দেশের ছয়টি অবসায়নাধীন নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে (এনবিএফআই) আমানত রেখে এখন চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা। দীর্ঘদিন ধরে মূলধন ও সুদ ফেরত না পাওয়ায় অনেক পরিবার আর্থিক সংকটে পড়েছে, কেউ চিকিৎসা করাতে পারছেন না, আবার কেউ জীবনের সঞ্চয় হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন।
রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগীরা তাদের দুর্দশার কথা তুলে ধরেন। সেখানে জানানো হয়, এসব প্রতিষ্ঠানে আটকে থাকা অর্থ ফেরত না পেয়ে ইতোমধ্যে কিছু আমানতকারী মৃত্যুবরণ করেছেন, আবার অনেকে চিকিৎসা ব্যয় চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। প্রায় দুই হাজার পরিবার এই সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি করা হয়।
একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তার অবসরের সঞ্চয় একটি প্রতিষ্ঠানে জমা রেখেছিলেন ভবিষ্যতের নিরাপত্তার জন্য। কিন্তু মেয়াদ শেষে সেই অর্থ ফেরত না পাওয়ায় চিকিৎসার খরচ জোগাড় করতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত আর্থিক সংকটের মধ্যেই তার মৃত্যু হয়। পরিবারের সদস্যরা জানান, বাধ্য হয়ে স্বল্প পরিসরে সন্তানদের বিয়ে সম্পন্ন করতে হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেওয়া অন্যান্য আমানতকারীরাও একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। কেউ চিকিৎসার জন্য রাখা অর্থ ফেরত পাননি, কেউ আবার নিয়মিত মুনাফা না পেয়ে দৈনন্দিন খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। এতে তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
আলোচনায় বলা হয়, দুর্বল সুশাসন, অনিয়ম ও খেলাপি ঋণের উচ্চ ঝুঁকির কারণে একাধিক নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ধসে পড়ে। সময়মতো কার্যকর নজরদারি ও পদক্ষেপ না নেওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে এবং শেষ পর্যন্ত এসব প্রতিষ্ঠানকে অবসায়নে যেতে হয়।
ভুক্তভোগীদের প্রতিনিধিরা অভিযোগ করেন, ব্যাংক খাতে আমানত সুরক্ষায় নানা উদ্যোগ থাকলেও এনবিএফআই খাতে তেমন কার্যকর ব্যবস্থা নেই। ফলে একই ধরনের আমানতকারী হয়েও তারা সমান সুরক্ষা পাচ্ছেন না। তাদের দাবি, ব্যাংকের মতো এই খাতেও আমানত সুরক্ষা ও পুনরুদ্ধার কাঠামো নিশ্চিত করতে হবে।
তারা সরকারের কাছে দ্রুত একটি সময়সীমাবদ্ধ রোডম্যাপ ঘোষণা করার আহ্বান জানান, যাতে তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে আমানতের অর্থ ফেরত দেওয়া সম্ভব হয়। পাশাপাশি অবসায়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।
এদিকে চলতি বছরের শুরুতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক দুর্বল আর্থিক অবস্থার কারণে ছয়টি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে অবসায়নের সিদ্ধান্ত নেয়। তবে ভুক্তভোগীদের মতে, শুধু অবসায়ন ঘোষণা নয়, বাস্তবিক অর্থ ফেরত পাওয়াই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকট শুধু একটি খাতের সমস্যা নয়; এটি পুরো আর্থিক ব্যবস্থার ওপর আস্থার প্রশ্ন তৈরি করছে। দ্রুত সমাধান না এলে ভবিষ্যতে আমানতকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা আরও বাড়তে পারে এবং আর্থিক খাতে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

