল ২০১৫ সালে। পরে নাগরিকদের ভোগান্তি কমাতে ২০১৭ সালে এর পরিধি বাড়ানো হয়। ২০১৯ সাল থেকে দুই শিফটে পূর্ণাঙ্গভাবে কল সেন্টারটির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
তবে দীর্ঘ সময় পার হলেও প্রত্যাশিত সেবার মান নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, জনবলসংকট ও তথ্যপ্রযুক্তিগত কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে এখনো নাগরিকদের প্রত্যাশা অনুযায়ী সেবা দেওয়া যাচ্ছে না। তারপরও কল সেন্টার থেকে সাধ্যমতো তথ্য ও সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
তিনি জানান, প্রযুক্তিগত সহায়তা বাড়ানোর পাশাপাশি কল সেন্টার সম্পর্কে নাগরিকদের সচেতন করা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এসব উদ্যোগের পরও প্রয়োজনীয় উন্নতি না হলে জনবল বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করবে নির্বাচন কমিশন।
নাগরিকদের সময় ও অর্থ বাঁচানোর উদ্দেশ্যে চালু হওয়া হটলাইনটি কার্যকর করতে শুধু নতুন প্রযুক্তি যুক্ত করাই যথেষ্ট নয়। একই সঙ্গে পর্যাপ্ত জনবল, দ্রুত তথ্য যাচাইয়ের নিরাপদ ব্যবস্থা এবং সেবার পরিধি সম্পর্কে ব্যাপক প্রচার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তা না হলে সাধারণ তথ্যের জন্যও নাগরিকদের ভোগান্তি ও দালালনির্ভরতা কমানো কঠিন হবে।
সূত্র: খবরের কাগজ

