পুলিশের পোশাক চূড়ান্ত করতে সারা দেশে বড় পরিসরের একটি অভ্যন্তরীণ জরিপ চালাচ্ছে বাংলাদেশ পুলিশ। এতে বাহিনীর বিভিন্ন স্তরের ২ লাখের বেশি সদস্য অংশ নিচ্ছেন। কোন পোশাক রাখা হবে—পুরোনো, বর্তমান নাকি নতুন—সে বিষয়ে সরাসরি মতামত নেওয়া হচ্ছে মাঠপর্যায়ের সদস্যদের কাছ থেকে।
পুলিশ সদরদপ্তর গত শনিবার দেশের ৬৪ জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) ও ইউনিটপ্রধানদের কাছে জরিপসংক্রান্ত নির্দেশনা পাঠায়। আজ সোমবার (২ মার্চ) বিকেলের মধ্যে সংগৃহীত মতামত সদরদপ্তরে পাঠাতে বলা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
জরিপে ৩টি প্রশ্ন রাখা হয়েছে—আগের পোশাকের পক্ষে কত শতাংশ সদস্য, বর্তমান পোশাকের পক্ষে কত শতাংশ এবং কত শতাংশ নতুন পোশাক চান। লক্ষ্য হচ্ছে, বাহিনীর ভেতরে প্রকৃত সমর্থনের চিত্র স্পষ্ট করা।
নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পুলিশের পোশাক পরিবর্তনের বিষয়টি আবার আলোচনায় আসে। অন্তর্বর্তী সরকার প্রায় ৩ মাস আগে নতুন ইউনিফর্ম চালু করে। তবে শুরু থেকেই এ পোশাক নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে আসছে বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনটির অভিযোগ, মাঠপর্যায়ের সদস্যদের মতামত যথাযথভাবে বিবেচনা না করেই পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
পুলিশের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, জরিপের মাধ্যমে সব স্তরের সদস্যদের মতামত একত্র করা হচ্ছে। নীতিনির্ধারকদের লক্ষ্য—অধিকাংশ সদস্য যে বিকল্পের পক্ষে মত দেবেন, সেটিকেই বাস্তবায়নের পথে যাওয়া।
জরিপের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় দেখা যাচ্ছে, অনেক জায়গায় পুরোনো পোশাকে ফেরার পক্ষে জোরালো মত পাওয়া যাচ্ছে। চট্টগ্রাম রেঞ্জের এক জেলার এসপি জানান, তাঁর জেলায় কর্মরত ২ হাজার ৩১০ জন সদস্যের মধ্যে প্রায় সবাই আগের পোশাকে ফেরার পক্ষে মত দিয়েছেন। উত্তরাঞ্চলের একটি মহানগরের এক ডিসিও একই ধরনের প্রবণতার কথা জানান।
পোশাক নিয়ে আপত্তির পেছনে কয়েকটি কারণ তুলে ধরছেন সদস্যরা। তাঁদের মতে, লৌহ রঙের বর্তমান ইউনিফর্ম রাতে দায়িত্ব পালনের সময় কম দৃশ্যমান। পাশাপাশি এটি অন্য বাহিনীর পোশাকের সঙ্গে মিল থাকায় আলাদা পরিচয় স্পষ্ট হয় না। আবহাওয়ার দিক থেকেও পোশাকটি পুরোপুরি উপযোগী নয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ও কুমিল্লার এসপি মো. আনিসুজ্জামান বলেন, বর্তমান পোশাক নিয়ে শুরু থেকেই অস্বস্তি ছিল। তাঁর মতে, নির্দিষ্ট সময় পর পোশাক বদলানোর নিয়ম থাকায় আগের ইউনিফর্মে ফেরত গেলে সরকারের বড় আর্থিক চাপ পড়বে না।
এদিকে পোশাক পরিবর্তনের প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দ্রুততার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। দরপত্রের মাধ্যমে ১৪১ কোটি টাকার কাপড় কেনার কাজ একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে যায়, যার চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন-এ মামলা রয়েছে।
বর্তমানে পুলিশ সদস্যদের বছরে পাঁচ সেট করে পোশাক সরবরাহ করা হয়। সর্বশেষ বড় ধরনের পরিবর্তন হয়েছিল ২০০৪ সালে। তখন আবহাওয়া, দৃশ্যমানতা ও বাহিনীগত স্বাতন্ত্র্য বিবেচনায় এনে পোশাক নির্ধারণ করা হয়।
পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সাম্প্রতিক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, পোশাকের রং বা নকশার চেয়ে বাহিনীর পেশাদারিত্ব, মনোবল ও আধুনিক সক্ষমতা বাড়ানো বেশি জরুরি। তাদের মতে, ব্যয়বহুল পোশাক পরিবর্তনের বদলে সেই অর্থ প্রশিক্ষণ ও আধুনিকায়নে ব্যয় করাই সময়ের দাবি।জরিপের চূড়ান্ত ফল হাতে পাওয়ার পর পুলিশের পোশাক বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

