দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর অবশেষে ঢাকা ও পাবনার মধ্যে সরাসরি আন্তঃনগর ট্রেন চলাচল শুরু হতে যাচ্ছে। আগামী ১৯ নভেম্বর থেকে এ রুটে ‘পাবনা প্রভাতী এক্সপ্রেস’ ও ‘পাবনা গোধূলি এক্সপ্রেস’ নামে এক জোড়া ট্রেন চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে রেলপথ মন্ত্রণালয়। এতে পাবনা ও আশপাশের এলাকার মানুষ রাজধানীতে যাতায়াতের নতুন সুযোগ পাবেন। বিশেষ করে চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যবসা ও চাকরির প্রয়োজনে নিয়মিত ঢাকায় যাতায়াত করা মানুষের জন্য রেল যোগাযোগের এই নতুন সংযোগ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, ৮০৮ নম্বর পাবনা প্রভাতী এক্সপ্রেস সকালে পাবনা থেকে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করবে। ট্রেনটি সকাল ৮টায় ছেড়ে দুপুর ২টা ১০ মিনিটে ঢাকায় পৌঁছানোর সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে, ৮০৭ নম্বর পাবনা গোধূলি এক্সপ্রেস বিকেল ৩টা ২৫ মিনিটে ঢাকা থেকে ছেড়ে রাত ৯টা ২০ মিনিটে পাবনায় পৌঁছাবে। অর্থাৎ দুই দিকেই যাত্রার সময় প্রায় ছয় ঘণ্টা।
প্রস্তাবিত যাত্রাবিরতির তালিকায় রয়েছে টেবুনিয়া, দাশুড়িয়া, ঈশ্বরদী, মাঝগ্রাম, চাটমোহর, বড়ালব্রিজ, উল্লাপাড়া, শহীদ মনসুর আলী, টাঙ্গাইল, জয়দেবপুর ও ঢাকা বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশন। ফলে শুধু পাবনা শহর নয়, পথের বিভিন্ন এলাকার যাত্রীরাও এই ট্রেনের সুবিধা নিতে পারবেন। তবে রেলওয়ের প্রকাশিত প্রস্তাব ও চূড়ান্ত সময়সূচির মধ্যে পার্থক্য থাকতে পারে। যাত্রাবিরতি ও সময়সূচির সংশোধিত প্রস্তাব মহাপরিচালকের অনুমোদনের জন্য পাঠানোর তথ্যও পাওয়া গেছে।
পাবনা দেশের গুরুত্বপূর্ণ জেলা হলেও রাজধানীর সঙ্গে সরাসরি আন্তঃনগর রেল যোগাযোগের সুযোগ ছিল না। জেলার বাসিন্দাদের ঢাকায় যেতে হলে মূলত সড়কপথের ওপর নির্ভর করতে হতো। কেউ কেউ ঈশ্বরদী থেকে ট্রেনে যাতায়াত করলেও পাবনা শহর থেকে সরাসরি আন্তঃনগর ট্রেনের সুবিধা ছিল না। ফলে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে বাসে যাতায়াত করতে হতো, যা যানজট ও সড়ক পরিস্থিতির কারণে অনেক সময় অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
এই রেল যোগাযোগের দাবি অবশ্য নতুন নয়। ২০২৩ সালের মে মাসে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পাবনা সফরে গিয়ে ঢাকা-পাবনা সরাসরি ট্রেন চালুর ঘোষণা দিয়েছিলেন। ওই বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ট্রেন চলাচল শুরুর কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয়নি। এবার নতুন করে রেলপথ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ রেলওয়ে প্রস্তুতি এগিয়ে নেওয়ায় সেই দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
নতুন ট্রেন দুটি ঈশ্বরদী জংশন হয়ে যমুনা সেতু দিয়ে ঢাকায় চলাচল করবে। এখানে ঈশ্বরদী জংশনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব ফাহিমুল ইসলাম এর আগে জানিয়েছিলেন, মাঝগ্রাম থেকে সরাসরি ঢাকার দিকে ট্রেন পরিচালনার ক্ষেত্রে ইঞ্জিন ঘোরানো নিয়ে কিছু পরিচালনাগত ও নিরাপত্তাজনিত জটিলতা রয়েছে। ঈশ্বরদী জংশনে ইঞ্জিন পরিবর্তনের সুবিধা থাকায় এই পথ বেছে নেওয়া হয়েছে। এতে কিছুটা অতিরিক্ত সময় লাগলেও নিরাপদে ট্রেন পরিচালনা সহজ হবে।
নতুন ট্রেন পরিচালনার জন্য ভারত থেকে আনা ১৮টি কোচ গত ১৬ অক্টোবর বাংলাদেশে পৌঁছেছে। বর্তমানে কোচগুলো সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায় রয়েছে। রেলওয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় কারিগরি ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি শেষ করে এর মধ্যে ১২টি কোচ দিয়ে নতুন সার্ভিস পরিচালনা করা হবে। কোচগুলোর প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও সময়সূচি চূড়ান্ত করার কাজ শেষ হলেই ট্রেন চলাচল শুরু করা সম্ভব হবে।
ঢাকা-পাবনা সরাসরি রেল যোগাযোগ চালু হলে এর সুবিধা শুধু যাত্রী পরিবহনে সীমাবদ্ধ থাকবে না। রাজধানীকেন্দ্রিক চিকিৎসা, শিক্ষা ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে যাতায়াত সহজ হওয়ার পাশাপাশি পাবনা ও ঈশ্বরদী অঞ্চলের অর্থনৈতিক যোগাযোগও বাড়তে পারে। বিশেষ করে ঈশ্বরদীতে অবস্থিত রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং আশপাশের কৃষিপ্রধান এলাকার মানুষের জন্য রাজধানীর সঙ্গে যোগাযোগ আরও সহজ হবে।
রেলপথে যাতায়াতের একটি বড় সুবিধা হলো নির্দিষ্ট সময়সূচি অনুযায়ী চলাচল এবং সড়কের যানজটের ওপর তুলনামূলক কম নির্ভরতা। ফলে নিয়মিত যাতায়াতকারী কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীরা নতুন বিকল্প পাবেন। তবে নতুন ট্রেনের প্রকৃত সুবিধা কতটা পাওয়া যাবে, তা নির্ভর করবে সময়সূচি মেনে চলা, পর্যাপ্ত আসন, টিকিটের সহজলভ্যতা এবং সেবার মানের ওপর। দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত এই রেলসেবা চালুর পাশাপাশি এসব বিষয় নিশ্চিত করা গেলে ঢাকা ও পাবনার মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসতে পারে।

